আপডেট : ০৮ July ২০২১
করোনা সংক্রমণরোধে দেশজুড়ে গত এক সপ্তাহ ধরে চলছে কঠোর বিধিনিষেধ। কিন্তু অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে খোলা আছে অফিস-কারখানা। চাকরি বাঁচাতে প্রতিদিনই মানুষকে ছুটতে হচ্ছে কর্মস্থলে। কিন্তু রাস্তায় রিকশা ছাড়া নেই কোনো যানবাহন। ফলে প্রতিদিনই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বেসরকারি চাকরিজীবীদের। গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের রিকশা ভাড়া। চাকরি হারানোর ভয়ে অর্থনৈতিক সংকটেও প্রতিদিন মোটা অঙ্কের যাতায়াত ভাড়া মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ইকবাল হাসান ফরিদ কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে তার অফিস। থাকেন মিরপুর ৬০ ফিটে। বাসা থেকে দৈনিক অফিস আসতে রিকশা ভাড়া বাবদ তাকে ব্যয় করতে হচ্ছে হাজার টাকার ওপর। গত সোমবার ফরিদ তার ফেসবুকে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়ে একটি পোস্ট দেন। সেখানে লেখেন, ‘রিকশা ছাড়া তো লকডাউনে আর কোনো যান নেই। তাই রিকশাওয়ালারাই রাস্তার রাজা। গতকাল অফিসে গিয়েছিলাম রিকশায় করে। মিরপুর ৬০ ফিট পাকা মসজিদের সামনে থেকে মহাখালী পর্যন্ত গুনতে হলো ৪০০ টাকা রিকশা ভাড়া। আর মহাখালী থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক পর্যন্ত ৩০০ টাকা। মোট যাওয়ার ভাড়া গুনতে হলো ৭০০ টাকা। আসার সময় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে থেকে মহাখালী পর্যন্ত রিকশা ভাড়া ১৮০ টাকা ঠিক করার পরও গন্তব্যে পৌঁছে রিকশাচালক জোর করে বকশিশ নিল ২০ টাকা। এরপর মহাখালী থেকে ৬০ ফিট পাকা মসজিদ এলাকায় আসতে কেউ চাইল ৪০০ টাকা, কেউবা ৫০০ টাকা। পরে একজন রাজি হলো ৩০০ টাকায়। সেই রিকশাচালকও ২০ টাকা অতিরিক্ত দাবি করল গন্তব্যে এসে। এই লকডাউনে আমাকে বাসা থেকে অফিসে যেতে-আসতে গুনতে হলো মোট ১২২০ টাকা ভাড়া। এখন প্রশ্ন হলো, লকডাউনে কার লাভ কার ক্ষতি? সরকারের দেওয়া লকডাউন তো মানুষ রীতিমতো মানছেই না। পাল্টা আমাদের মতো আমজনতার পকেট উজাড় হচ্ছে।’ শুধু ফরিদই নয়, একই অবস্থা অধিকাংশ অফিসগামী যাত্রীদেরই। আরফি হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, পল্টন থেকে গুলশান যাওয়ার জন্য প্রতিদিন তাকে রিকশা ভাড়া বাবদ ব্যয় করতে হয় হাজার টাকার ওপর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সবচেয়ে ভালো ছিল লকডাউন দিয়ে সব অফিস-আদালত বন্ধ করে দেওয়া। যে বেতন পাই তা দিয়ে মাস পার করাটাই যেখানে কষ্টসাধ্য সেখানে প্রতিদিন হাজার টাকা রিকশা ভাড়া মেটানো খুবই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। গত এপ্রিল মাস থেকে দেশে করোনা সংক্রম বৃদ্ধি পেতে শুরু করলে লকডাউনের আদলে দফায় দফায় দেওয়া হচ্ছে বিধিনিষেধ। প্রথমে গত ৫ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এক সপ্তাহের জন্যে লকডাউনের আদলে বিধিনিষেধ ঘোষণা করে সরকার। পরে বিধিনিষেধের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে করা হয় ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপর আবারো করোনার সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে থাকলে গত ২৯ জুন সোমবার থেকে সারা দেশে প্রথমে তিন দিনের সীমিত বিধিনিষেধ এবং পরে ১ জুলাই থেকে এক সপ্তাহের ‘কঠোর’ বিধিনিষেধ দেয়া হয়। সংক্রমণ বৃদ্ধিও ধারা অব্যাহত থাকলে পরে তা বৃদ্ধি করে ১৪ জুলাই করা হয়। এই সময় পণ্যবাহী গাড়ি ও রিকশা ছাড়া সারাদেশে গণপরিবহন বন্ধেরও ঘোষণা করা হয়। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পণ্যবাহী যান ও রিকশা ছাড়া গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। তৈরি পোশাক কারখানাসহ সরকারি-বেসরকারি অফিস সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে। কর্মীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে অফিস কর্তৃপক্ষ। আর যেসব অফিস যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে পারবে না সেইসব কর্মী নিজ ব্যবস্থাপনায় যাতায়াত করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে অধিকাংশ অফিসই কর্মীরই যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা করেনি। কোনো অফিস আবার নামমাত্র যাতায়াত ভাড়া দিচ্ছে কর্মীদের। যানবাহন না থাকায় নারী অফিস যাত্রীরা পড়ছেন আরো বেশি ভোগান্তিতে। আজমেরি কুমকুম নামে এক নারী জানান, তার বাসা মতিঝিলের সন্নিকটে টিকাটুলিতে। অফিস তেজগাঁওতে। তিনি সেখানকার একটি ওষুধ কোম্পানির স্বল্প বেতনের কর্মচারী। বিধিনিষেধের কারণে প্রতিদিন তাকে রিকশা ভাড়া বাবদ গুনতে হচ্ছে ৫শ থেকে ৬শ টাকা। এর বিপরীতে অফিস থেকে তাকে দৈনিক যাতায়াত ভাড়া বাবদ দেওয়া হচ্ছে ৮০ টাকা। এছাড়া সন্ধ্যার পর নির্জন রাস্তায় রিকশা দিয়ে আসাটাও একজন নারীর পক্ষে নিরাপদ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। নাম প্রকাশ না করে অনেকেই অভিযোগ করে বলেছেন, অফিসগুলোকে কর্মী আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলা হলেও বহু প্রতিষ্ঠানই তা করেনি। প্রতিষ্ঠানের এমন দায়িত্বহীন কাণ্ডে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। পরিবহন সংকটের কারণে সীমিত পরিসরে বিধিনিষেধের প্রথম দিন গত ২৮ জুন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের রেডিও কলোনি ও সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। জানা যায়, শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ায় সহস্রাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন ২০ লক্ষাধিক তৈরি পোশাক শ্রমিক। এখানকার হাতেগোনা কিছু শিল্প-কারখানা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে আনা-নেওয়া করলেও অধিকাংশ শ্রমিকদের কারখানা যেতে হচ্ছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। শুধু পোশাক কারখানাই নয়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোকেও গত এপ্রিলে দেওয়া বিধিনিষেধের সময় কর্মীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তা মানা হয়নি।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১