আপডেট : ০৮ July ২০২১
বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না কারাগারের। হরহামেশাই ফাঁস হচ্ছে কারাগারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র। বন্দিদের টাকার বিনিময়ে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ বহু পুরোনো। এ গুরুতর অভিযোগ থেকে আজো বের হতে পারেননি কারা কর্মকর্তারা। বিশেষ করে চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি হিসেবে বন্দি কারাগারের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে থাকা ও বন্দিদের বাবা হওয়ার বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। সম্প্রতি কারাগারের ভেতরে হলমার্কের তুষারের নারীসঙ্গ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর রেশ যেতে না যেতেই ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীন কারাগার থেকে হাসপাতালে এসে ব্যবসা করছিলেন। তার জুম মিটিং করার বিষয়টি ভাইরাল হলে কারাগার নিয়ে আবারো জন্ম হয় বিতর্কের। বরাবরের মতো এবারো দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কারারক্ষীকে বরখাস্ত ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জানা গেছে, কারা-হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ‘চিকিৎসা’ নিচ্ছেন শতাধিক বন্দি। কারাগারের বাইরের হাসপাতালগুলোতে কত বন্দি আছেন তার সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি কারা কর্মকর্তারাও। এর মধ্যে যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীম বেশ কয়েক মাস ধরে ‘চিকিৎসা’ নিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর প্রিজন সেলে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ২৭ কারাবন্দি। এর মধ্যে একজন ভারতীয় নারী উর্মিলা রয়েছেন। অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। সূত্র জানায়, ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন হাসপাতালের কেবিনে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করে জুম বৈঠক করেছিলেন। এ খবর ফাঁস হলে গত ৩ জুলাই কারাগারে ফেরত পাঠানো হয় তাকে। মূলত এ ঘটনার পরই বন্দিদের দীর্ঘ ‘চিকিৎসা’ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কারা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রফিকুল আমীনের জুম বৈঠকের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেলে হাসপাতালে দায়িত্বরত ১৩ কারারক্ষীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। সাময়িক বরখাস্ত করা হয় চার কারারক্ষীকে। গঠন করা হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। এদিকে ক্যাসিনো ও মানি লন্ডারিংসহ একাধিক মামলায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি আছেন জি কে শামীম ও সম্রাট। কারাবন্দি থাকলেও তারা বিভিন্ন সময় বিএসএমএমইউ ও বারডেমসহ কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের ‘চিকিৎসা’ চলছে মাসের পর মাস। কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে বিএসএমএমইউ’র প্রিজন সেলে আছেন সম্রাট। তার হার্টে সংক্রমণের কথা জানা গেছে। ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতনের বাসা থেকে গ্রেফতার হন শামীম। তার এক হাতে মেডিক্যাল ডিভাইস লাগানো রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যার কথা বলে প্রায়ই হাসপাতালের প্রিজন সেলে গিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ এ বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে আবারও ‘চিকিৎসা’ নিচ্ছেন শামীম। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কারাবন্দিদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। আবার হাসপাতাল থেকে কারাগারে পাঠাতে হলেও চিকিৎসকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এখানে কারা কর্তৃপক্ষের কোনো ভূমিকা নেই। তবে প্রতি ১৫ দিন পর পর কারা কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়ে বন্দিদের চিকিৎসার তথ্য জানতে চায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বন্দিকে সুস্থ মনে করলে কারাগারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করে থাকে। কারাগারের যত বিতর্ক : কারাগারে থাকা সন্ত্রাসীরা বিভিন্নভাবে কারা কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে একদিকে যেমন বাবা হয়েছেন, তেমনি নারীসঙ্গও পেয়েছেন। অর্থাৎ টাকায় ম্যানেজ করে কারাগারে মাদক-নারী সবই পাওয়া সম্ভব। সেখানে তারা মুক্তজীবনের মতোই থাকেন। আবার সেখানে বসে চাঁদাবাজিও করেন। এক কথায় আয়েশি জীবনই চলে কারাগারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনরা কারাগারে বন্দি থাকলেও সময় কাটে মুক্তজীবনের মতো। চাঁদাবাজির সিংহভাগই তারা খরচ করেন কারাগারের ভেতরে। রাজার হালেই কাটে তাদের দিনকাল। তবে এসব অবৈধ সুযোগ বর্তমানে কিছুটা কমেছে। এমন কি কয়েদিদের তাদের স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার কোনো সুযোগও নেই। তার পরও তারা এ সুযোগ নিচ্ছেন অবৈধভাবে লেনদেনের মাধ্যমে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বন্দি থাকা অবস্থায় কাইল্যা পলাশ আর রায়পুইরা সেইল্লা ছাড়াও বাবা হয়েছেন আমিনবাজারের মামুন, শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মহাখালীর তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস। এদের মধ্যে মামুন প্রতিপক্ষের হামলায় ও সেইল্লা পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হন। জানা যায়, জেলখানার জীবন মানেই এক ভিন্ন জীবন। সেখানে শাস্তি হিসেবেই জীবন কাটাতে হয়। কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনদের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নয়। তারা কারাগারে থেকে যেমন বাইরের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করেন, তেমন ভেতরে বিলাসী জীবনযাপন করেন। তাদের যা ইচ্ছা হচ্ছে, তাই তারা পূরণ করছে। ভেতরে বসে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। ব্যবসায়ীদের হুমকি দিচ্ছেন, চাঁদাবাজি করছেন। চাঁদার টাকা সময়মতো কারাগারেই পৌঁছে যাচ্ছে। কারা কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই তারা বছরের পর বছর এই বিলাসী জীবনযাপন করছেন। আদালতে হাজিরার দিন আদালত চত্বরেই হাজির হন তাদের অনুসারীরা। সেখানেই তারা সামনাসামনি নির্দেশনা দিচ্ছেন। বিচার-আচার করছেন বাহিনীর সদস্যদের। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও সময় কাটান। কারাগারে তাদের থাকা-খাওয়ার সুযোগ-সুবিধা ভিআইপিদের মতো। কাশিমপুর কারাগারে ডনদের এ সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এমন বিলাসী জীবনযাপনের সংবাদে ইতোমধ্যে একাধিকবার জেলখানার অভ্যন্তরে অভিযান চালানো হয়েছে। সন্ত্রাসীদের কক্ষে রঙিন টিভি, মোবাইল ফোন সেট, সিম ও মেমোরি কার্ড এবং মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এ অবৈধ সুযোগ-সুবিধা আদায় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা বাড়িতে গিয়েও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশের বাসায় গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে থাকার ঘটনাটি ২০১৬ সালে ফাঁস হয়। যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন কাইল্যা পলাশ। ২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানকে গুলি করে হত্যার মামলায় বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। উচ্চ আদালত তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। পলাশের স্ত্রী মাহমুদা খানম বলেছেন, খুনের মামলায় ২০০৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে জেলে আছেন তার স্বামী। ২০১২ সালের অক্টোবরে মুন্সীগঞ্জ হাসপাতালে জন্ম হয় তাদের মেয়ে খাদিজার। তিনি স্বীকার করেন, কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে রামপুরার বাসায় দেখা করে যেতেন পলাশ। আগে মাসে দু-তিনটি হাজিরা থাকত, তখন বেশি আসতেন, এখন কম। কখনো কয়েক ঘণ্টা, কখনো সারা দিন পরিবারের সঙ্গে থাকেন। প্রিজন ভ্যানে নয়, মাইক্রোবাসে করেই আসা-যাওয়া করতেন। বাড়ির বাইরে পাহারায় থাকতেন কারারক্ষীরা। কারা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কাশিমপুর থেকে ঢাকার বিভিন্ন আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময় পুলিশি পাহারায় প্রিজন ভ্যানে যাতায়াত করেছেন তিনি। স্ত্রী মাহমুদা বলেছেন, পুলিশের সহযোগিতায় তার স্বামী রামপুরার বাসায় আসা-যাওয়া করতেন মাইক্রোবাসে। প্রিজন ভ্যানে কখনো আসেননি। সূত্র জানায়, পুলিশ হত্যাসহ দুই ডজন মামলার আসামি তেজগাঁওয়ের সেলিম ওরফে রায়পুইরা সেইল্যা গ্রেপ্তার হন ২০০২ সালে। জামিনে ছাড়া পান ২০০৬ সালে। কিন্তু সেলিম কন্যাসন্তানের জনক হন ২০০৪ সালে। সন্তানের পিতা হওয়ায় তিনি কারাগারে মিষ্টিও খাইয়েছিলেন। তার স্ত্রী পারভীন আক্তার পিস্তল চালাতে পারদর্শী। তিনিও পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন একাধিকবার। পারভীন আক্তারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, কোর্ট গারদে দেখা করার সময় বিশেষ কক্ষ যাকে ‘ফ্রি পোর্ট’ বলা হতো, সেখানে তারা মিলিত হতেন। জামিনে ছাড়া পাওয়ার চার মাসের মাথায় ক্রসফায়ারে নিহত হন দুর্ধর্ষ সেলিম। আমিনবাজারের মামুন ১৯৯৪ সালে গ্রেপ্তারের পর ছিলেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কোর্ট গারদ ও জেলখানায় গিয়ে দেখা করতেন তার ছোট স্ত্রী। কোর্ট গারদে সেই সময় তারা সময় কাটাতেন। জেলখানায় থেকেই তিনি পিতা হওয়ার সংবাদ পান। তিনিও সেই সময় জেলখানায় মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে মিরপুরে মোল্লা মাসুদ গুলি করে তাকে হত্যা করেন। ঈদের আগে স্ত্রীকে নিয়ে শপিং করে রিকশায় ফিরছিলেন মামুন। কিন্তু ওত পেতে থাকা মোল্লা মাসুদের বাহিনী তাকে গুলি চালায়। মামুনও গুলি চালালে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বাংলাদেশের আরেক ডন সুব্রত বাইন। আন্ডারওয়ার্ল্ডে গ্যাং কিলিং জনপ্রিয় করে তোলেন অপরাধ জগতের এই মুকুটহীন সম্রাট। রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের শক্তিশালী দুটি গ্রুপের মধ্যে অন্যতম সেভেন স্টারের তিনি জনক। ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশের পর থেকে তিনি পলাতক। বর্তমানে কলকাতা কারাগারে রয়েছেন। ১৯৯৭ সালে নয়াপল্টন এলাকার একটি হাসপাতাল থেকে গোয়েন্দা পুলিশের এসি আকরাম ১২ সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেন সুব্রতকে। তিনিও জেলে থাকার সময় সন্তানের জনক হন। তার স্ত্রীর সঙ্গে সেই জেলগারদেই নিয়মিত দেখা করতেন বলে জানা গেছে। জামিন পাওয়ার পরই ভারতে গিয়ে আত্মগোপন করেন। সূত্র জানায়, মহাখালীর আরেক ডন কিলার আব্বাস জেলে থাকা অবস্থাতেই বাবা হয়েছেন। তিনি এখনো জেলে রয়েছেন। সেখান থেকেই পরিবারের খোঁজখবর নেন তিনি। আব্বাসের স্ত্রী হামিদা বেগমের দাবি, তার ছেলের বাবা কারাগারে থাকা আব্বাস। তিনি পুলিশকে ম্যানেজ করে মিরপুরের বাসায় আসতেন। এছাড়া কারাগারে থেকেই মোবাইল ফোনে বিয়ে করেছেন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ক্ষমাপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামি লক্ষ্মীপুরের আলোচিত মেয়র আবু তাহেরের জ্যেষ্ঠপুত্র আফতাব উদ্দিন বিপ্লব (৩৮)। ২০১৪ সালে লক্ষ্মীপুর কারাগারে এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বিয়ের দেনমোহর ধরা হয় ১০ লাখ টাকা। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হয়ে দায়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। অপরাধ করে এখন পার পাওয়ার সুযোগ নাই।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১