বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৯ July ২০২১

কনডেম সেলে ২ হাজার আসামি


সারা দেশে বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন ২ হাজার ৬ জন আসামি। তাদেরই রাখা হয় কনডেম সেলে। এই সেল একটি ছোট কক্ষ। মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে আসামিকে সাধারণ কারাকক্ষ থেকে নেওয়া হয় সেখানে। মূলত ফাঁসির আগে কিছুদিনের জন্য ওই কক্ষে রাখা হয় আসামিদের। অথচ মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানার ছাড়পত্র মিলতেই কেটে যায় বছরের পর বছর। তাই দীর্ঘ সময় ওই কক্ষে থাকতে হচ্ছে আসামিকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। নানা অপরাধে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হন অপরাধী। বিচার প্রক্রিয়ায় যথাযথ যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দেন বিচারিক আদালত। কিন্তু রায় হলেই কার্যকর হয় না মৃত্যুদণ্ড। এজন্য উচ্চ আদালতের অনুমোদন এবং রায়ের বিরুদ্ধে আসামি পক্ষের আপিল নিষ্পত্তির প্রয়োজন হয়। অথচ বাস্তবতা বলছে, এই নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতায় বাধা পড়ছে রায় কার্যকরের বিষয়টি।

আইনবিদরা বলছেন, বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডের সাজা বাস্তবায়ন করতে হলে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন। সেই অনুমোদন কতদিনে জানানো হবে বা জানতে হবে, তা আইনের কোথাও নির্দিষ্ট করে বলা নেই। তাই বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে দীর্ঘ সময় লাগলেও আসামি কিংবা বাদীপক্ষ কেউ কোনো আপত্তি তুলতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর সাজা দ্রুত কার্যকর না হওয়ায় বাদীপক্ষের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। আবার অপরাধীদের মৃত্যুর অপেক্ষায় কাটছে দীর্ঘ সময়। আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হিসেবে পরিচিত। নিয়ম অনুসারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্য বিচারিক আদালতের রায় ও নথিপত্র সাতদিনের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। আসেও তাই। আর সাজার রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তিরা কারাগারে থেকে জেল আপিল করতে পারেন। এ ছাড়া দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিল ও বিবিধ আবেদনও করতে পারেন। ডেথ রেফারেন্স শুনানির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) তৈরি করতে হয়। প্রক্রিয়া শেষে ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল, জেল আপিল ও আবেদনের ওপর একসঙ্গে শুনানি হয়ে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী সাতদিনের মধ্যে বিচারিক আদালত থেকে ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) এলেও সেটি এবং আসামির আপিল নিষ্পত্তিতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। অনেক সময় কয়েকবছর অপেক্ষা করতে হয়। আবার হাইকোর্ট কোনো আসামির ডেথ রেফারেন্স ও অপিল নিষ্পত্তি করে রায় ঘোষণা করলেও তার পক্ষে-বিপক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হন সংক্ষুব্ধ পক্ষ। উচ্চ আদালতে সিদ্ধান্তের এই সময়টায় কনডেম সেলে কাটাতে হয় আসামিকে।

কেন এই দীর্ঘসূত্রতা : আইনজীবীরা বলছেন, গত দেড় বছর মহামারি করোনার কারণে উচ্চ আদালতে বিষয়গুলো নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে। এছাড়া পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকাও একটি কারণ।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এসএম শাহজাহান বলেন, ‘ডেথ রেফারেন্স বা আপিল সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বাড়ছে গত দেড় বছর ধরে। কারণ সারাবিশ্বে মহামারি চলছে। কিন্তু তার আগে হাইকোর্টে দুই থেকে তিনটি বেঞ্চ থাকত ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য। মামলা শুনানি হচ্ছে, তবে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল যেন তাড়াতাড়ি শুনানি করা হয় সে ব্যাপারে নজর দেয়া উচিত। কারণ কনডেম সেলে থেকে দীর্ঘদিন থাকা কঠিন।’ মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, যথাযথ নথিপত্র তৈরি করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। এটিও দীর্ঘসূত্রিতার জন্য দায়ী। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল কতদিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে সে বিষয় আইনে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলা নেই। যে কারণে আসামিও ভোগান্তির শিকার, বাদীপক্ষও হতাশায় ভোগেন। তবে বিষয়টি সময়সাপেক্ষও বটে। কারণ একটি মৃত্যুদণ্ডের মামলা শুনতে হলে প্রথমেই মামলাটির পেপার বুক (মামলার বৃত্তান্ত) তৈরি করতে হয়। পেপারবুক তৈরি করতেই সময় লেগে যায় অনেকদিন। এমনকি কয়েক বছরও পার হয়ে যায়।’

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘পেপার বুক ছাপাতে হয় বাংলাদেশ সরকারের প্রেসে (বিজি প্রেস)। কিন্তু এই প্রেস পেপারবুক ছাপানোর চেয়ে অন্যান্য ছাপানোর কাজ জরুরি ভিত্তিতে করে। যেমন-জরুরি কোনো সরকারি গেজেট। এজন্য সুপ্রিম কোর্টের পেপারবুক তৈরি করতে অনেক সময় লেগে যায়।’

তিনি জানান, পেপার বুক তৈরি করতে আলাদা প্রেসের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা চেয়ে তাদের সংগঠন ২০১৬ সালে একটি রিট করে। সেই রিটের প্রেক্ষিতে রুলও দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এখন চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বিষয়টি।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল বিচারাধীন রয়েছে দুই হাজারের বেশি। আর শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে এক হাজার তিনশটি আপিল। কিন্তু বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য একটি বেঞ্চও নেই। ফৌজদারি মামলার বিষয়ে শুনানির জন্য বিচারপতি জেবিএম হাসানের একটি বেঞ্চ আছে। সেখানে বলা আছে, ‘অতিব জরুরি সকল প্রকার ফৌজদারি মোশন ও তৎসংক্রান্ত আবেদনপত্র গ্রহণ করিবেন।’

সমপ্রতি আইজি প্রিজন্স (কারা-মহাপরিদর্শক) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন জানান, গত ৯ জুন পর্যন্ত কনডেম সেলে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামি আছেন দুই হাজার ছয়জন। এর মধ্যে পুরুষ এক হাজার নয়শ ৫২ ও নারী আছেন ৫৪ জন।

‘কনডেম সেল’-এর সাথে অন্য সেলের পার্থক্য : সাধারণত মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের কারাগারের অন্যান্য অপরাধীদের চেয়ে আলাদা ধরণের কক্ষে রাখা হলেও বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধি মোতাবেক সেরকম কোনো আইন নেই বলে জানান সাবেক কারা উপ মহাপরিদর্শক শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর একজন বন্দিকে কারাগারে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা, দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলেও আলাদা কক্ষে রাখার বিষয়টি আইনে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই।

তবে কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণ অপরাধীদের চেয়ে কনডেম সেলের আসামিদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন বলে মন্তব্য করেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধিতে ফাঁসির আসামিদের কনডেম সেলে রাখার মতো কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকলেও তাদের আলাদা ধরনের কক্ষে রাখা হয়। এটিকে এক ধরনের রেওয়াজ বলা যেতে পারে। একটি কনডেম সেলে সাধারণত ১ জন কিংবা ৩ জন বন্দি রাখা হয়।’

শামসুল হায়দার বলেন, ‘সাধারণত ধারণা করা হয় যে দুজন বন্দি থাকলে গোপনে পালানোর পরিকল্পনা করতে পারে, তবে তিনজন থাকলে পরিকল্পনা আর গোপন থাকে না। ওই ধারণা থেকেই দুজন বন্দি একটি কনডেম সেলে রাখা হয় না।’

কারাবিধি অনুযায়ী, একজন বন্দির থাকার জন্য ন্যূনতম ৩৬ বর্গফুট (৬ ফিট বাই ৬ ফিট) জায়গা বরাদ্দ থাকতে হবে। তবে বাংলাদেশের জেলগুলোতে কনডেম সেলের ক্ষেত্রে এই আয়তন কিছুটা বেশি হয়ে থাকে। একজন বন্দি থাকার কনডেম সেল সাধারণত ১০ ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের হয়ে থাকলেও বাংলাদেশের অনেক জেলেই সেলের মাপ কিছুটা বড় হয়। আর তিনজন বন্দি যেসব সেলে রাখা হয় সেগুলোর আয়তন আরো বড় হয়ে থাকে।

কনডেম সেলের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য সাধারণত অন্যান্য সেলের তুলনায় অনেক ছোট আকারের জানালা থাকে। আর এসব সেলে থাকা বন্দিদের দিনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেলের বাইরে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। কনডেম সেলে থাকা বন্দিরা মাসে একদিন দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার সুযোগ পান। আগে একসময় জেলের ভেতরেই কনডেম সেলে থাকা বন্দিদের সাথে দেখা করতে আসতে পারতেন দর্শনার্থীরা। তবে এখন মাসে একদিন জেল গেটে তারা দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার সুযোগ পান।

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, ‘একসময় কনডেম সেলের বন্দিদের নিজেদের সেলের বাইরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেল থেকে বছরের পর বছর বের হননি, এমন উদাহরণও আছে। কিন্তু একটা ছোট ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, তাই বর্তমানে সব বন্দিদেরই দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় বাইরে চলাফেরা করতে দেয়া হয়।’

একজন বন্দি একবারে সর্বোচ্চ ৫ জন দর্শনার্থীর সাথে দেখা করতে পারেন। কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণত কনডেম সেলের প্রত্যেক বন্দির কাছ থেকে তার নিকটাত্মীয়দের তালিকা নেন, নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া কনডেম সেলের বন্দির সাথে দেখা করতে অনুমতি দেয় না কারা কর্তৃপক্ষ। সাধারণত মাসে একদিন বন্দিদের সাথে দর্শনার্থীদের দেখা করার অনুমতি দেওয়া হলেও বিশেষ বিবেচনায় কখনো কখনো ১৫ দিনের মধ্যেও কনডেম সেলের আসামির সাথে দর্শনার্থীদের দেখা করতে দেয়া হয় বলে জানান শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১