বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৩ July ২০২১

‘টাকাপয়সাও কেউ ধার দেয় না’


করোনাভাইরাস মহামারীতে বিপদে আছেন পরিবহন শ্রমিকরা। নানা সময় করোনার বিস্তার রোধে গণপরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে বিপাকে পড়েন তারা। তাদের মতে, ‘গাড়ি বন্ধ তো আমাদের সব বন্ধ।’

ঢাকার চিড়িয়াখানা থেকে মতিঝিলগামী নিউ ভিশন পরিবহনের চালক আবু হানিফ ১৬ বছর ধরে আছেন এ পেশায়। চিড়িয়াখানার পাশে মুক্তিযোদ্ধা আবাসিক এলাকায় ছয় হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিয়ে ছেলেমেয়ে-বাবা-মাসহ পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে থাকেন।

করোনা মহামারীর অতি বিস্তার ঠেকাতে গত ১ জুলাইয়ের কঠোর লকডাউনের পর থেকে এক পয়সাও রোজগার হয়নি হানিফের। তিনি বলেন, অনেক কষ্টেই কোনোরকমে দিন যাচ্ছে। গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। একজনের আয়ের ওপর সবার খরচ নির্ভর। তিনি বলেন, আগে মাঝেমধ্যে মাছ-মাংস খেতাম, এখন শাকসবজির বাইরে ভালো কিছু খেতে পারি না। কোনোরকমে জীবন চলছে। কারো কাছে টাকাপয়সাও ধার পাই না। কীভাবে যে দিন চলে, সেটা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। মহামারীতে হঠাৎ বিপদে পড়ে যাওয়া আবু হানিফ তার দুর্দশার কথা মুখ ফুটে না বললেও মিরপুর চিড়িয়াখানা এলাকায় বসবাসকারী একাধিক চালক-শ্রমিক জানিয়েছেন, টাকার অভাবে তিন বেলার খাবার হয়ে গেছে অনিয়মিত। দিনের খাবারে ভাত, ডাল, আলু ভরতা অথবা শাক ছাড়া কিছু জোটাতে পারছেন না। পরিচিতজনদের কাছ থেকে ধারও মিলছে না বলে অস্থিরতা মধ্যে সময় পার করছেন।

ঢাকায় দীর্ঘদিন মোটাদাগে সচ্ছল জীবনযাপন করা এসব গণপরিবহন চালক ও কর্মীদের অনেকেই টাকার অভাবে নামমাত্র মূল্যে টিভি, ফ্যানসহ বাসার জিনিসপত্র বিক্রি করা শুরু করেছেন বলেও জানালেন। নিদারুণ কষ্টের জীবনযাত্রার করুণ চিত্র তুলে ধরার সময় সবার চোখে-মুখে ছিল অজানা শঙ্কাও।

পরিবহন সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর হিসাবে দেশে বাস ও ট্রাক মিলিয়ে ৫ লাখ গণপরিবহন রয়েছে, যাতে যুক্ত অন্তত ৩০ লাখ শ্রমিক। লঞ্চ, স্টিমার, রিকশা, সিএনজি অটোরিকশাসহ অন্যান্য পরিবহন মিলিয়ে এই সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি।

এসব শ্রমিকদের প্রায় সবাই ‘যেদিন কাজ, সেদিন বেতন’-এর ভিত্তিতে জীবিকা নির্বাহ করেন বলে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এভাবে কাজের মধ্যেও টেনেটুনে যারা কিছু সঞ্চয় করেছিলেন, ২০২০ সালে কোভিড সংক্রমণের শুরুতে প্রথম দফার লকডাউনেই তা নিঃশেষ হয়ে গেছে।

মাঝে কিছুদিন সীমিত আকারে জীবিকার সুযোগ মিললেও গত এপ্রিলে দ্বিতীয় দফা এবং এখন তৃতীয় দফার লকডাউনে টানা কর্মহীনতায় গণপরিবহন শ্রমিকদের সংসার চালানোর কষ্ট দীর্ঘতর হচ্ছে।

বছরজুড়ে কাজ না থাকায় বিপুল পরিবহন শ্রমিকের বেশিরভাগই চলমান লকডাউনে বাসস্থান ও খাবারের চরম কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করার কথা জানিয়েছেন। শহরবাসী অনেক শ্রমিককে ভাড়া মেটাতে ব্যর্থ হয়ে বাসা ছাড়তে হয়েছে। দুই পরিবার মিলে উঠেছেন এক বাসায়; অনেকে ফিরে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। 

গত কয়েকদিন রাজধানীর মহাখালী, চিড়িয়াখানা রোড, গাবতলীর অর্ধশত শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জীবনযাত্রার এরকম নিদারুণ করুণ চিত্রই জানা গেল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, তাদের অধিকাংশ ড্রাইভার-হেলপার ঘরভাড়া দিতে পারছেন না। তাদের যে কেউ এসে খোঁজ নেবে সেই লোকও নাই।

প্রজাপতি পরিবহনের চালক সেকেন্দার বলেন, প্রথম দফায় লকডাউনে পরিস্থিতি কোনোরকমে সামাল দেওয়া গেছে। নিজেদের কিছু সঞ্চয় ভেঙে খেলাম। পরে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার-কর্য করে কিছুদিন চললাম। তিনি বলেন, সরকারও কিছু দিয়েছিল। জনপ্রতিনিধিরাও কিছু দিয়েছিল। কিন্তু এবারের লকডউন ও গত এপ্রিলের লকডাউনে কেউ আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন না। আমরা আসলে নিরুপায়।

সেকেন্দার জানালেন, এক ড্রাইভার বন্ধুকে দেওয়া ধারের টাকা এখনো ফেরত পাননি। বার বার চাইলেও তা দিতে পারছেন না সেই বন্ধু। তিনি বলেন, আজকে ফোন করার পর বলল, ‘দোস্ত আমি রিকশা চালাচ্ছি’, বলে কেটে দিল। পরে বিকালে এসে আমাকে দেড়শ টাকা দিয়ে বলল, ‘আজকে আর চাইও না। আড়াইশ টাকা ভাড়া মারছি, তোমাকে দেড়শ টাকা দিয়া গেলাম।’

গত তিন দশক ধরে ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালানো আল আমিন লকডাউনের আগে দিশারী পরিবহনের বাস চালাচ্ছিলেন। বর্তমান লকডাউনের নিজের জীবনযাত্রার কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ধরে এলো তার, দুচোখে এলো পানি। তিনি বলেন, বহুত খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি, আমরা না খায়াই আছি। বাচ্চা-কাচ্চার মুখের দিকে তাকায়ে হাসিমুখে কথা বলতে পারি না। চারিদিকে শুধু অভাব আর অভাব। হাতে টাকা না থাকলে শহরের জীবন একেবারেই অচল হয়ে যায়।

গত বছরের লকডাউনে অনেকেই সরকারি সহায়তা পেলেও তা ভাগে পড়েনি দিশারী পরিবহনের আরেক চালক মোহাম্মদ আব্দুস সালামের। এ বছর পরপর দুই দফায় লকডাউন চললেও কেউ সহায়তার হাত বাড়ায়নি।  সালাম আরো বলেন, ঘরে একটা দুধের বাচ্চা আছে, কিন্তু তার খাবারের কিছু নাই। ৩০ বছরের জীবনে কোনোদিনও রিকশা চালাই নাই, তারপরও উপায় না দেখে কালকে পায়ের রিকশা চালাইছি, সারা শরীর ব্যথা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, দুইজন ড্রাইভার মিলে আধা বেলা, আধা বেলা করে ভাগ করে চালাইছি। আজকে আমি আর হাঁটতে পারতেছি না ব্যথায়।

কথা বলতে বলতে হতাশ এই চালকের কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসে, করুণ সুরে তিনি বলে চলেন, গত সাতদিনের লকডাউনে এই অবস্থা। এখন সামনের দিকে কীভাবে যে চলব, তা আমার মাথায় আসতেছে না। ওপরে আল্লাহ একজন আছেন, তিনিই জানেন আমাদের কী হবে।

চিড়িয়াখানা রোডে ১০/১২ জন রিকশা চালককে দূর থেকে দেখিয়ে অন্যান্য বাসচালক জানালেন, এরা সবাই আমাদের সাথে ড্রাইভারি করত। এখন তারা রিকশা চালাচ্ছেন। তাদের একজন বলেন, এখন সিনিয়র সিনিয়র ড্রাইভাররা পায়ের রিকশা চালায়। কারণ মটরের রিকশা পুলিশ চলতে দেয় না। কারও কাছে ধার চাইলে পাওয়া যায় না। আমি কারো কাছে পাওনা নাই, উল্টো আমার কাছে পাইব অনেকে।

চিড়িয়াখানা এলাকায় দিশারী পরিবহনের ৪০০ ড্রাইভার-স্টাফ রয়েছে জানিয়ে একজন চালক বলেন, ১৫ দিন পার হয়ে গেল, কোনো ত্রাণ-সহায়তা আসে নাই। আমি গ্রাম থেকে কিছু চাল নিয়ে আসছিলাম, সেটাই খাচ্ছি। না হলে এখন ভিক্ষা করা লাগত। কারণ আমার যে শরীরের অবস্থা, তাতে রিকশাও চালাইতে পারি না।

মহাখালী বাস টার্মিনালের বাসের হেলপার আবু তাহের মিয়া বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের হাতে আসে কাঁচা টাকা, নগদ। পকেটে যখন টাকা, তখন মাথা থাকে গরম। অধিকাংশ শ্রমিক এটাসেটা করে খরচ করে ফেলার অভ্যাস। কারণ সে জানে, একদিন পরেই আবার তার হাতে টাকা আসছে।

ঢাকা শহরের ভেতরে এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃজেলা বাসগুলোর প্রতিটিতে দুজন করে চালক থাকেন। ফলে একজন চালকের পক্ষে মাসে ১৫ দিনের বেশি কাজ করা সম্ভব হয় না। চালকের সঙ্গে হেলপাররাও বদলি হিসেবে কাজ করেন। অনেক সময় একটি গাড়ির জন্য তিনজন চালকও বরাদ্দ থাকে।

বাস-ট্রাক চালানোর অতিরিক্ত পরিশ্রম ও নির্ঘুম সময় পার করতে হয় বলে এই পদ্ধতি অনুসরনের কথা উল্লেখ করেন বাস মালিক ও শ্রমিক নেতারা।

দৈনিক এক হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করলেও পরিবহন শ্রমিকরা এই কারণে সঞ্চয় করতে পারেন না বলে তাদের দাবি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ এনায়েত উল্লেখ বলেন, আমার যে গাড়িগুলো আছে সেখানেও একদিন পর পর চালক-হেলপার কাজের সুযোগ পান। পরিবহনখাতে এভাবেই চলে। এখানে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ ভিত্তিতে তারা কাজ করেন।

ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকের কোনো নিয়োগ নাই, যেদিন গাড়ি চালায় সেদিনই তাদের আয় হয়। ফলে হরতাল অবরোধ কিংবা অন্য কারণে গাড়ি না চললে খুব সহজেই শ্রমিকরা কাবু হয়ে পড়েন।

২০২০ সালে প্রথম লকডাউনের সময় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য দুই কিস্তিতে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল। সেই বরাদ্দ থেকে কিছু বরাদ্দ সৌভাগ্যবান শ্রমিক পেয়েছিলেন। তবে মোট শ্রমিকদের ১/২ শতাংশও হবে না বলে মনে করেন শ্রমিক নেতারা।

এনায়েত উল্লাহ বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে শ্রমিকদের কিছু দেওয়ার চেষ্টা করি। অন্যান্য মালিককেও এগিয়ে আসতে বলি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মালিকরা আরো চরম বিপদে আছেন। তাদের মাথার ওপর মাসে মাসে ব্যাংকের কিস্তি। যারা তিন চারটি গাড়ির মালিক, গাড়ি বন্ধ থাকার কারণে তাদের জীবনও অচল হয়ে গেছে। নিজ কোম্পানি এনা পরিবহনের শ্রমিকদের জন্য এবারের ঈদে ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করার কথা জানান তিনি।

বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আবু রায়হান বলেন, আমরা মালিকরাও চরম বিপদে আছি। তারপরও শ্রমিকদের জন্য ঈদের সময় কিছু করার চেষ্টা করি। সরকারের কাছে আমরা শ্রমিকদের জন্য বার বার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই পাইনি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১