আপডেট : ২৬ August ২০২১
৩৩ বছর ধরে বাংলাদেশের নানা প্রান্ত ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে হারিয়ে যেতে থাকা জিনিসপত্র সংগ্রহ করেছেন চাঁদপুর গভমেন্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুলের শিক্ষক নাজমুল আবেদীন কান্ত সেই জিনিসপত্র কুমিল্লা নগরীর মগবাড়ি চৌমুহনীর বাসায় সংরক্ষণ করেছেন তিনি। নাম দিয়েছেন কুমিল্লা জাদুঘর। ২০২১ সালের শুরুর দিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুমিল্লা অঞ্চলের তৎকালীন পরিচালক সাত সদস্যের টিম নিয়ে জাদুঘরটি পরিদর্শন করেন। এরপর মন্ত্রণালয় জাদুঘরটিকে লাইসেন্স দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। লাইসেন্স পেলে এটি হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ব্যক্তিগত জাদুঘর। বর্তমানে জাদুঘরটিতে তিন শ প্রকারের দুই হাজারের বেশি জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরটিতে আছে ব্রিটিশ আমলের ৩২ কেজি ওজনের ফ্যান, হ্যাজাক বাতি, সের মাপের বাটখারা, বুনো মহিষের শিং, উটের হাড়, সাপের বীণ, অন্ধদের লিখন পদ্ধতির ব্রেইল, গানের কল, অশুরের হাড়, ব্রিটিশ আমলের কুড়াল, গাইতি, খড়ম, বিশালাকৃতির তাম্রপাতিল, পাললিক শিলা, চরকা, আচড়া, পিতলের হুক্কা, তামার কড়াই, এয়ার গান, কয়েক শ বছরের পুরনো রৌপ্য মুদ্রা, ফেরাউন-ক্লিওপ্যাট্রার মমি, সুরা পানপাত্র, ক্যান্ডেল, বাংলা সিনেমার রিল, ধুনট, বন্যবৃক্ষ, ঘোড়ার চামড়া, গ্রামোফোন রেকর্ড, ব্রিটিশ আমলের ঘড়ি, ক্যামেরা, বোতাম; ছিক্কা, জন্ম তিথি কুষ্ঠী, বৌদ্দ প্রেয়ার হুইল, ৯৩টি দেশের নানা সময়ের মুদ্রা, সিঙ্গিং বোল, গৌতম বুদ্ধের সময়কার তালা, কাঁসার পাতিল, নানা রকমের বদ্যযন্ত্র ইত্যাদি। যেভাবে গড়ে ওঠে জাদুঘরটি ১৯৮৮ সালে নাজমুল আবেদীন তখন কুমিল্লা জিলা স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ওই সময়ে দাদা-দাদি, নানা-নানি থেকে পুরনো ও হারিয়ে যাওয়া জিনিসপত্রগুলো সংগ্রহ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে দেখেন সংগ্রহশালা বড় হয়ে উঠছে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চিন্তা করেন বিদেশ ভ্রমণ শুরু করবেন। মাঝে সহকারী শিক্ষকের চাকরি নেন কুমিল্লা জিলা স্কুলে। এরপর ছুটির দিনগুলো কাজে লাগান তিনি। ভ্রমণ করতে থাকেন ভারত, ভুটান, নেপাল, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে। পাশাপাশি বাংলাদেশের এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ঘুরে বেড়ান তিনি। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জিনিসপত্র সংগ্রহে ভীষণ বেগ পেতে হয়েছে তাকে। কারণ মানুষ নিজেদের হারানো ঐতিহ্য সহজে হাতছাড়া করতে চান না। এতে খুব সম্মোহনী শক্তির অধিকারী হতে হয় নাজমুল আবেদীনকে। নিজের জাদুঘর আছে এবং এসব জিনিসপত্র অদূর ভবিষ্যতে সংরক্ষণেই থাকবে এমন আশ^াসে এসব জিনিস মানুষ থেকে সংগ্রহ করেন তিনি। এতে দামও দিতে হয় তাকে। এ পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ টাকার জিনিসপত্র কিনেছেন তিনি। শ্রম হয়েছে অবর্ণনীয়। বিয়ে হওয়ার পর স্ত্রীও স্বামীর কাজের অংশীদার হয়ে যান। দুই ছেলে রূপক ও পলক এখন পড়েন কুমিল্লা জিলা স্কুলের দশম ও নবম শ্রেণিতে। খুব ছোট বেলা থেকে তারাও বাবাকে নানাভাবে সহায়তা করতে থাকেন। নাজমুল আবেদীনের বাবা ড. জয়নাল আবেদীন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাংলার অধ্যাপক ছিলেন। উদার চিত্তের অধিকারী হওয়ায় তিনি সন্তানের কাজে কখনো বাধা প্রদান করেননি। বরং অর্থনৈতিকভাবে সাপোর্ট করে গেছেন তিনি। সব দিক থেকে জোরালা সমর্থন পাওয়ায় দমে যাননি নাজমুল। দিন দিন বাড়াতে থাকেন কুমিল্লা জাদুঘরের জৌলুস। সংগৃহীত জিনিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম দিয়ে সংগ্রহ করতে হয়েছে তামার পাতিলটি। ২০১৭ সালে চাঁদপুর থেকে পাতিলটি সংগ্রহ করতে হয়। যার ওজন বিশ কেজি। দাম পড়ে ১৫হাজার টাকা। আরেকটি সাপের বীণ। এছাড়া গৌতম বুদ্ধের সময়কার তালাটি ২০০৫ সালে ভারত-নেপাল সীমান্তের কাছাকাছি জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এর দাম পড়ে সাড়ে চার হাজার টাকা। দাম কম হলেও গুরুত্বের দিক থেকে সবচেয়ে দামি জিনিস এই তালাটিই-মনে করেন নাজমুল আবেদীন। নাজমুল আবেদীন কান্ত জানান, ‘জাদুঘরটি অনেক বেশি সমৃদ্ধ। নতুন প্রজন্ম বিমোহিত হবে এই জাদুঘরটি দেখে। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আবার তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে। রাজশাসন, ব্রিটিশ আমলের সেই দিনগুলো, আমাদের পূর্বপুরুষদের সংগ্রামমুখর জীবন, দেশ ও বিশে^র নানা প্রান্তের ঐতিহ্য ইত্যাদি বিষয়ে খুব ভালো জ্ঞান লাভের সুযোগ আছে এই জাদুঘরটির মাধ্যমে।’ তিনি জানান, ‘স্বপ্ন ছিল আমার কষ্ট, শ্রম কখনো বৃথা যাবে না। কত কষ্ট করেছি, তা বলে শেষ করতে পারবো না। সাপের বীণ সংগ্রহের জন্য কুমিল্লা জেলার সকল বেদে পরিবারে গিয়েছি, পাইনি। পরে সাভারে বীণের সন্ধান পাই। সেখানে তিন দিন গিয়ে ১২ হাজার টাকা দিয়ে একটি বীণ সংগ্রহ করি। সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছি ব্রিটিশ আমলের ক্যামেরা কিনতে গিয়ে। কুমিল্লার একটি স্টুডিও বিশবারের বেশি গিয়েছি। ওই ব্যক্তি কোনোভাবেই রাজি হন না ক্যামেরা দিতে। সংরক্ষিত রাখব এমন আশ্বাসে অনেকদিন পর এই ক্যামেরাটি আমাকে বুঝিয়ে দেন ওই ব্যক্তি। এখন জাদুঘর হলো, লাইসেন্সও পেয়ে যাব অচিরেই। আগে কুমিল্লা নগরীর আদালতের বাসায়, এখন মগবাড়ি চৌমুহনীর বাসায় জাদুঘর করেছি। ভালো জায়গা পেলে দর্শনার্থীদের জন্য এটা উন্মুক্ত করতে পারতাম।’ নাজমুল আবেদীন মনে করেন, জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ইতিহাসের দিক থেকে এমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জিনিস হলো ঢেঁকি, তালগাছের নৌকা ও পালকি। এগুলো চোখের সামনে বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এসবের সংরক্ষণ করার প্রয়োজন মনে করছে না কেউ। তিনি বলেন,‘ আমরা, আমাদের পূর্বপুরুষদের বিয়েতে পালকি ব্যবহার হয়েছে। মা-বোনরা ঢেঁকিতে ধান-চাল ভাঙাতো, তালগাছের নৌকা ছিল চলাচলের প্রধান বাহন।’ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন,‘ আমি জাদুঘরটিতে ঘুরে এসেছি। শিক্ষক নাজমুল আবেদীনের উদ্যোগটি ভালো। আমি জায়গার ব্যবস্থা করে দিব।’
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১