বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৫ September ২০২১

ট্রেনে বন্ধ হচ্ছে না পাথর ছোড়া


ঢাকাগামী কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসে গত ২ সেপ্টেম্বর চলন্ত অবস্থায় পাথর ছোড়া হয়। এতে ট্রেনের সহকারী চালক কাওসার আহমেদ মারাত্মক আহত হন। তার চোখে কাচের টুকরা ঢুকেছে বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান। এর একদিন পরই ৩ সেপ্টেম্বর আন্তঃনগর তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পাথর ছোড়ে দুর্বৃত্তরা, এতে জানালার কাচ ভেঙে এক মধ্যবয়সী নারীর চোখে আঘাত লাগে। মারাত্মক আহত নারীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ট্রেনে পাথর ছোড়া নতুন কিছু নয়। এ কারণে অনেকের চোখ নষ্ট পর্যন্ত হয়েছে। বিপজ্জনক এ পাথর ছোড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে ট্রেনের চালক থেকে শুরু করে যাত্রী পর্যন্ত। এনিয়ে রেলওয়ে নানা জনসচেতনতামূলক প্রচার চালালেও কিছুই কাজে আসছে না। থামছে না ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনা।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্র জানায়, এক বছরে ৭৪টি পাথর হামলার ঘটনায় ৬৩টি ট্রেনের দরজা-জানালার কাচ ভেঙেছে। আহত হয়েছেন ২০ জন। এর মধ্যে দুজন চালক ও একজন সহকারী চালকও ছিলেন। এছাড়া দুজন গার্ড, একজন সহকারীও আহত হয়েছেন। অন্যরা শিশুসহ নানা বয়সের যাত্রী। পাথর নিক্ষেপের কারণে ট্রেনে এখন যাত্রীরা জানালার পাশে বসতেই ভয় পায়।

জানা যায়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সারা দেশের ২০ জেলার ৭০টি স্থানকে পাথর নিক্ষেপের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ১৫টি জেলা পড়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মধ্যে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে আছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, পঞ্চগড়, সৈয়দপুর, ডোমার, পাকশী, ঈশ্বরদী বাইপাস, পোড়াদহ জং, মিরপুর, ভেড়ামারা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, আক্কেলপুর, জয়পুরহাট, খুলনার দৌলতপুর, ফুলতলা, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, দর্শনা হল্ট, আলমডাঙ্গা, লালমনিরহাট, নোয়াপাড়া, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, পাঁচবিবি ও চাটমোটর।

পশ্চিম রেলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট শহিদুল ইসলাম বলেন, শিশু-কিশোরেরা ট্রেন যাওয়ার আগে লাইনে কান পেতে শোনে। এতে তারা বুঝতে পারে ট্রেন আসছে। তখন রেললাইন থেকে পাথর নিয়ে তারা প্রস্তুত থাকে। কে কোন বগিতে মারবে, কে কাচ ভাঙবে, কে ইঞ্জিনে মারবে এসব প্রতিযোগিতা করে। এটা তারা খেলা মনে করে। এ জন্য যাত্রী ও রেলের চালক-সহকারীদের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। যেহেতু শিশু-কিশোরেরা কাজটি করে, তাই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে সচেতনতায় জোর দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ না করার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরিতে লিফলেট তৈরি করে বিতরণ করা হয়। রেললাইনের পাশের মসজিদের ইমামদের এসব লিফলেট দেওয়া হয়। তারা জুমার দিন পড়ে শোনান। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়ে কাজ করা হয়। আরএনবি ও জিআরপি পুলিশও কাজ করে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সভা করা হয়। পাশাপাশি ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে এর কুফল সম্পর্কে শিশুদের অবগত করা হয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের পশ্চিমের পুলিশ সুপার (এসপি) সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা যত ঘটনা পেয়েছি, তার ৮০ শতাংশ শিশুকিশোরদের কাজ। পাথর নিক্ষেপের সঙ্গে শিশুকিশোর জড়িত। তারাই এর ভয়াবহতা না বুঝে এগুলো করে থাকে। ২০১৪ সালের দিকে কিছু নাশকতার ঘটনার সঙ্গে কেবল বড়দের জড়িত থাকার ঘটনা পেয়েছিলাম। তবে বর্তমানে শিশুকিশোররাই এটা করে থাকে।’

রেলওয়ে সূত্রমতে, সারা দেশে দুই হাজার ৯০০ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে ২০ জেলার ওপর দিয়ে চলার সময় ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। পূর্বাঞ্চলের পাঁচটি ও পশ্চিমাঞ্চলে ১৫টি জেলায়। আর গুরুত্বপূর্ণ স্পট হিসেবে ৭০টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।

সূত্রমতে, গত মাসে পূর্বাঞ্চলে চারটি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা রেকর্ড রয়েছে। এই চারটি ঘটনায় ট্রেনের ক্ষতি হয়েছে। তাই এগুলো রেকর্ড রয়েছে। তবে এর বাইরেও ঘটনা ঘটেছে। যেগুলো রেকর্ড হয়নি।

পূর্বাঞ্চলের জিএম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা সচেতন করার চেষ্টা করছি। এর সঙ্গে শিশুরাই বেশির ভাগ জড়িত। আমরা চেষ্টা করছি যাতে না ঘটে।’

পূর্বাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা : ঢাকার কারওয়ানবাজার, বিমানবন্দর, গাজীপুরের টঙ্গী, জয়দেবপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট, দেওয়ানগঞ্জ, বাহাদুরাবাদ, কিশোরগঞ্জ, মোহনগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, চট্টগ্রাম, সীতাকুণ্ড, পাহাড়তলি, বটতলী ও নরসিংদীতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে প্রায়ই খবর আসে।

নিক্ষেপকারীদের বেশির ভাগই শিশুকিশোর : রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মিহির কান্তি গুহ বলেন, জড়িতরা বেশির ভাই শিশু। কয়েকজন টিনএজার একসঙ্গে হলেই ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে মারে। আমরা এসব শিশুকিশোরকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা কোনো কারণ বলতে পারে না। অকারণেই তারা ট্রেনের জানালা টার্গেট করে পাথর নিক্ষেপ করে।

মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় : ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনার সঙ্গে শিশুকিশোররা জড়িত থাকায় বেশির ভাগ সময়ই থানা থেকে মুচলেকা দিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হায়। তবে তাদের অভিভাবকদের সচেতন হতে নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে ও পুলিশ কর্মকর্তারা।

আইন কী বলে : রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারায় ট্রেনে পাথর ছুড়লে যাবজ্জীবন জেলসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। পাথর ছোড়ায় যদি কারো মৃত্যু হয়, তাহলে ৩০২ ধারায় দোষীর মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে। তবে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় শিশু ও কিশোর জড়িত থাকায় তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, তাদের সচেতন করার চেষ্টা চলছে। এছাড়াও নিক্ষেপকারীদের চিহ্নিত করাও চ্যালেঞ্জ। তাদের প্রায়ই চিহ্নিত করা যায় না। তাই তাদের আইনের আওতায়ও আনা যায় না।

সচেতনতার মাধ্যমে প্রতিকার খুঁজছে রেলওয়ে : পূর্বাঞ্চলের জিএম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা চিহ্নিত এলাকায় পুলিশের টহল বৃদ্ধি করেছি। পুলিশ আগের চেয়ে বেশি টহল দিচ্ছে। এলাকার জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, মসজিদের ইমামদের আমরা এ বিষয়ে প্রচারণার জন্য অনুরোধ করেছি। এছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের এই ভয়াবহতা সম্পর্কে বলা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা লিফলেট তৈরি করে সেগুলো প্রচার করছি। মানুষের জীবন নিয়ে যারা খেলা করে আমরা তাদের সতর্ক করছি। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি এর ভয়াবহতা।’


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১