বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৭ September ২০২১

খুঁড়িয়ে চলছে ডিএনসি


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ, অপব্যবহার ও চোরাচালান প্রতিরোধ আইন আছে। কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য নেই যুগোপযোগী কোনো পদক্ষেপ। নেশা বা মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশের একমাত্র সরকারি সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরটিও (ডিএনসি) চলছে খুড়িয়ে। সংস্থাটিতে নেই প্রয়োজনীয় জনবল। নেই অস্ত্র, ট্র্যাকার মেশিন বা ডগ স্কোয়াড। ফলে সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সরাসরি ইনফোর্সমেন্ট কাজে তেমন কোন অগ্রগতি নেই। এ অবস্থায় সংস্থাটিতে জনবল বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও ট্র্যাকার দিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করার সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি সংশ্লিষ্টদের।   

এদিকে, অভিনব পদ্ধতিতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে সীমান্ত পথে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ঢুকছে দেশে। কুমিল্লা থেকে পেঁয়াজের ভেতরে ইয়াবার চালান আনা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সীমান্তে মৌসুমি ফল বহনকারী পরিবহন ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য চোরাচালানের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।

নতুন উদ্বেগের কারণ হলো, মাদকের অপব্যবহার ও চোরাচালানের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ ব্যবহার হচ্ছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি বা সন্ত্রাস প্রসারে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার সীমান্তে মাদক তৈরির ছোট-বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। ফান্ড সংগ্রহে এখন জঙ্গিরা মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, ডাকাতিতে জড়িয়েও পড়ছে।

এদিকে দেশে মাদকের স্রোতে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মাদক। সেই সংগে পাল্টাচ্ছে মাদক পাচারের কৌশলও। নিত্য-নতুন এসব মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড যখন সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন অনেকটাই পিছিয়ে আছে মাদক নিয়ন্ত্রণের অন্যতম সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সক্ষমতার তুলনায় ডিএনসির পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। মাদকদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও চাহিদা হ্রাস, অপব্যবহার ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমসহ কিছু দায়িত্বও আছে সংস্থাটির ওপর। নানা সীমাবদ্ধতায় অন্যান্য সংস্থার সংগে তাল মিলিয়ে কাজ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের। সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে অস্ত্র, ট্র্যাকার মেশিন এবং ডগ স্কোয়াড-এর মতো গুরুত্বর্পূণ বেশ কিছু সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে সংস্থাটি। এই সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে প্রস্তুতকৃত খসড়া নীতিমালা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা।

খসড়া নীতিমালা মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক চূড়ান্ত হলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পরই শুরু হবে বাস্তবায়নের কাজ। এতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও মন্ত্রণালয়গুলোর সুদৃষ্টি আশা করছেন কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসির একজন কর্মকর্তা বলেন, কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর টিম যখন মাদকবিরোধী অভিযানে যায় তখন তাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে অস্ত্র-যান এবং জনবলসহ পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকে। কিন্তু আমাদের সেই সক্ষমতা নেই। আমরা যখন কোনো মাদক পাচারের তথ্য পাই, তখন আমাদের হয়ত অন্য কোনো বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে অভিযানে যেতে হয়, না হয় সক্ষমতা ছাড়াই নিজেদের অভিযান পরিচালনা করতে হয়।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে দুটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। প্রথমত, যদি কোনো বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হয় তাতে সময়ক্ষেপণ হয়। ততোক্ষণে মাদক পাচারকারিরা পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কোনো বাহিনী তো আমাদের জন্য আগাম প্রস্তুত থাকে না। দ্বিতীয়ত, যদি কোনো বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া আমাদের নিজস্ব টিম নিয়ে অভিযানে যাওয়া হয়, তখন মাদকপাচারকারিচক্রের আক্রমণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। অনেকাংশে মাদক কারবারিরা অস্ত্রসহ পাচার কাজ করে। তাই অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ছাড়া মোকাবিলা করাটা আমাদের জন্য ঝুঁকি। এজন্যই অনেক অফিসার মাদক পাচারকারিদের তথ্য পেলেও অনেক সময় অভিযানে যেতে সাহস পান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সক্ষমতা বিবেচনায় বলা হয়েছে প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীগুলো মাদক পাচাররোধে আমাদের সংগে সমন্বয় করে কাজ করবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটির প্রতিপালন ঘটে না। ফলে অন্যান্য বাহিনীগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে আমরাও প্রত্যাশিতভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারি না।

ডিএনসির অপারেশন শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংস্থাটির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরা হয়। সেসময় মাদক কারবারিদের ধরতে অস্ত্র, আঁড়ি পাতার যন্ত্র ও ডগ স্কোয়াডের মতো বেশকিছু চাহিদা উপস্থাপন করে ডিএনসি। সেসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়গুলো গুরুত্বের সংগে গ্রহণ করেন এবং কীভাবে এসব বিষয়গুলো ব্যবস্থাপনা করা হবে সেই বিষয়ে একটা খসড়া নীতিমালা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই কমিটিকে দিতে বলা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসির এক কর্মকর্তা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডিএনসির কাছে জানতে চেয়েছে যদি অস্ত্র দেওয়া হয়, তবে সেটি কীভাবে ব্যবস্থাপনা করবে সেটির লিখিত একটা প্রস্তাবনা দিতে হবে। সেই আলোকে একটা খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এতে অস্ত্র বহন, রক্ষাবেক্ষণসহ যাবতীয় ব্যবস্থাপনার জন্য জনবল চাহিদার কথা তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে ট্র্যাকার মেশিন ও ডগ স্কোয়াড নিয়েও লিখিত খসড়া চেয়েছে। মাদক পাচারকারিদের ট্যাক করতে ট্র্যাকার মেশিন অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে খসড়া তৈরি করা হয়েছে। তবে যেহেতু সরকারের একাধিক সংস্থার কাছে ডগ স্কোয়াড রয়েছে, সেক্ষেত্রে আপাতত যদি ডিএনসিকে ডগ স্কোয়াড না দেওয়া হয়, তাহলে কীভাবে অন্যান্য সংস্থা থেকে ডগ স্কোয়াড ভাড়ায় নেওয়া যাবে সেই বিষয়ে দুটি দিক উল্লেখ করে খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।

ডিএনসির অপারেশন সূত্র জানায়, গত দশ বছরে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে সংস্থাটি ১৪টি রিভলবার, ৫৮টি পিস্তল, তিনটি শর্টগান, একটি পাইপগান, চারটি এয়ারগান, ২৫টি ম্যাগাজিন ও ৭১৪টি গুলি উদ্ধার করেছে। এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে অন্যান্য বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা মনে করেন, নিজেদের সক্ষমতা থাকলে এই উদ্ধার কাজ আরো বেগবান হতো।

ডিএনসির পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) ডিআইজি কুসুম দেওয়ান বলেন, আমাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা অনেকগুলো অস্ত্র উদ্ধার করেছি। যদি আমাদের অস্ত্র এবং অন্যান্য সক্ষমতা থাকত তাহলে আমরা আরো বেশি কাজ করতে পারতাম। সেটি সম্ভব হয়নি, কারণ মাদক পাচারকারিরা প্রায়ই আমাদের নিরস্ত্র কর্মীদের ওপর আক্রমণ চালায়। আমাদের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। সরাসরি যারা মাঠে কাজ করছেন, তাদের অস্ত্র দেওয়া দরকার। সেই সংগে অন্যান্য সীমাবদ্ধতাগুলোকে সমান গুরুত্ব দিলে এই সংস্থা আরো ভালো করবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুস সবুর মন্ডল বলেন, আমাদের যে সক্ষমতা আছে সেটি নিয়ে আমাদের কাজ অব্যাহত আছে। তবে আরো ভালো করতে আমরা বেশ কিছু বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার পর উনারা খসড়া নীতিমালা চেয়েছেন। গত ছয়-সাত মাস ধরে আমরা সেইসব বিষয়ে প্রাথমিক খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছি। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে সেগুলো মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে পাঠানো হবে। উনারা এগুলো দেখে হয়ত আরো সংশোধন দেবেন। এরপরই চূড়ান্ত নীতিমালা দেব।

তিনি বলেন, বিষয়টি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আমরা চাইছি যতোটা দ্রুত করা যায়। যদি মন্ত্রণালয় থেকে খসড়ার অনুমোদন মেলে তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে আশা করছি বেশি অপেক্ষা করতে হবে না। মূলত ওনাদের সুদৃষ্টি পেলেই বিষয়গুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১