আপডেট : ১২ September ২০২১
আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী মৃত্যু। মাটির এই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী সর্বমহলেই যার স্বীকৃতি রয়েছে অপরিহার্যরূপে। প্রতিদিনই অসংখ্য প্রাণী মৃত্যুর মিছিলে শরীক হচ্ছে। দুদিন আগে পরে আমরা সবাই সে মিছিলের যাত্রী। মৃত্যুর কাছে আমরা বড়ই অসহায়। কখন কার ডাক চলে আসে বুঝা বড় দায়। বিদায়ের এই তালিকায় কখন কার নাম উঠে আসে বলা অসম্ভব। আবহমান কাল থেকেই সবাই এই বাস্তবতার মুখোমুখি। মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এবং চলতেই থাকবে। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। তবুও কিছু কিছু মৃত্যু আছে, যা দিগ-দিগন্তে শোকের আবহ ছড়িয়ে দেয়। হূদয়ে হূদয়ে কান্নার জোয়ার বয়ে যায়। জনপদ থেকে জনপদে দীর্ঘকাল সে মৃত্যুর অনিঃশেষ হাহাকার বিরাজ করে। একটি জাতির মৌলিক কাঠামোতে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। অনন্তকাল তাদের শূন্যতা অনুভব হতে থাকে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট এই জনপদ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আবহমান কাল থেকেই ইসলামের জন্য অত্যন্ত উর্বর একটি ভূমি। দীর্ঘকাল যাবত এই জনপদে আল্লাহতায়ালার অনিঃশেষ দয়া ও করুণা বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। এর জ্বলন্ত প্রমাণ প্রতিকালেই যুগশ্রেষ্ঠ আলেমদের আবির্ভাব। যাদের সীমাহীন আত্মত্যাগ আর জাতির প্রতি অতুলনীয় দরদ ভালোবাসা প্রবাদতুল্য। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত হয়েও ভাঙা ঘরে অবস্থান করেও জাগতিক সকল মোহের জাল ছিন্ন করে আপামর জনতার দীনি চেতনা এবং পরকালীন মুক্তির পথকে সুগম করতে তাদের অপরিসীম ত্যাগের গল্পগুলো রীতিমতো হতবাক করে দেয়। জাতির ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক সফলতার জন্য গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি আর দিনের বেলায় মানুষের কাছে অত্যন্ত দরদের সাথে ইসলাম উপস্থাপনের পবিত্র দৃশ্য হূদয়ে স্নিগ্ধতার প্রলেপ মেখে দেয়। বরকতময় এই মিছিলের একজন গর্বিত সদস্য ছিলেন নিভৃতচারী প্রচারবিমুখ এক জ্ঞানসাধক দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন শিক্ষাপীঠ ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার বরেণ্য মুহাদ্দিস বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী আইনজ্ঞ (মুফতিয়ে আজম) মুফতি আবদুস সালাম চাটগামী (রহ.)। যিনি জ্ঞানসাধনায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে একটি ঈর্ষণীয় জীবনযাপন শেষে লক্ষ লক্ষ ছাত্র ভক্ত অনুরাগীদের কাঁদিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, রোজ বুধবার ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বুধবার সকাল সাড়ে ১১ টায় হাটহাজারী মাদরাসার পরিচালনা কমিটির পরামর্শ সভা চলাকালে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর অ্যাম্বুলেন্স করে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তিনি হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক পদে নিযুক্ত হন। জন্ম ও পড়াশোনা : মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী (রহ.) ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা মহামনীষী। আল্লাহভীরু ও উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্ন আলেম হিসেবে তিনি সবার কাছে অত্যাধিক গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, বরং পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী (রহ.) ১৯৪৩ সালে মোতাবেক ১৩৬৩ হিজরিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার নলদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে গ্রামে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে বাবুনগর মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জিরি মাদ্রাসায় চার বছর পড়াশোনা শেষে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ইসলামী শিক্ষার একাডেমিক সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। মুফতি সাহেব ছিলেন প্রখর মেধার অধিকারী। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব পরীক্ষায় সব সময় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে নিজের ঈর্ষণীয় মেধার স্বাক্ষর রাখেন। তাছাড়া ছাত্র সংসদ জমিয়তুত তালাবার জিরি শাখার প্রধান হিসেবে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা : ১৯৬৭ সালে বাংলাদেশের (প্রথম) মুহাদ্দিস আল্লামা আবদুল ওয়াদুদ (রহ.)-এর নির্দেশনাক্রমে মুফতি আবদুস সালাম (রহ.) পাকিস্তানে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া আল্লামা বান্নুরি টাউন করাচিতে ভর্তি হন। তৎকালীন বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা মুহাম্মদ ইউসুফ বানুরি (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে প্রথম বছর তিনি উচ্চতর হাদিসশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরের বছর সেখানে ইফতা বিভাগ চালু হয়। এ সময় তিনি আল্লামা বানুরি (রহ.)-এর নির্দেশে ইফতা বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে আল ফিকহুল ইসলামী (ইসলামী আইনশাস্ত্র) নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেন। এ সময় হাদিস ও ফিকাহ বিষয়ক গভীর ব্যুৎপত্তি অর্জনে তিনি অসংখ্য গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। যার ফলে ইসলামী আইন ও হাদিস বিষয়ে তিনি উপমহাদেশের একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তিন দশক প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন : ঈর্ষণীয় মেধা ও অসাধারণ যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ হাদিস ও ইফতা বিভাগের শিক্ষা সমাপ্তির পর একই প্রতিষ্ঠানের মুফতি হিসেবে তিনি নিয়োগ পান। পাকিস্তানের বিখ্যাত মুফতি ওলি হাসান টুংকি (রহ.)-এর বার্ধক্যজনিত অসুস্থার কারণে মুফতি আবদুস সালাম (রহ.) ভারপ্রাপ্ত প্রধান মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এ সময় নিজের মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে মুফতি ওলি হাসান টুংকির মৃত্যুর পর তিনি বিশ্বখ্যাত এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান মুফতির পদ লাভ করেন। লক্ষাধিক ফতোয়া প্রদান : একজন বাঙালি আলেম হিসেবে বিষয়টি যেমন অনেক গর্বের ছিল, তেমনি তাঁর গভীর জ্ঞান ও প্রতিভার দৃষ্টান্ত ছিল। করাচির বিশ্বখ্যাত জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়ার এ পদে তিনি দীর্ঘ তিন দশক দায়িত্ব পালন করেন। এ প্রতিষ্ঠানের ইফতা বিভাগে প্রতি বছর ৯ হাজারের বেশি ফতোয়া জমা হতো৷ সেই হিসেবে এ দীর্ঘ সময় তিনি দুই লাখের বেশি লিখিত ফতোয়া সম্পাদনা করেন। যা ওই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করে। জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া আল্লামা বান্নুরি টাউন করাচির দ্বিতীয় মহাপরিচালক আল্লামা আহমদুর রহমান (রহ.) বলেন, ‘ফাতওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী এক অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন।’ (বাইয়্যিনাতে বান্নুরি, পৃষ্ঠা-২৪৪) প্রধান মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুফতি আবদুস সালাম একই প্রতিষ্ঠানে প্রসিদ্ধ হাদিসগ্রন্থ সহিহ মুসলিম ও সুনানে তিরমিযি গ্রন্থের পাঠদান করেন। এছাড়াও করাচির ঐতিহ্যবাহী আহমদ উসমানি জামে মসজিদের খতিবও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রচনাগ্রন্থ : মুফতি আবদুস সালাম (রহ.) লেখালেখির অঙনেও যথেষ্ট কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি একজন সফল লেখক। তাঁর রচিত ‘জাওয়াহিরুল ফাতওয়া’ ফতোয়া জগতে সাড়া জাগানো নির্ভরযোগ্য একটি গ্রন্থ। ৪ খণ্ডের অনবদ্য এ গ্রন্থটি ছাড়াও করাচির প্রথম সারির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশি এ আলেমের একাধিক গ্রন্থ মুদ্রিত হয়। তাঁর উল্লেখ্যযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আছে, ‘মাকালাতে চাটগামী’, ‘করোনাকালীন সমস্যা ও তার শরয়ী বিধান’, ‘দিল জাগানো সুরভী মালফুজাতে বোয়ালভী (রহ.), ‘বিতর নামাজ ও রাকাত সংখ্যা’, ‘ কোরবানি আহকাম ও জরুরি মাসায়েল’, ‘আহকামে তাওহিদ ও রেসালাত’ ইত্যাদি। হাটহাজারি মাদরাসায় যোগদান : ২০০০ সালে মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী ইসলামী শিক্ষা প্রসারে নিজ দেশে ফিরে আসেন। কথিত আছে যে, করাচির বান্নুরি টাউন থেকে চলে এলেও বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে অন্য কাউকে প্রধান মুফতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি; বরং দেশে ফিরেও বিশেষ সম্মাননা হিসেবে মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী প্রধান মুফতি পদে ছিলেন। এরপর দারুল উলুম হাটহাজারীর মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর আহ্বানে ২০০১ সালে হাটহাজারী মাদরাসায় প্রধান মুফতি হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর নিয়োগের পর হাটহাজারি মাদরাসায় ২ বছর মেয়াদি উচ্চতর হাদিসশাস্ত্র বিভাগ চালু হয়। একজন আন্তর্জাতিক মানের ইসলামিক স্কলার ও ফতোয়া বিশেষজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও মুফতি সাহেব ছিলেন প্রচারবিমুখ নিভৃতচারী সহজ সরল একজন মানুষ। নীতির প্রশ্নে অত্যন্ত কঠোর এই মানুষটি আচার-আচরণ, চাল-চলন সব ক্ষেত্রেই সারল্য বজায় রেখে চলতেন। জাগতিক মোহ, সুনাম সুখ্যাতি আর প্রতিভার প্রদর্শনী থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করা ছিল তার সারাজীবনের অভ্যাস। নিজের জমি বিক্রি করে নিজের লেখা বই প্রকাশ করে পাঠকদের হাতে পৌঁছে দিয়ে তিনি এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বাংলাদেশের আকাশে ভয়াল দুর্যোগের পূর্বাভাস। সংকটের বেড়াজালে আবদ্ধ দেশের তাওহীদি জনতা। চেতনার বাতিঘর বিশ্বাসের অত্যুজ্জ্বল মিনার যুগশ্রেষ্ঠ মনীষী আলেমদের বিদায়ের মিছিল সে সংকটকে ক্রমেই ঘনীভূত করে তুলছে। জাতির পথপ্রদর্শক মহীরুহতুল্য উলামায়ে কেরামের ক্রমাগত চলে যাওয়া আমাদেরকে অভিভাবকহীনতার ঘোর অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। আল্লাহ! আপনি আমাদের ওপর দয়া করুন। মুরব্বী আলেমদেরকে দীর্ঘ হায়াত দান করুন। মুফতি আবদুস সালাম চাটগামী (রহ.)সহ প্রয়াত সব আলেমকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। লেখক : খতীব, আউচপাড়া জামে মসজিদ টঙ্গী গাজীপুর
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১