আপডেট : ০৪ October ২০২১
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনীতির মাঠে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ইসলাম ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনগুলোর তৎপরতা। ভোটের মাঠে প্রভাবশালী ইসলামী দলগুলোকে কাছে পেতে তৎপর আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকেন্দ্রিক নির্বাচনি জোট। আওয়ামী লীগ মনে করছে, ইসলামপন্থিদের বেশি করে কাছে টানা গেলে বিএনপির ভোট কমবে। আর বিএনপি মনে করছে, ৯০ শতাংশ মুসলিমের এদেশে ইসলামপন্থি দলগুলোর একটি বিশেষ ভোট ব্যাংক রয়েছে। এ ছাড়া আন্দোলনের মাঠে এরাই তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে থাকে। তাই আন্দোলন ও ভোটের মাঠ দখলে রাখতে ইসলামপন্থি দলগুলোকে জোটে রাখতে চায় বিএনপি। এদিকে অতীতের অভিজ্ঞতা ও বঞ্চনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য নতুন করে হিসাবনিকাশ শুরু করেছে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো। তাই দ্বাদশ নির্বাচনের আগে প্রভাশালী ইসলামী দলগুলো নিয়ে তৈরি হতে পারে পৃথক রাজনৈতিক জোট। আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে ইসলামী দলকে প্রতিষ্ঠিত করতে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে বড় দলগুলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসলামী দলগুলো ক্রমান্বয়ে রাজনীতিতে কৌশলী হয়ে উঠেছে। তাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অবস্থান তৈরি করতে ইসলামী দলগুলো জোটবদ্ধ হয়ে পৃথক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। তা ছাড়া এদের সম্মিলিত শক্তি যে-কোনো বড় রাজনৈতিক দলকে চ্যালেঞ্জ জানাতেও সক্ষম। যার শক্তির জানান দিয়েছিল ২০১৩ সালে হেফাজতের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ সমাবেশ। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনকালীন সরকারসহ নানা বিষয়ে নিয়ে সংশয় ও আলোচনা থাকলেও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে ইসলাম ধর্মভিত্তিক দলগুলো। যদিও নির্বাচন কমিশনে এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি। এর মধ্যে ইসলামপন্থি দল মাত্র ১০টি। এর মধ্যে ছয়টিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে আছে দুটি দল, খেলাফত মজলিস (ইসহাক) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (আবদুল মোমেন)। নিবন্ধিত বাকি দুটি ইসলামী দল ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলন (আতাউল্লাহ) কোনো দিকে যায়নি এখনো। এদিকে বড় তিন ইসলামী দল রয়েছে তিন অবস্থায়। নিবন্ধিত দলের বাইরে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে বড় দল জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট (একাংশ) বিএনপির সঙ্গে ২০-দলীয় জোটে আছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই পীর) ও ইসলামী ঐক্যজোট (আমিনী) ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের এই অংশ বিএনপির সঙ্গে ছিল না। অন্যদিকে অনেক আগেই জামায়াত নিবন্ধন ও প্রতীক হারিয়েছে। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর নিবন্ধন পেয়েছিল বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী। দলটির নিবন্ধন নম্বর ছিল ০১৪। উচ্চ আদালতের আদেশে ২০১৩ সালে দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। পরে ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর দলটির নিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করে ইসি। জামায়াতের দলীয় প্রতীক ছিল দাঁড়িপাল্লা। হাইকোর্টের মনোগ্রাম দাঁড়িপাল্লাকে কোনো রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না বলে উচ্চ আদালত আদেশ দেয়। এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো দল দাঁড়িপাল্লাকে তাদের দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না বলে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই সঙ্গে জামায়াতের প্রতীকটিও বাতিল করে ইসি। এখনো ইসলামী আন্দোলন স্বতন্ত্র অবস্থানে আছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আশির দশকে কিছু বাম দল তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টার কথা প্রচার করলেও ভাঙতে ভাঙতে এবং জনবিচ্ছিন্ন হতে হতে বাম শিবির প্রায় শেষ। নেতৃত্বে দৃঢ়তার অভাব, ব্যক্তিস্বার্থ, অদূরদর্শিতা, সুবিধাবাদিতা, পারিবারিক বিরোধ, লক্ষ্যহীনতা ও আপসকামিতায় অভ্যস্ত হয়ে বাম শিবির ধীরে ধীরে জন সমর্থন হারিয়ে ফেলে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বড় দুই দলের বাইরে তৃতীয় শক্তি সৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে ইসলামী ধারার দলগুলোর মধ্যে। তাই আগামী নির্বাচনের আগে ইসলামী দলগুলোর জোট হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গত শুক্রবার (১ অক্টোবর) বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছেড়েছে শরিক দল খেলাফত মজলিস। এক প্রেস ব্রিফিং থেকে দলটি লিখিত বক্তব্যে জানায়, ‘রাজনৈতিক জোট ইস্যুকেন্দ্রিক গঠিত হয়। জোট কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। খেলাফত মজলিস ২০ দলীয় জোটে দীর্ঘ ২২ বছর যাবৎ আছে। ২০১৯ সাল থেকে ২০ দলীয় জোটের দৃশ্যমান রাজনৈতিক তৎপরতা ও কর্মসূচি নেই। ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে ২০ দলীয় জোটকে কার্যত রাজনৈতিকভাবে অকার্যকরও করা হয়। এমতাবস্থায় আদর্শিক, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, ২০১৯ সালের শুরা বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খেলাফত মজলিস আজকের মজলিসে শুরার অধিবেশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, খেলাফত মজলিস একটি আদর্শিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে স্বকীয়-স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে ময়দানে ভূমিকা রাখবে এবং এখন থেকে ২০ দলীয় জোটসহ সব রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করছে।’ এর আগে, চলতি বছরের গত ১৪ জুলাই বিএনপি জোট ছাড়ে শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। তারও আগে ২০১৬ সালের ৭ জুন বিএনপির জোট ছেড়ে যায় মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোট। এ ছাড়া শোনা যাচ্ছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল থেকে বেরিয়ে আসবে অন্যান্য ইসলামী ধারার দলগুলোও। এদিকে ইসলামী শাসনতন্ত্র কোনো জোটবদ্ধ না হয়ে আলাদা রাজনীতি করছে। পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় একটি ফ্যাক্টর। ২০১৩ সালে মহাসমাবেশের মাধ্যমে উত্থান হওয়া হেফাজতও করছে আলাদা রাজনীতি। গত কয়েকটি নির্বাচনে যদিও গড় ভোট কাস্ট কম হয়েছে, তবে ভোটের হিসেবে ইসলামী দলগুলো আগের তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছে। এ ছাড়া অতীতে জাতীয় নির্বাচনেও ইসলামী ঐক্যজোটের প্রয়াত আমির মুফতি ফজলুল হক আমিনী এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মুহম্মদ ওয়াক্কাস ও সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিনুর পাশা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তা ছাড়া এদের ভোট ও সমর্থন নিয়ে বহুবার নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছে বিএনপি। সুতরাং ভবিষ্যতে ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলগুলোর পৃথক জোট হলে ভোটের মাঠে বড় ধরনের প্রভাব রাখবে বলেই আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মনে করেন, ধর্মের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে মানুষ এখনো অভ্যস্ত হয়নি। তবে দেশে যখন কোনো পলিটিক্স না থাকে, যখন শূন্যতা দেখা দেয়, মসজিদকে ঘিরে রাজনীতি করে। ধর্মীয় নেতাদের ঘিরে পলিটিক্স শুরু হয়। এমনটি এখন বাংলাদেশে হচ্ছে। তাই ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশে কাছাকাছি সময়ের মধ্যে শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, বার্তমান দেশে যে রাজনীতি, রাজনৈতিক দলে যে কোন্দল, গণতন্ত্রহীন, দুর্নীতির মহোৎসব, ছাত্র সংগঠনের মধ্যে মারামারি এসব নৈরাজ্য দেখে সাধারণ মানুষ প্রচলিত দ্বারার এ রাজনীতিতে বিমুখ হচ্ছেন। এ অবস্থায় ইসলামী ধারার এ দলগুলো নতুন জোট গঠন করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১