বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৪ October ২০২১

চেসিসের আকার বদলে তৈরি হচ্ছে বাস-ট্রাক


আইন বিরুদ্ধ হলেও মূল কাঠামো পরিবর্তন করেই সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অধিকাংশ বাস-ট্রাক। সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই দিনের পর দিন ধরে চলছে এই অনিয়ম। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে কাঠামো পরিবর্তনের ফলে দুর্ঘটনায় শিকার হচ্ছে যানবাহন।

সরকার নির্ধারিত বিভিন্ন ফি ও যাত্রী ভাড়ায় সুবিধা নিতেই বাস-ট্রাক ও মিনিবাসের মালিকরা এমনটা করছেন। যদিও মোটরযান আইনে এভাবে চেসিস পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ আছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ (বিআরটিএ) সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই এসব কারবার চালাচ্ছেন পরিবহন মালিকরা।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চেসিস পরিবর্তন করে যানবাহনের আকৃতি পরিবর্তন করলে প্রথমেই তা তদারকির এখতিয়ার বিআরটিএ-র। মূলত তাদের গাফিলতি ও লোভের কারণেই এমনটা করার সুযোগ পাচ্ছেন মালিকরা।

বিআরটিএ সূত্র মতে, বাংলাদেশে চলাচলকারী ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও বাসের বেশির ভাগেরই চেসিস আমদানি করে দেশে এনে বডি সংযোজন করা হয়। উৎপাদনকারী কোম্পানি তাদের ম্যানুয়ালে প্রতিটি যানের দৈর্ঘ্য, উচ্চতা ও চওড়া নির্ধারণ করে দেয়। সাধারণ নিয়ম হচ্ছে যানবাহনের বডি চাকার মাপের চেয়ে বেশি বাইরে যেতে পারবে না। আর চালকের কেবিন ও মালামাল বহনের বডি একই মাপের হবে। এছাড়া মোটরযান আইন অনুসারে, মূল কাঠামো বা আকৃতি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সম্পূর্ণ অবৈধ। পরিবর্তিত কাঠামো নিয়ে কোনো যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বিআরটিএ দীর্ঘদিন ধরে এসব যানের নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ দিয়ে আসছে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, আইনে চেসিস পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। চেসিস পরিবর্তন করে থাকলে তা দেখবে বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। তাছাড়া গাড়ির রেজিস্ট্রেশন কিংবা ফিটনেস দেওয়ার সময়ইতো বিআরটিএ-র তা দেখার কথা। তারা কেন এটা দেখছে না!

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও গাবতলীর এলাকার বিভিন্ন গ্যারেজ ও বডি বানানোর স্থানে ইঞ্জিন ও চেসিস বাইরে থেকে আনার পর বডি তৈরির সময় চেসিসের আকার পরিবর্তন করে আসন সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। যাত্রাবাড়ীতে হারুন অটো মোবাইলের স্বত্বাধিকারী হারুন অর রশীদ বলেন, মালিকরা যেমনটা বলে থাকেন তারা তেমনটাই করে দেন। এক্ষেত্রে তাদের কিছু করার নেই। অনেক সময় দেখা যায়, হয়তো যে চেসিসটা দিয়ে ৩৬ বা ৩৭ সিটের গাড়ি হবে সেটাকে বানানো হয় ৪১ বা ৪২ সিটের। আবার ট্রাকের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত বড় বডি তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে প্রথম অবস্থায় ভারসাম্যের সমস্যা না হলেও কয়েক বছর চলার পরে পেছনে যখন চাপ পরে তখন একটু সমস্যা হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতেও, বাস-ট্রাকে অবৈধভাবে কাঠামো পরিবর্তন করার ফলে এসব যান বেশি দুর্ঘটনা ঘটায়। এতে প্রাণহানির ঝুঁকিও থাকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।  বাসের চেসিস পরিবর্তন করা মারাত্মক ধরনের অপরাধ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ।

বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের প্রধান ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, বিআরটিএ থেকে প্রথমেই তো এটা দেখার কথা। এমনটা করলে প্রথমেই তো বাস মালিকের শাস্তি হবে। তিনি বলেন, এভাবে চেসিস বাড়িয়ে বাসের আকার পরিবর্তন করার আত্মঘাতী এবং গর্হিত অপরাধ। এভাবে চেসিস পরিবর্তন করে বাসের আকার বৃদ্ধি করাকে বলে ওভার হেডিং। গাড়ির সামনের ও পেছনের চাকার সেন্টার পয়েন্টের দূরত্বের ওপর নির্ভর করে, পেছনে কতটুকু বাড়নো যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে তা করা হয় না। ইচ্ছেমতো বাড়ানো হয়। হুইল বেজ যা থাকে তার ৬০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হলে গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়বে। তিনি আরো বলেন, আমাদের গেজেটে স্পষ্ট বলা আছে গাড়ির পাশ যতটুকু তার দেড়গুণ হবে মাটি থেকে ওপর পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। এতে গাড়ির স্ট্যাবিলিটি নষ্ট হয়। ফলে যেখানে সেখানে গাড়ি পড়ে যেতে পারে।

সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, অধিকাংশ বাস ও ট্রাক চলে বেপরোয়া গতিতে। এসব বাস-ট্রাকে অবৈধভাবে কাঠামো পরিবর্তন করার ফলেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। তিনি বলেন, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও বাসের যে মুখোমুখি সংঘর্ষ, আসলে সেগুলো প্রকৃতপক্ষে মুখোমুখি নয়। এই তিন যানের দুর্ঘটনার বেশিরভাগই পাশ থেকে আঘাত করার ফলে। কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে চওড়া অথবা লম্বা করার কারণেই এমনটা হয়। আর ট্রাকের বডিতে লোহার অ্যাঙ্গেল এমনভাবে লাগানো, দুর্ঘটনায় পড়লে তা বাসের সবচেয়ে ভঙ্গুর অংশ অর্থাৎ জানালা বরাবর আঘাত করে। এতে মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার হার বাড়িয়ে দেয়।

তবে বিআরটিএর পাশাপাশি পরিবহন মালিকরা এ জন্য দোষারোপ করছে গাড়ি চেসিস আমদানিকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। রাজধানীতে চলাচলককারী ট্রান্সসিলভা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদ আল লতিফ খোকা বলেন, গাড়ির মার্কেটিংকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঘুষ দিয়ে মিনিবাসকে ৩৪-৩৫ সিট করে বড় বাসের পারমিশন নিয়ে আসে। এভাবে ‘জ’ সিরিজের মিনিবাস হয়ে যায় ‘ব’ সিরিজের বড় বাস।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাস মালিক জানান, বড়ি তৈরির আগে নিবন্ধন দেয় বিআরটিএ। একই সঙ্গে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিটও দেয়। নির্ধারিত ফি বাদে কেবল ফিটনেস সনদ নিতেই গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা।

তিনি জানান, বিআরটিএর নিবন্ধন ফি, রুট পারমিট ফি ও সড়ক ফি বাঁচাতে কাঠামো পরিবর্তন করছেন তারা। আদলে বাস হলেও তুলছেন মিনিবাসের ভাড়া।

বাস মালিকদের অভিযোগ, নির্ধারিত ফি বাদেও সড়কে চলতে হয় বিআরটিএকে ম্যানেজ করেই, প্রতিবছরই নিতে হয় নতুন বা পুরাতন বাসের ফিটনেস সনদ। এ জন্য কেবল ঘুষ দিতে হয় ১০ হাজার টাকা করে। রুট পারমিটের জন্যও দিতে হয় ঘুষ। কাঠামো পাল্টে ফেলায় বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হয় তাদের। তা না হলে অভিযানের নামে বিআরটিএর হয়রানির শিকার হতে হয় বলে জানান মালিকরা।

তবে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ নিজেদের ‘নির্দোষ’ বলে দাবি করলেও বাস মালিকদের কাছে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেন। বিআরটিএ-র পরিচালক শেখ মো. মাহবুব-ই-রাব্বানী এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। কিন্তু যেহেতু গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি, গাড়ির মালিকের সংখ্যাও বেশি তাই সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। তবে সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক কিছু বলে মনে করি না।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১