বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৯ October ২০২১

পোস্ট অফিসে ডিজিটাল থাবা : এখন আর চিঠি লিখা হয় না


দিন যাচ্ছে, সেইসাথে বদলে যাচ্ছে যুগও। পাল্টে যাচ্ছে অনেক পুরনো রীতিও। এমন একটি পুরনো রীতি ছিল চিঠি লেখা। এক সময় ছিল পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বন্ধবসহ একে অপরের মধ্যে চিঠি ছিল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। চিঠি চালাচালির মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। এমন সময়ও ছিল যখন পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে দিয়ে খবর পাঠানো হতো। মনের মাধুরী মিশিয়ে চিঠি লেখার মজাই ছিল আলাদা। কাগজে লিখে খামে পুরে চিঠি পাঠানো হতো। চিঠি লেখার জন্য ছিল পোস্টকার্ড ও বিভিন্ন রং-বেরঙের প্যাড। মাধুর্যতা আর মধুময়তায় ওইসব চিঠি নাড়া দিত হৃদয়ের অনুভবে।

তবে ওই সময়টায় ডাকপিয়নেরও কদর ছিল যথেষ্ট। বিশেষ করে প্রেমের চিঠি বিলি করার নানা মজার ঘটনা এখনো অনেকের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। নীল, হলুদসহ নানা রঙের খামের চিঠি আর লাল রঙের সেই ডাকবাক্স আজ যেন অনেকটাই বিলীন হওয়ার পথে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায়, আর তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে বন্দি হয়ে আছে এক সময়ের জনপ্রিয় যোগাযোগ-মাধ্যম চিঠি, ডাকপিয়ন, ডাকবাক্স আর পোস্ট অফিস। এখন আর আগের মতো কদর নেই ওইসবের।

প্রিয়জন, আত্মীয় স্বজনসহ আপনজনের খোঁজ খবর পেতে এখন আর কারও ডাকপিয়নের হাঁক ডাকের অপেক্ষা করতে হয় না। চিঠির আশায় ঘুরতে হয় না ডাকপিয়ন থেকে ডাকঘরে। এই আধুনিক যুগে মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেটের কল্যাণে চিঠির প্রতি শহরসহ গ্রামাঞ্চলে কমবেশি সবার যেন আগ্রহ অনেক কমে গেছে। সময়ের আবর্তনে ধীরে ধীরে অনেক কিছুই পাল্টে যাচ্ছে। এখন আর আগের মতো চিঠি লেখার প্রচলনও নেই। বিদায় নিয়েছে যেন চিঠি লেখাও।

মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এখন আর কেউ কাগজ-কলম নিয়ে একজন আরেকজনের কাছে চিঠি লিখতে বসে না। সেই সময় ও যেনো হাতে নেই। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে যেখানেই থাকুক না কেন অতি সহজে যোগাযোগ ও কথা বলছেন। শহর থেকে গ্রামে কিংবা গ্রাম থেকে শহরে এমনকি প্রবাসী প্রিয়জনের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করতে পারছেন।

আখাউড়া পোস্ট অফিস সূত্রে জানা যায় , এই অফিসের অধীনে ১৫টি ডাকঘর রয়েছে। দৈনিক এই অফিসে ৭০-৮০টি চিঠি আসেছে। প্রতিমাসে গড়ে ২৬শ থেকে ২৮শ চিঠি আসছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে ডাকঘরগুলোতে ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের আদান-প্রদান অনেকটাই যেন কমে এসেছে। শুধুমাত্র অফিসিয়াল, ব্যাংক বিমা, মামলা মোকদ্দমার ও নিয়োগপত্রের চিঠি বেশী রয়েছে। এ উপজেলায় মূলত ট্রেনের মাধ্যমে ডাক বিভাগের চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়।

সক্রিয়ভাবে চালু রয়েছে ডাকঘরের সঞ্চয়ী ব্যাংকিং এর কার্যক্রম। এই সঞ্চয়ী কার্যক্রমে প্রতিদিন অনেক টাকার লেনদেন হয়। এই ব্যাংকিং কার্যক্রমই টিকিয়ে রেখেছে ডাক বিভাগকে।

অফিস সূত্রে জানা গেছে,কাগজে কলমে ডাকঘরে ১১টি মূল সেবার মধ্যে রয়েছে ডাক বিভাগ দেশি-বিদেশি সাধারণ চিঠি, পোস্টকার্ড, রেজিস্ট্রি চিঠি, ডাকটিকিট বিক্রয়, পোস্টাল অর্ডার, মানি অর্ডার, পার্সেল, জিএমই (গ্রান্টেড মেইল এক্সপ্রেস), ইএমএস (এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস), ভিপিপি (ভ্যালু পেবল পার্সেল) ইস্যু ও বিলি, ভিপিএল (ভ্যালু পেবল লেটার), বীমা পার্সেল, স্মারক ডাকটিকিট বিক্রয়, মোবাইল মানি অর্ডার, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, ডাক জীবনবীমা, সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম জমা, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে টাকা পাঠানো ও নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি চালু থাকলেও বেশিরভাগ সেবাই আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেকটাই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।

সরেজমিনে আখাউড়া পোস্ট অফিস ঘুরে দেখা গেছে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র খুব একটা চোখে পড়েনি। যে সমস্ত চিঠি এসেছে তা হলো বিভিন্ন দাফতরিক বা অফিসের চিঠিপত্র। তবে সঞ্চয়ী কার্যক্রমে টাকা লেনদেনে যেন অনেক ভিড়। অন্যান্যকার্যক্রম চলছে অনেকটাই শ্লো গতিতে।

পৌর শহরের তারাগন এলাকার মো. আমান মিয়া বলেন, এক সময় পাড়ার অনেক লোকজন আমাকে দিয়ে চিঠি লিখাত এবং পড়াতো। কোন কোন মাসে ১০-১২ টি চিঠি লিখা এবং পড়তে হতো। এলাকার লোকজন প্রবাসে থাকায় বাড়ি থেকে তাদের চিঠি লিখা এবং প্রবাস থেকে আসা চিঠি পড়ে শুনাতে হতো। গত প্রায় ৮-১০ বছর ধরে কোন প্রকার চিঠি লিখা ও পড়া হয় নাই বলে জানায়। তারা বর্তমানে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করছেন।

মো. আফজাল শরীফ বলেন, সবাই মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। বেশীভাগ অফিসিয়ালি কাজকর্ম ইন্টারনেটের মাধ্যমে করা হয়। প্রয়োজনীয় খোঁজ খবর মোবাইল আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে অতি সহজে যেকোন খবর সেকেন্ডের মধ্যেই আমরা পেয়ে যায়। সেজন্য চিঠির অপেক্ষা আর খিলতে ও হয় না। তিনি আরও বলেন গত ৭/৮ বছরের মধ্যে ব্যক্তিগত কোন চিঠি তিনি লিখেন নি বলেও জানান।

পৌর শহরের কলেজ পাড়া এলাকার গৃহিণী শিরিণ আক্তর বলেন, গত এক দশক আগে তার বাবা আর চাচা প্রবাসে ছিলেন। চিঠি আসছে কিনা জানতে প্রায় সময় পোস্ট অফিসে যেতেন। ওই সময় পোস্ট অফিসে থাকতো লম্বা লাইন। তাছাড়া নিজেও বাবাসহ বন্ধুদের কাছে চিঠি লিখতেন। তাছাড়া পোস্ট কার্ড জমা ও আনতে যাওয়া হতো। মনে হয় এই তো সেদিন এইসব নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কত কিছুই না করেছি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ যেন সব কিছু যেন বদলে গেছে। বর্তমান যুগে পুরনো সেই চিঠি লেখার অভ্যাসটা ও যেনো একেবারেই নেই। চিঠি লেখার সেই জায়গাটি এখন দখল করেছে মোবাইল ফোনের ক্ষুদে বার্তা, ইমেল, ফেসবুকের চ্যাটিং। গত ৬ বছরের মধ্যে কাউকে চিঠি লিখিও নি চিঠি আসেওনি।

আজমপুর এলাকার মো. ফজলুল হক বলে, তার বাবা ও ভাই প্রবাসে থাকায় প্রতি মাসে ২-৩টি চিঠি লিখেতেন। তারা ও মাসে ৩-৪টি চিঠি পাঠাতো। এখন ও দুই ভাই প্রবাসে আছে। কিন্তু চিঠি লিখা হয়নি। ফোনেই সব কিছু করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রিয়াজ আহমেদ বলেন, চাকুরির আবেদন করতে পোস্ট অফিসে যাওয়া হতো। কিন্তু এখন বেশীভাগ ক্ষেত্রে চাকুরির আবেদনও অনলাইনে হয়ে গেছে। তাই যাওয়া হয়না।

আখাউড়া ডাক অফিসের পোস্ট মাষ্টার মো. আজহার উদ্দিন আহমেদ বলেন, মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট এখন প্রত্যেককে অন্যের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে । তবে চিঠি হারিয়ে যাচ্ছে বিষয়টি সঠিক নয়। হয় তো ব্যক্তিগত চিঠি কমে গেলেও ইতোমধ্যে অফিসিয়াল চিঠির পরিমাণ বেড়েছে। তবে ডাক বিভাগের নতুন নতুন সেবা মানুষের কাছে পৌছাতে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহন করেছি। বর্তমানে সঞ্চয় পত্রে ও অন্যান্য আর্থিক কার্যাদি আমরা গুরুত্ব সহকারে সম্পাদন করছি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১