বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১২ October ২০২১

দুর্নীতিবাজ ধরতে দুদকের ফাঁদ

নজর সরকারি-বেসরকারি সেবা খাতে


ঘুষ, অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের ফাঁদ পাতার অভিযান আরো জোরদার করা হচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে প্রায় দুই বছর (২০২০-২১) সংস্থাটির ফাঁদ কার্যক্রম কিছুটা শিথিল ছিল। সম্প্রতি মহামারি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় আবারো এই প্রক্রিয়া বেগবান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদক বলছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি ঠেকাতে দপ্তরগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতি কমবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি ও স্থানীয় সরকারসহ যে-কোনো সরকারি-বেসরকারি সেবা খাতে ফাঁদ পেতে দুর্নীতিবাজ ধরবে দুদক। পাশাপাশি সরকারি দপ্তরগুলোর দুর্নীতিবাজদের তালিকাও করা হচ্ছে।  এ কাজে দুদকের গোয়েন্দা শাখা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকাসহ চালু থাকছে ১০৬ হটলাইন নাম্বার।  যে-কোনো ভুক্তভোগী এ হটলাইন নম্বরে কল করে দুর্নীতিবাজ ধরতে কমিশনকে সহযোগিতা করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতাকারীকে সুরক্ষা দেবে কমিশন। তা ছাড়া শুধু ঘুষ নিলে নয়, যারা ঘুষ দেবে তাদেরকেও গ্রেপ্তার করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে কমিশনকে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে অপরাধী শনাক্তে কেউ ঘুষ দিলে তাকে গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হবে না। সবমিলিয়ে দুর্নীতিবাজদের ধরতে ফাঁদ মামলা প্রক্রিয়া বাড়াচ্ছে সরকারি এই রাষ্ট্রীয় সংস্থা।

দুর্নীতিবাজ ধরার ফাঁদ পদ্ধতিকে আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে করেন সিনিয়র আইনজীবী ও দুদক কর্মকর্তারা। আইনজীবীদের মতে, দুদকের ‘ফাঁদ’ কার্যক্রমের ফলে দুর্নীতিতে ছেয়ে থাকা সরকারি অফিসগুলোতে ঘুষ-দুর্নীতির হার কমে আসবে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাবধান হয়ে যাবে। একই সাথে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ  বেসরকারি সেবা খাতে দুদকের নজরদারি থাকলে অনিয়ম দুর্নীতি অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করছেন তারা। 

২০০৭ সালে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের ‘ফাঁদ’ কার্যক্রম অনুমোদন হয়। ওই বছরই এটি দুদকের ১৬ নম্বর বিধিতে সংযুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধের নিমিত্তে আইনের তফসিলভুক্ত অপরাধে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে হাতেনাতে ধরার উদ্দেশ্যে তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনারের অনুমোদনক্রমে তৎকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফাঁদ মামলা (ট্র্যাপ কেস) প্রস্তুত করতে বা পরিচালনা করতে পারবেন।’ এ ছাড়া বলা হয়, ‘ফাঁদ মামলা তদন্ত কার্যক্রম কেবল তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার বা তদকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিশনের পরিচালক পদমর্যাদার নিচে নয় এমন একজন কর্মকর্তা দিয়ে সম্পন্ন করতে হবে।’

শুরু থেকে দুদকের ফাঁদ কার্যক্রম খুব একটা জোরালো ছিল না। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৪ সালে এ কার্যক্রম শুরু হলেও ২০১৭ থেকে সবচেয়ে বেশি ফাঁদ মামলা করেছে দুদক। দুদকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে ৫টি, ২০১৫ সালে ৪টি, ২০১৬-২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০০টি ফাঁদ মামলা করেছে দুদক। এরমধ্যে সচিব, প্রকৌশলী, ভূমি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, উপজেলা বন, ফায়ার সার্ভিস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, শিক্ষা পরিদর্শক, উপজেলা হিসাব রক্ষণ ও ইউপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক।

মূলত ফাঁদ কার্যক্রমকে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ জোরদার করেন। এরপর ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে আশিটি ফাঁদ মামলা পরিচালনা করে প্রায় একশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। করোনা মাহমারি কারনে ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফাঁদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি দুদক।

অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের দুর্নীতি কমাতে তাদের বেতন দ্বিগুণ করা হলেও দপ্তরগুলোতে এর প্রভাব পড়েনি তেমন। বেতন বাড়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমানে জৌলুস বাড়লেও দুর্নীতি কমেনি। বেতন বাড়ানোর পরও দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ আরো বেড়েছে। কাস্টমস, ভূমি, রাজউক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ওয়াসা এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরতদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়তই দুদকে আসছে বিস্তর অভিযোগ।

সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমানে উন্নতি ও দুর্নীতি কমাতে ২০১৫ সালে বেতন-ভাতা দ্বিগুণ করে সরকার, ২০১৬ সালের ১ জুলাই যা কার্যকর হয়। বেতন-ভাতা বাড়িয়ে সরকারের তরফে বলা হলো, নতুন কাঠামোতে বেতন দ্বিগুণ হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বাড়বে, ফলে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, দুর্নীতি কমেনি। দুদকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দুর্নীতির মামলায় ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। তাদের মধ্যে ৪ শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। দুদুকের বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে দুদকে লিখিত অভিযোগ জমা হয় ১২ হাজার ৫০০টি, ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৪১৫, ২০১৬ সালে ১৩ হাজার, ২০১৭ সালে ১৭ হাজার ৯৮৩, ২০১৮ সালে ১৭ হাজার ও ২০১৯ সালে ২১ হাজার ৩৭১টি। করোনার কারেনে ২০২০-২১ সালে উল্লেখযোগ্য অভিযোগ জমা হয়নি। এসব লিখিত অভিযোগের প্রায় অর্ধেকই সরকারি দপ্তর সংক্রান্ত।

এ ছাড়া ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই দুদকের হটলাইন চালু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ফোনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ২ লাখের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদকে আগে জমা পড়া কয়েক বছরের অভিযোগ বিশ্লেষণ করেও দেখা যাচ্ছে সূচকটি ঊর্ধ্বমুখী। বেড়েছে দুদকের গ্রেপ্তার ও ফাঁদ মামলার সংখ্যাও। দুদকের নথিপত্র বলছে, সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে ভূমি প্রশাসন, আর্থিক খাত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পাসপোর্ট অফিসে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়। দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ বেশি আসছে, অন্য পেশার মানুষের সম্পর্কে অভিযোগ খুবই কম।

দুর্নীতির এ ব্যাপকতা থেকে উত্তরণে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা হাতে নেন দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। সে অনুযায়ী সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ২৫টি দল গঠন করা হয়। দুদকের মামলায় সম্পৃক্ত অবৈধ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্যও পৃথক ইউনিট গঠন করা হয়। এর মধ্যে অনুসন্ধান শেষে সরকারি দপ্তর ও সেবা সংস্থাগুলোতে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের জন্য ১৫টি মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পাঠানো হয়।  

ফাঁদ মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তানবিরুল ইসলাম বলেন, দুদকের ট্র্যাপ কেসের ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে যাওয়া ব্যক্তি তিনি ঘুষদাতা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। কারণ তিনি ঘুষের শিকার হওয়ার সময় ট্র্যাপটা হয়েছে। অর্থাৎ তার কাজটা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা করে দিচ্ছেন না। তখন ঘুষখোরকে ধরার জন্য ঘুষদাতা দুদকের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন। এরপর দুদক থেকে তাকে বলা হয়, আপনি আবার তার সঙ্গে কথা বলেন। তখন তিনি আপনার কাছে ঘুষ চাইলে আমাদের জানাবেন। আমরা গিয়ে তাকে ধরে ফেলব। এ পদ্ধতি যুক্তিসঙ্গত এবং আইনগত কোনো সমস্যা নেই। তা ছাড়া দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় ঘুষ দেওয়া-নেওয়াসহ সরকারি কর্মচারিদের অপরাধ সম্পর্কে আইনই আছে। 

দুদকের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, বিধি অনুযায়ী দুদকের ট্র্যাপ কেস সম্পূর্ণ বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত। দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরদের ধরতে এর কোনো বিকল্প নেই।

দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, দুদক নিজে থেকে কাউকে লোভে ফেলে কিংবা ঘুষ দেওয়ার ফাঁদে ফেলে গ্রেপ্তার করে না কিংবা ফাঁদ তৈরি করে না। যদি কারো কাছে কেউ ঘুষ চায় আর ওই ব্যক্তি যদি দুদকের কাছে অভিযোগ করেন, তখন দুদক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। দুদক স্বপ্রণোদিত হয়ে কিছু করে না।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১