বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৯ October ২০২১

আশান্বিত ডেসটিনি ও যুবকের গ্রাহকরা


ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ৫ সদস্যের বোর্ড গঠন করে দিয়েছে হাইকোর্ট। ফলে গ্রাহকের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইভ্যালির মতো ডেসটিনি ও যুবকসহ যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও পরিচালনা বোর্ড গঠনের পথ উন্মুক্ত হলো। তারা বলছেন, ইভ্যালির মতো এসব প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী পরিচালনা বোর্ড গঠন করে গ্রাহকের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, ডেসটিনি ও যুবকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুরুতেই এ ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালনা বোর্ড গঠন করে গ্রাহকের পুরো টাকা না হলেও অন্তত আংশিক ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি বলেছেন, ডেসটিনি ও যুবকের গ্রাহকদের অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব। তাই ইভ্যালির ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের পরিচালনা বোর্ড গঠন এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে নতুন আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন যুবক, ডেসটিনির গ্রাহকরা।

ঢাকার বিক্রমপুরের নিমতলী এলাকার গৃহিণী লিপি বেগম, যিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠান ডেসটিনিতে ১৬টি ধাপের মধ্যে মধ্যে ১২তম অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তার এবং অধীনস্তদের হাত ধরে অনেকেই ডেসটিনির সঙ্গে যুক্ত হন। দুই শতাধিক লোক ডেসটিনি থেকে  এক কোটি টাকারও বেশি শেয়ার অথবা পণ্য ক্রয় করেন। কিন্তু ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রতারণার অভিযোগে বন্ধ হয়ে গেলে সেই টাকা আজো কেউ ফেরত পাননি। লিপি বেগম জানান, তার কথায় আস্থা রেখে সেই সময় অনেকেই ডেসটিনির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অপরাধবোধের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ঘুমাতে পারতেন না। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ডেসটিনি যেদিন বন্ধ ঘোষণা করা হয় সেদিন থেকে প্রায় দেড় মাস ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে আমাকে ঘুমাতে হয়েছে, যদিও আমাকে কেউই কিছু বলেনি। কারণ যারা টাকা দিয়েছিল তারা সরাসরি কোম্পানিকে জেনেশুনেই দিয়েছিল। কিন্তু আমি যেহেতু তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলাম তাই নিজের মধ্যে অপরাবোধ কাজ করত সব সময়।’

তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আমাদের প্রতি সরকারের কোনো দায় নেই। থাকলে এতদিনে আমরা আমাদের টাকা ফেরত পেতাম।’ ডেসটিনির গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিতে সরকারের কাছে দাবি জানান লিপি বেগম।  

লিপির মতো সারা দেশে প্রায় ৪৫ লাখ গ্রাহক ও কর্মীর কাছ থেকে ডেসটিনির মালিকপক্ষ ও প্রফিট শেয়ার ডিস্ট্রিউবিটর (পিএসডি) কর্মকর্তা যারা এজেন্ট  (ডেসটিনির ভাষায় যাদের ডেরা বলা হয়) হিসেবে কাজ করত তারা হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। ডেসটিনির মতো যুবক নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ৩ লক্ষাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ইউনিপে টু ইউ, ইউনিগেট টু ইউ, গ্লোবাল গেইন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, আপনজন, দি ক্লাসিক লাইফ বিডি প্রাইভেট লিমিটেড  কোম্পানি, দেইসান বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড, এসএমএন গ্লোবাল লিমিটেড, অ্যাডভান্স বাংলাদেশ লিমিটেড, টিয়ানসি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড, ড্রিম টুগেদার লিমিটেড, লাইফওয়ে লিমিটেড, রিচ বিজনেস লিমিটেড, লাকজার গ্লোবাল অ্যান্ড লিমিটেড, এমওয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ফরএভার লিভিং প্রোডাক্টস বাংলা লিমিটেডসহ অসংখ্য এমএলএম কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশিরভাগের অস্তিত্বই বর্তমানে নেই বললেই চলে। তবে ডেসটিনি এবং যুবকের মতো যেসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পুরোটা না হলেও আংশিক বুঝিয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ইভ্যালির মতো ডেসটিনি ও যুবককে পরিচালনার জন্য এভাবে বোর্ড গঠন করা গেলে অন্তত গ্রাহকরা কিছু অর্থ পেত। এখন দীর্ঘদিন পরে এটি করা কিছুটা জটিল হলেও একেবারে অসম্ভব না।’

এদিকে ডেসটিনির প্রফিট শেয়ার ডিস্ট্রিবিউটরদের (পিএসডি) কয়েকজন মিলে প্রতারণার নতুন ফাঁদ হিসেবে আপনজন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে নতুন একটি এমএলএম কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। আপনজনের একজন ডিলার জাকির হোসেন বাংলাদেশের খবরকে জানান, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানটির কাছে এখনো ৪০ হাজার টাকা পাওনা। তার মতো আরো অনেকেই আপনজনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা এখনো দেশে বহালতবিয়তে রয়েছে। সরকার তাদের ধরলেই পাওনা আদায় করা সম্ভব বলে জানান জাকির হোসেন।

ডেসটিনি এবং যুবকের গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী উদ্যোগ নেওয়া হলেও অজানা কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে ডেসটিনি ও যুবকের গ্রাহকরা গ্রাহকরা আশায় বুক বেঁধে আছেন। অথচ এক টাকাও ফেরত পাননি তারা। সরকার প্রতারকদের অনেককে ধরে জেলে পুরেছে। কিন্তু আমরা যদি আমাদের অর্থই ফেরত না পেলাম তাহলে তাদের ধরে কী হবে।

জানা গেছে, ডেসটিনির অনেক সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে। কারখানায় অকেজো পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি। অন্যান্য সম্পদও বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে, অনেক সম্পদ রয়েছে জবরদখলকারীদের কবজায়। ডেসটিনির পার্বত্য এলাকায় কোম্পানির অধীনে থাকা গাছ চুরি হচ্ছে হামেশা। বিভিন্ন ব্যাংকে ডেসটিনি গ্রুপের ৫৩৩টি ব্যাংক হিসাবও জব্দ অবস্থায় আছে। এ অবস্থায় প্রায় ৪৫ লাখ বিনিয়োগকারীর ভাগ্য অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মাঝখানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ শর্ত দিয়েছিল, যদি ৬ সপ্তাহের মধ্যে ৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা অথবা নগদ ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরকারের কাছে জমা দিতে তাহলে ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীন এবং ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন জামিন পাবেন। সেই নির্দেশনা এখনো বহাল। কিন্তু এক টাকাও জমা হয়নি।

আদালতের নির্দেশে ২০১৩ সাল থেকে ডেসটিনির নামে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশকে। রাজধানীতে থাকা ডেসটিনির সম্পদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং রাজধানীর বাইরের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেসটিনির কর্তাব্যক্তিরা কথিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি নিজেদের নামেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ কিনেছেন। এগুলোর মধ্যে বাড়ি, গাড়ি, সিনেমা হল ছাড়াও রয়েছে পাটকল, হিমাগার, টেলিভিশন চ্যানেল ও ধানি জমি। তবে ডেসটিনির সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে ডিএমপির একটি কমিটি রয়েছে। ‘ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি ২০০০ লি. নামক কোম্পানির ক্রোককৃত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি সংক্রান্ত আহ্বায়ক কমিটি।’

একইভাবে, প্রতারণার দায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) গ্রাহকদের অর্থ দেওয়ার কোনো উপায় বের করতে পারেনি সরকার। সাবেক যুগ্ম-সচিব মো. রফিকুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে সরকারের গঠিত ‘যুবক কমিশন’ ২০১৩ সালে যুবকের সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের সুপারিশ করে। এরপর একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হলেও কোনো উপায় বের হয়নি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১