আপডেট : ২৬ October ২০২১
উজানে ভারতের উত্তরবঙ্গে কয়েকদিন রেকর্ড পরিমাণ টানা বৃষ্টিপাত হওয়ায় পানিতে পরিপূর্ণ হয়েছিল তিস্তাসহ অন্যান্য শাখা নদী। বাংলাদেশ অংশে পানি নেমে আসবে জেনেও দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের সবকটি জলকপাট বন্ধ রেখেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে আকস্মিক বন্যার পানির ঢলে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় জেলার ৫ উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। কৃষি, মৎস্য ও পাকা রাস্তাসহ বিভিন্ন সেক্টরে ক্ষয়ক্ষতি হয় প্রায় শতকোটি টাকা। গত ১৯ অক্টোবর মধ্যরাতে তিস্তা ব্যারেজের ৫৪ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেয়। কয়েক ঘণ্টায় লালমনিরহাটের হাতিবান্ধায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের সবকটি জলকপাট পানিতে ভর্তি হয়ে নদীর দু’কূল ছাপিয়ে যায়। পানির প্রবল চাপে ভেঙে যায় তিস্তা ব্যারেজের ফ্লাড বাইপাস। পানির বড় বড় ঢেউ ভয়ংকর আকারে লোকালয়ে প্রবেশ করে। মুহূর্তেই প্লাবিত হয় নিম্নাঞ্চল। পানিতে তলিয়ে যায় কৃষকের সোনার ফসল। এর অনেক সময় পর খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে তিস্তা ব্যারেজের জলকপাট খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তখনো ৭টি জলকপাট খুলে দেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাক দৌলা জানান, ভারত পানি ছেড়ে দিলে দেশের তিস্তা ব্যারেজ পর্যন্ত আসতে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা। কিন্তু এবারে পানি অতি দ্রুত এসেছে। হঠাৎ ভারত পানি ছেড়ে দেবে এটা আমাদের জানা ছিল না। তাই বন্যার আগাম সতর্ক বার্তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে উজানে কয়েকদিন ভারি বৃষ্টিপাত হলে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে পানি বৃদ্ধি পেয়ে থাকে এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৯ অক্টোবর) রাত ১১টা থেকে তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করে। বড় বড় ঢেউ আকারে উজান ধেয়ে আসে পানি। যেন মুহূর্তেই ডুবে যায় তিস্তায় জেগে উঠা চর। তলিয়ে যায় কয়েক হাজার হেক্টর ধানক্ষেত। পানির তোড়ে ভেঙে যায় রাস্তাঘাট। হঠাৎ ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় আতংকে ছোটা ছুটি ও ডাকাডাকি শুরু করে তিস্তা পাড়ের মানুষ। মুহূর্তে অনেক ঘরবাড়ি স্রোতে ভেসে যায়। লোকজন দ্রুত আশ্রয় নেয় নিরাপদ স্থানে। পরদিন বুধবার তিস্তার পানি বেড়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে পানিও বৃদ্ধি পায়। পরে বিকালে পানি বিপৎসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তখন তিস্তার পাড়ের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। পরে রেড অ্যালার্ট (লাল সংকেত) জারি করে তিস্তাপাড়ের মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এদিকে অসময়ে বন্যায় লালমনিরহাট জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাস সড়ক ও কাকিনা-মহিপুর তিস্তা শেখ হাসিনা সেতুর সংযোগ সড়কের প্রায় ১৫০ মিটার অংশ ধ্বসে যায়। পার্শ্ববর্তী জেলা নিলফামারী ও রংপরের সাথে লালমনিরহাটের যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পানিতে ডুবে যায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল। তিস্তার পানির তোড়ে জেলার ৫টি উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকাগুলোর বেশ কিছু কাঁচা-পাকা সড়ক ভেঙে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়ন। ওই ইউনিয়ন পরিষদের চারদিকে সড়ক ভেঙে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই নৌকায় চলাচল করছে। পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন সিঙ্গীমারীতে বাঁধ ভেঙে গেছে। সরেজমিন জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, তিস্তার একদিনের তাণ্ডবে তছনছ হয়েছে ঘরবাড়ি, গাছপালা, ফসলের জমিসহ অসংখ্য স্থাপনা। অনেকের ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সব কিছু ভেসে গেছে নদীর স্রোতে। ভেসে গেছে মাছের ঘের। পানিতে ডুবে ধান, ভুট্টা, আলু, পেঁয়াজ, রসুনের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে ভেসে উঠেছে তিস্তার ভয়াল থাবায় ক্ষত-বিক্ষত চিহ্ন। আকস্মিক বন্যায় সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর বোবা কান্না যেন থামছে না। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে এই ভেবে দিশাহারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তবে পানি কমে গেলেও কর্দমাক্ত ভিটে বাড়িতে এখনো অনেক পরিবার উঠতে পারেনি। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে হাঁসের খামার করা হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম (৩৫) এখন নির্বাক। আকস্মিক বন্যায় তার বাড়িঘরসহ ভেসে গেছে হাঁসের খামার। এখন সে ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে চিন্তায় পড়ছেন। হঠাৎ বন্যায় তিস্তা ব্যারেজের ফ্লাট বাইপাস সড়ক ভেঙে একই এলাকার বকতিয়ার হোসেন (৬৭) এর ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। ঘর মেরামতের টাকা না থাকায় এখনো সে পরিবার নিয়ে ভাঙা ঘরেই অবস্থান করছেন। স্কুল শিক্ষার্থী সঙ্গীতা আক্তার বলে, হঠাৎ পানির স্রোত ঘরে ঢুকলে প্রাণ বাঁচাতে বাবা মাসহ আমরা দ্রুত রাস্তায় উঠি। আমার বই-খাতাসহ বাড়ির সবকিছু ভেসে গেছে। লালমনিরহাট এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফ আলী খান বলেন, বন্যায় পাকা রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্টে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলায়। জেলার ৫ উপজেলার বিভিন্ন পাকা রাস্তা ও ব্রিজ ও কালভার্টসহ ২৫কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম নবী জানিয়েছেন, হঠাৎ বন্যায় মোট ৪৬টি স্কুলে পানি উঠে। এর মধ্যে হাতীবান্ধা উপজেলায় ২২টি স্কুলে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। অনেক স্কুলে ফাটল ধরেছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাকিনার রুদ্রেশ্বর স্কুল অ্যান্ড কলেজের। স্কুলের একটি ভবন পানির তোড়ে ধসে গেছে। লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আশরাফ জানান, বন্যার কারণে জেলায় মোট ৩ হাজার ৩৮০ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৪০৮ হেক্টর জমির আমন ধান নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ভুট্টা -১৯২ হেক্টর, বাদাম ৫২ হেক্টর , আলু ৬৪ হেক্টর, মাশকলাই ৫ হেক্টর, মরিচ-৫ হেক্টর, পেঁয়াজ ১৬ হেক্টর ও ৯১ হেক্টর জমির সবজি পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৩০কোটি টাকা। আর ক্ষয়গ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১৭ হাজার। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম জানান, হঠাৎ বন্য ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরের সংখ্যা ৯৩৬টি। এরমধ্যে মাছ ২২৪ মেট্রিক টান ও ৩৫ লাখ মাছের পোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাছ ও পোনা মিলে ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ১৮লাখ টাকা। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানিয়েছেন, প্রায় ১৬ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এসব পরিবারের ত্রাণ সহায়তার জন্য ১৭৪ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১