আপডেট : ২৭ October ২০২১
দেশে আবারো স্বর্ণের চোরাচালান বাড়ছে। বাংলাদেশের পতাকাবাহী বিমানকে ব্যবহার করেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে স্বর্ণ চোরাকাবারিরা। চলতি মাসে শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ প্রায় ৩৬ কেজির মতো স্বর্ণ জব্দ করেছে। আর গত তিন বছরে জব্দ করা হয়েছে ৪২১ কেজির উপরে। শুল্ক গোয়েন্দা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিজিবি সূত্র বলছে, শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ এনে দেশের সীমান্ত এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। আর প্রতিবেশী দুটি দেশের সীমান্ত ব্যবহার করে মাদক ও অস্ত্র আনতে টাকার বিনিময় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এ স্বর্ণ। অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তরে মাদক ও অস্ত্রের চালান আনতে বিনিময় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে স্বর্ণ। যার কারণে দেশে স্বর্ণ চোরাচালান বাড়ছে। শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ বলছে, চলতি মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত তারা প্রায় ৩৬ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে শাহজালালেই প্রায় ২৬ কেজি আর চট্রগ্রামের শাহআমানতে প্রায় ১০ কেজি। এছাড়া জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৬৭ কেজি। আর গত গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ১৭৪ দশমিক ৪৯ কেজি এবং ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১৮০ দশমিক ৩৫ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার স্বর্ণগুলোর অধিকাংশই উদ্ধার হয়েছে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট থেকে। সর্বশেষ গত সোমবার ১২ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রউফ বলেন, দেশে প্রতি বছর স্বর্ণের চাহিদা ১৬ থেকে ২৬ টন। দেশে চোরাই পথে যে স্বর্ণ আসে তার একটি বড় চালান পাশের দেশে চলে যায়। কারণ ওই দেশের মানুষের স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ ও চাহিদা বেশি। এই স্বর্ণের বিনিময়ে অস্ত্র ও মাদকের লেনদেন হয়। এ কারণে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারায়। তিনি বলেন, আমরা গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছি স্বর্ণগুলো দিয়ে দেশে অস্ত্র ও মাদকের চালান আনার কাজে টাকার বিনিময় হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। শুল্ক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানতে পারে যে, দুবাই-চট্টগ্রাম ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট নম্বর বিজি-৪১৪৮ এর মাধ্যমে রোববার স্বর্ণ চোরাচালান আসতে পারে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিভিন্ন পয়েন্টে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সতর্কতামূলক অবস্থান নেন। পরবর্তীতে দুবাই থেকে আসা বিমানের ফ্লাইটটি আনুমানিক রাত সোয়া ৯টায় হজরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। অবতরণের পর উড়োজাহাজের ভেতরে রামেজিং বা বিশেষ তল্লাশির জন্য প্রবেশ করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। এসময় কার্গো হোল্ডের মাঝখানের প্রবেশ মুখের বামদিকে ফ্লোরে তিনটি কাপড়ের বেল্টের ভেতরে লুকানো কালো স্কচটেপে মোড়ানো তিনটি প্যাকেট খুলে ১০৪টি স্বর্ণবার পাওয়া যায়। যার মোট ওজন প্রায় ১২ কেজি এবং আনুমানিক বাজার মূল্য সাড়ে আট কোটি টাকা। এদিকে সমপ্রতি সীমান্ত এলাকায় বেড়ে গেছে স্বর্ণের চালান ধরা পড়ার ঘটনা। গত ৪-৫ মাস সীমান্ত এলাকায় যে পরিমাণ স্বর্ণের ছোট ছোট চালান ধরা পড়েছে, তার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। আগে স্বর্ণের চালান যশোর ও কুমিল্লা সীমান্তে বেশি ধরা পড়ত। এখন কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় বেশি ধরা পড়ছে স্বর্ণের ছোট ও বড় চালান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের সীমান্ত এলাকায় দিয়ে অস্ত্র ও মাদক আসছে। আর এ অস্ত্র ও মাদকের দাম টাকায় পরিশোধ না করে স্বর্ণের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ফেনসিডিল ইয়াবার বিনিময়ে মাদক কারবারিরা এখন ব্যবহার করছে স্বর্ণের বার। পরিবহনের সুবিধায় তারা এ কৌশল বেছে নিয়েছে। যদিও কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য কমাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ জন্য একের পর এক মাদক উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সমপ্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী বিজিবির সদস্যরা সীমান্তের কাটাখালী ব্রিজ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৬টি স্বর্ণের বার জব্দ করে। আটক করা হয় তিনজনকে। আটকরা হলেন কক্সবাজার সদর উপজেলার মনির আলম (৩৮), টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকার মামুনুর রশিদ (১৮), একই এলাকার নুর মোহাম্মদ (৩৬)। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদ বলেন, গোপন সংবাদে উখিয়া টেকনাফ সীমান্তবর্তী কাটাখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়। জব্দ করা স্বর্ণের দাম প্রায় পাঁচ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অপর অভিযানে টেকনাফ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাস্তার উত্তর পূর্ব পাশে এক বিশেষ অভিযানে ৪২ ভরি ১১ আনা ওজনের ৩টি স্বর্ণের বার জব্দ করে কোস্টগার্ড। এ সময় মো. সেলিম (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা স্বর্ণের বারের আনুমানিক মূল্য ১৮ লাখ ৯১ হাজার ৭৫১ টাকা বলে কোস্টগার্ড জানায়। কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশন) ডিকসন চৌধুরী জানান, অভিযানকালে টেকনাফ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাস্তায় অবস্থানরত একজন সন্দেহ হলে আটক করা হয়। পরে দেহ তল্লাশি করে ৩টি স্বর্ণের বার (৪২ ভরি ১১ আনা) উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিজিবির অভিযানে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৩ কেজি ও জানুয়ারি মাসে দুই কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। পাশাপাশি হরহামেশা দুটি-তিনটি করে স্বর্ণের বার জব্দের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সীমান্ত এলাকায় হঠাৎ করেই স্বর্ণের বারের চোরাচালান বেড়েছে, ধরাও পড়ছে। নজরদারি এড়িয়ে যে স্বর্ণের বারগুলো সীমান্তের ওপারে যাচ্ছে না, এ কথা শতভাগ বলা যাচ্ছে না। যেহেতু ধরা পড়ার ঘটনা বেশি ঘটছে সেহেতু বলা যায় সীমান্ত এলাকায় স্বর্ণের বার আসছে। কর্মকর্তারা বলেন, আগে স্বর্ণের বার যশোর সীমান্তে বেশি উদ্ধার হতো। এখন কক্সবাজার, কুমিল্লাসহ দেশের অধিকাংশ সীমান্ত এলাকায় বেশি পাওয়া যাচ্ছে। সমপ্রতি রাজশাহী ও দিনাজপুর সীমান্তের স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। দেশে যে অস্ত্র ও মাদক প্রবেশ করছে সেগুলোর মূল্য পরিশোধে স্বর্ণের বারগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেহেতু স্বর্ণের দাম বেশি আর পরিবহনও খুব সহজে মূল্য পরিশোধে এগুলো ব্যবহার হচ্ছে। টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাফিজ আক্তার বলেন, কিছুদিন আগে আমরা স্বর্ণের বার জব্দ করি। স্বর্ণের বার জব্দের ঘটনা নতুন। আমরা ধারণা করছি মাদক কারবারিরা ইয়াবার মূল্য পরিশোধ হিসেবে স্বর্ণের বার ব্যবহার করতে পারে। মাদকের মূল্য পরিশোধের জন্য এটি একটি কৌশল বলে মনে করেন তিনি। ওই থানার এক কর্মকর্তা বলেন, কিছুদিন আগে ইয়াবাসহ এক রোহিঙ্গা দম্পতিকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকেও আমরা স্বর্ণ জব্দ করি। এতে মনে হয়েছে ইয়াবার মূল্য পরিশোধের জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। বিজিবির কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদ বলেন, একটি স্বর্ণের বারের মূল্য ৫ লাখের বেশি। এক কোটি টাকার মাদক আনতে ২০টি বারের প্রয়োজন হয়। ২০টি স্বর্ণের অনায়াসে বহন করা যায়। কিন্তু ১ কোটি টাকা এক লোক সহজেই নিয়ে চলাফেরা করতে পারে না। এ কারণে মাদকের টাকা পরিশোধে এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে সাধারণত অস্ত্র ও ফেনসিডিল বেশি আসে। আর মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসে ইয়াবা। ইয়াবা ও ফেনসিডিলের মূল্য পরিশোধে স্বর্ণের বার ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি বলেন, পুরো সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবারিদের ওপর আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে তীক্ষ নজরদারি রেখেছি। এ কারণে মাদক ধরা পড়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। বিজিবি কক্সবাজার সীমান্ত এলাকায় লাখ লাখ পিস ইয়াবা জব্দ করে আসছে। তবে বিজিবির পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা তৎপর রয়েছে। কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার হাসানুজ্জামান বলেন, মাদকের ওপর আমরা কঠোর নজরদারির রেখেছি। সমপ্রতি আমরা সর্বাধিক এক অভিযানে ১৪ লাখ ইয়াবা জব্দ করতে সক্ষম হয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইয়াবা মূল্য পরিশোধে স্বর্ণের বারের ব্যবহারের কথা তিনি শুনছেন। সর্বোপরি এগুলো বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশ ও থানা পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১