আপডেট : ০১ November ২০২১
‘দুই বস্তা বালু আর তিন গাড়ি ইট লাগবে, আর পোলাপাইন থাকলে একটু ঠান্ডা পাঠায়া দিয়েন, আগের জায়গায় আসলেই হবে পাশে নতুন ভবনের কাজ ধরছি তো।’ ‘ঠিক আছে ভাইজান, দাম একটু বাড়ছে, সমস্যা নাই আবার ঠিক হইয়া যাইবো, ভাই টিকটিকি (সাদা পোশাকের পুলিশ) থাকলে আওয়াজ দিয়েন’, ‘ওকে।’ এটি একজন মাঠ পর্যায়ের মাদক ব্যবসায়ী ও ডিলারের ফোনালাপ। রাজধানীতে এভাবে চলছে মাদক বিক্রি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে মোবাইল ফোনে হয় কেনাবেচা। আগের মতো নির্দিষ্ট কোনো স্পট না থাকলেও যে যার জায়গায় বসে শুধু লোকেশন জানিয়ে দিলেই পৌঁঁছে যাচ্ছে মাদক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, আগে রাজধানীর বিভিন্ন চিহ্নিত মাদক স্পট ছিল। একের পর এক অভিযানে এসব স্পট ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদক বিক্রেতা ধরাও পড়েছে। তারপরও বিভিন্ন উপায়ে মাদক এখনো চলছে কেনাবেচা। মাঝে মধ্যে ধরাও পড়ছে। এসব মাদক ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত কৌশল পাল্টে ফেলায় তাদের আটক করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। সাগর (ছদ্মনাম) নামের এক মাদক বিক্রেতা দুবছর জেল খেটে জামিনে বেরিয়েছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি জানান, হাতে টাকা পয়সা নেই যে ব্যবসা করবেন। জামিন করাতেই অনেক টাকা খরচ করে ফেলেছে তার পরিবার। কারাগারে থাকাবস্থায় অনেকবার ভেবেছেন এ ব্যবসা আর করবেন না। কিন্তু অন্য ব্যবসায় টাকা লাগে আর এই ব্যবসা চলে বিশ্বাসের ওপর। আগের ডিলার মাল (গাঁজা, ইয়াবা) না দিলেও অনেক ডিলার আছে। তাদের কাছ থেকে নিয়ে বিক্রি করে টাকা ফেরত দেওয়ার সিস্টেম আছে। এ সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছেন তিনি। ক্রেতার সংখ্যা কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসা পাল্টেছেন নতুন জায়গায় ক্রেতা তৈরিতে সময় লাগবে। তবে পুরনো ক্রেতাদের সঙ্গে আবারো যোগাযোগের চেষ্টা করছেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যেও কিভাবে এ ব্যবসা করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনতো কোনো স্পট নেই, মোবাইলে চলে ব্যবসা। কখনো ইট বালু ও ঠান্ডা বলে অর্ডার দেওয়া হয়। এছাড়া সিমকার্ড, মোবাইলের চার্জারসহ বিভিন্ন এক্সেসরিজের নামে নামকরণ করা হয় একেক মাদকের। এতে পুলিশ মোবাইলে আড়ি পাতলেও বিভ্রান্তিতে পড়ে। বেশিরভাগ সময় নতুন লোক ঠিক করে আনা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যবসায় ডিলারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করলে দীর্ঘদিন ব্যবসা করা যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বনশ্রী, বারিধারা, উত্তরা থেকে ৫০০ গ্রাম আইস ও ৫ হাজার ইয়াবাসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এ চালানের তিনদিন আগে ৫০০ গ্রাম আইস এবং ৬৩ হাজার পিস ইয়াবাসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দুই মাসের ব্যবধানে চট্টগ্রামে চারটি আইসের চালান জব্দ করে র্যাব ও পুলিশ। উদ্ধার করা প্রায় সবকটি চালানেই আইসের সাদা গুঁড়ো বা কাঁচামাল পাওয়া যায়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ক্রিস্টাল মেথ বা মেথ-এমফিটামিন প্রধানত তৈরি হয় থাইল্যান্ডে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারে তৈরি হচ্ছে। মূলত এ তিন দেশ থেকে এগুলো ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক কারবারিরা। ২০১৮ সালের এক পরিসংখ্যান বলছে, মাদকসেবীদের ৫৮ ভাগ ছিল ইয়াবাসেবী। বর্তমান তার সংখ্যা ৮০ ভাগ। বাকি ২০ ভাগ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত। ইয়াবার বেশিরভাগ আসছে ভারত ও মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী, জামালপুরের বকশীগঞ্জ, শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী-নালিতাবাড়ী, ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট ধোবাউড়া, নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সিলেটের সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও কক্সবাজারের টেকনাফ অন্যতম। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, টেকনাফ সীমান্তে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে ইয়াবা পাচারের রুট পরিবর্তন করেছে মাদক কারবারিরা। তারা এখন সরাসরি দেশে ইয়াবা না পাঠিয়ে আগে ভারতে পাচার করে। তারপর এসব সীমান্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি। আগে ১৫ থেকে ২০ টাকায় সীমান্তে পাইকারিভাবে ইয়াবা পাওয়া গেলেও বর্তমান তার দাম বেড়ে ঠেকেছে ৭০-৮০ টাকায়। ইয়াবার রূপ পরিবর্তন হয়েছে। ইয়াবার মূল কারবার হচ্ছে মিয়ানমার। ইয়াবা কারখানাগুলো বন্ধ করতে ওই দেশের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, এর আগেও মাদক কারবারিরা নানা উপায়ে মাদক বাজারজাত করার চেষ্টা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সজাগের কারণে সেগুলো উদ্ঘাটন করে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এ বিষয়টাও নজরদারির মধ্যে রয়েছে। আর আমাদের নিয়মিত অভিযানও রয়েছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১