বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৮ November ২০২১

সব সময়ই বেশি ভাড়া নেন বাস মালিকরা

রাজধানীর কোনো রুটেই ভাড়া ১০ টাকার কম নয়


দেশে যতোবারই পেট্রোল বা ডিজেলের দাম বেড়েছে, ততবারই সরকার ঘোষিত কিলোমিটার প্রতি ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করেছেন বাস মালিক-শ্রমিকরা। যাত্রীদের কোনো প্রতিবাদেই কর্ণপাত না করেনি তারা। তারা যে ভাড়া দাবি করেন তা দিতে বাধ্য হন যাত্রীরা। 

বর্তমানে রাজধানীর কোনো রুটেই বাস ভাড়া ১০ টাকার কম নয়, দূরত্ব যাই হোক। যদিও সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন দূরত্বের ভাড়া ৭ টাকা হওয়ার কথা। এ হিসাবে সর্বনিম্ন ভাড়াও কিলোমিটার হিসাবে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার দ্বিগুণ। তবুও সবগুলো রুটের বাস আদায় করছে অতিরিক্ত তিন টাকা। যাত্রীদের হাজারো প্রতিবাদ ও বিবাদে কোনো কাজ হয়নি। নিয়ম হয়ে গেছে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকাই।

রাজধানীর গুলিস্তান থেকে সদরঘাটের বাহাদুরশাহ পার্ক পর্যন্ত দূরত্ব মাত্র ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। সরকার নির্ধারিত সর্বশেষ হার অনুযায়ী এ পথে ভাড়া হয় ৩ টাকা ৫৭ পয়সা; কিন্তু নেওয়া হয়েছে ১০ টাকা। আর শাহবাগ থেকে ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ কিলোমিটারের সরকার নির্ধারিত হারে ভাড়া হওয়ার কথা ৩ টাকা ৭৪ পয়সা; নেওয়া হয় ১০ টাকা।

তাই প্রশ্ন উঠেছে, এ দফায় ডিজেলের বৃদ্ধির পর সরকার কিলোমিটার প্রতি নতুন ভাড়া নির্ধারণ করলেও সেটা পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা মানবেন কি না। নাকি আবারো জিম্মি হবে যাত্রীরা। এরইমধ্যে ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে পরিবহন বন্ধ রেখে সারা দেশের মানুষকে গত তিনদিন ধরে জিম্মি করে রেখেছেন পরিবহন মালিকরা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমানে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত আদায় করছে পরিবহন মালিকরা। এ অবস্থায় বাসের ভাড়া বাড়ালে তা বাস্তবতার নিরিখে হতে হবে। আমরা মনে করি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া বাড়াতে হবে। এ ভাড়া যেন বাস্তবায়নযোগ্য হয়। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত যেন কেউ আদায় করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে কঠোর হতে হবে।

এদিকে, পরিবহন মালিকদের প্রভাবশালী নেতা খন্দকার এনায়েত উল্যাহও নগরীর ‘কিছু রুটে’ বাড়তি ভাড়া আদায়ের কথা স্বীকার করছেন। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রায়ই ব্যবস্থা নেওয়া হয় দাবি করে তিনি বলেন, দূরপাল্লার অনেক গাড়ি আছে কম ভাড়াও নেয়। ঢাকা একটু ব্যতিক্রম, এখানে কোথাও কোথাও অনিয়ম হয় সেটা অস্বীকার করার কারণ নেই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এই মহাসচিব বলেন, নতুন করে ভাড়া নির্ধারণের পর  আমিও চাই এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে। প্রশাসনের লোক, বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে এমন হবে না।

ডিজেলের দাম বাড়ায় বাসের পাশাপাশি গ্যাসচালিত বাসও বন্ধ রাখা হয়েছে এই ধর্মঘটে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। এ বিষয়ে পরিবহন মালিকরা বলছেন, সিএনজিতে চলে এমন বাসের সংখ্যা ‘খুবই কম’। তাছাড়া গত ছয় বছরে গ্যাসের দাম ১৩ টাকা বাড়লেও ভাড়া বাড়েনি।

জানা গেছে, সরকার সবশেষ ২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নগর পরিবহনে বাসের ভাড়া প্রতি কিলেমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা এবং মিনিবাসের জন্য ১ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করে দেয়। বাসের ৭ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ নির্ধারণ করা হয়। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয় ওই বছরের ১ অক্টোবর থেকে।

তার আগে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ১ টাকা ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৪৫ পয়সা করা হয়। ডিজেলের দাম কমায় ২০১৬ সালের ৩ মে দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটের ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ৩ পয়সা কমানো হয়। ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয় ১ টাকা ৪২ পয়সা।

কিন্তু ভাড়ার হার পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে ২০১৯ সালে বিআরটিএতে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সেখানে বলা হয়, ওই বছর গ্যাসের দাম বাড়ায় যানবাহনের পরিচালনা ব্যয় সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়ে যায়। ঢাকা ও আশপাশের জেলায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের ৪০ শতাংশ সিএনজিতে চলে। সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া সবশেষ ২০১৫ সালে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া ডিজেলচালিত বাসের ভাড়াও বাড়ানো হয়নি।

এ কারণে পরিবহন মালিকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন দাবি করে সারা দেশে সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে। সে সময় নগর পরিবহনের বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে এক টাকা ৭০ পয়সা বাড়িয়ে দুই টাকা ২১ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। আর দূরপাল্লা বাস ভাড়া এক টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭ পয়সা করার কথা বলা হয়েছিল। তবে বিষয়টি পরে আর এগোয়নি।

এবাব ডিজেলের দাম এক লাফে বেড়ে ৬৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা করায় গত বৃহস্পতিবার বিআরটিএর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো পরিবহন মালিক সমিতির প্রস্তাবে বলা হয়, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরসহ সারা দেশের দূরপাল্লার রুটে গত ৮ বছর কোনো ভাড়া বাড়ানো হয়নি। কিন্তু এ সময়ে গাড়ির চেসিস, টায়ার, টিউব, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং সব ধরনের কর ও ফি বেড়েছে। এ কারণে গাড়ির পরিচালন ব্যয় ‘কয়েকগুণ’ বেড়ে গেছে।

এ বিষয়ে পরিবহন মালিকদের আরেক বড় সংগঠন বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক রাকেশ ঘোষ বলেন, ২০১৯ সালে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া বাড়িয়ে ২ টাকা ৭ পয়সা করার আবেদন করেছিলেন তারা। এরপর যন্ত্রপাতির দাম, টোলসহ সবকিছুই বেড়েছে। আমাদের প্রস্তাব একটা দেওয়া আছে।

প্রতিবার সরকার সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। তবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায়ের অভিযোগ সবসময় করে আসছেন যাত্রীরা। এ অবস্থায় নতুন ভাড়া নির্ধারণ পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা মেনে চলবে কি না সে প্রশ্ন তুলেছেন যাত্রী ও অধিকারকর্মীরা।

কারণ সাইনবোর্ড থেকে গুলিস্তানের দূরত্ব সাড়ে আট কিলোমিটার। প্রতি কিলোমিটার হিসাবে ভাড়া আসে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা। এ রুটে চলাচলকারী প্রায় প্রতিটি বাসে ভাড়া নেওয়া হয় ২০ টাকা করে। মহাখালী থেকে বিমানবন্দরে পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার দূরত্বে ভাড়া আসার কথা ১৭ টাকা; নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। ভাড়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয় স্বল্প দূরত্বের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।

রায়েরবাজারের বাসিন্দা মো. রফিক তিনি বলেন, ভাড়া নিয়ে বিশৃঙ্খলা সবসময়ই ছিল। শত চিৎকার-প্রতিবাদেও কোনো সমাধান হয়নি। গা সওয়া হয়ে গেছে সবার। এটা সব সময়ই হচ্ছে। যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার আসলে কেউ থাকে না। যারা কথা বলেন তারাও বাসে চড়েন না কখনও। ফলে যাত্রী অধিকারের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায় সব সময়। নতুন ভাড়া নির্ধারণের পর তা যেন মালিক-শ্রমিকরা মেনে চলেন, এটা নিশ্চিত করতেই হবে।

দূরত্বের হিসাবে কারসাজি করে নারায়ণগঞ্জ থেকে গুলিস্তান রুটের বাসগুলো আগে থেকেই বেশি ভাড়া নিচ্ছে বলে অভিযোগ নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আলী আহম্মেদের। তিনি বলেন, গুলিস্তান থেকে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাটের দূরত্ব ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার। প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৭০ পয়সা হিসেবে ভাড়া আসে ২৯ টাকা ৭৫ পয়সা। এ রুটের বিভিন্ন পরিবহনের বাসে ৩৬ টাকা করে আদায় করা হয়। ডিজেলের দাম বাড়ার পর গত বৃহস্পতিবার ওই ভাড়া এক লাফে বাড়িয়ে ৫০ টাকা করে ফেলেছে।

এছাড়া ঢাকার গুলিস্তান থেকে নরসিংদী বাসস্ট্যান্ডের ব্যবধান ৪৮ কিলোমিটার। ১ টাকা ৭০ পয়সা হিসাবে ৮১ টাকা ৬০ পয়সা ভাড়া হলেও নেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা করে। এ রুটের নিয়মিত যাত্রী কবির উদ্দিন বলেন, ভাড়া আগে থেকেই বেশি নেওয়া হচ্ছে। এখন সুযোগ পেয়ে আরো বাড়াবে। তারা দাবি করে কাউন্টার সার্ভিস। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলে-সিটিং সার্ভিস শুধু মুখে আর কাগজেই। মাঝেমধ্যে এমন ভিড় হয় যে কোথাও নামার সময় অনেক ধাক্কাধাক্কি হয়।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১