বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৯ November ২০২১

বাস-লঞ্চে ​ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য


সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টানা তিন দিন পরিবহন বন্ধ রেখে শেষ পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েই গতকাল সোমবার থেকে চলতে শুরু করেছে বাস ও লঞ্চ। কিন্তু সরকারি নির্ধারিত ভাড়া না মেনে ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এমনকি সিএনজিচালিত বাসেও নেওয়া হয় বাড়তি ভাড়া। এই বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাখ্যান করেছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি। আগামী ১৮ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকায় হরতাল ডেকেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)। এ ছাড়া আগামীকাল ১০ নভেম্বর জেলা শহরে এবং ১২ নভেম্বর প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।

গতকাল যাত্রীরা অভিযোগ করেন, কোনো বাসেই নতুন ভাড়ার তালিকা নেই। এ সুযোগে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হয়েছে তাদের। এ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ তারা। আবার অনেকের আর্থিক সামর্থ্যেও পড়েছে টান। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ভাড়া বৃদ্ধিতে জনগণের বিষয়টি দেখা হয়নি। এতে বাসমালিকরা সব সুবিধা লুটে নিচ্ছেন।

এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আইন লঙ্ঘন করে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন অনুযায়ী জ্বালানির দাম বাড়ানোর এখতিয়ার একমাত্র বিইআরসি’র। বিপিসি তেলের দাম বাড়িয়ে আইনটির ৩৪(৪) উপধারা লঙ্ঘন করেছে। আইনের ৪৭ ধারায় আইন লঙ্ঘনের শাস্তির কথাও বলা আছে।

তাই অবিলম্বে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করে প্রক্রিয়া অনুসারে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসি’র কাছে পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন ড. শামসুল আলম। এরপর তারা তাদের প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রস্তাব যাচাই করবে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে বাস-লঞ্চের একচেটিয়া বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাখ্যান যাত্রীকল্যাণ সমিতি। গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিশুকল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার মালিকদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী একচেটিয়াভাবে বাস ও লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। এতে মালিকরা জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্যের অধিক হারে মুনাফা লুটপাটের সুযোগ পেয়েছেন।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সহনীয় মাত্রায় ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। কিন্তু ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন হয়নি। বাস ও লঞ্চমালিকদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে সরকার তাদের চাহিদা অনুযায়ী একচেটিয়া ভাড়া বাড়িয়ে দিতে যাত্রী প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে বাস ও লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধি করেছে।

বিআরটিএ ও বিআইডাব্লিউটিএ’র অনেকেই মালিকদের পকেটে ঢুকে পড়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি আরো বলেন, যাত্রীর স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে গলাকাটা ভাড়া নির্ধারণের ফলে দেশের নিম্ন ও মধ্য-আয়ের জনসাধারণকে আরো এক দফা গভীর সংকটে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরীতে যেভাবে বাসভাড়া বাড়ানো হয়েছে তা জুলুম বলা চলে। সিএনজির মূল্যবৃদ্ধির পর এক দফা ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল, আবার তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর আবার ভাড়া বাড়ানো হলো। এতে যাত্রীসাধারণ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরীর বর্ধিত বাসভাড়া কার্যকরের আগে এখানে কতগুলো বাস গ্যাসে চলে আর কতগুলো তেলে চলে তার সুরাহা হওয়া দরকার। ভাড়া নির্ধারণের ব্যয় বিশ্লেষণে পুরোনো বাসকে নতুন বাস হিসেবে দেখানো হয়েছে। চালক-হেলপারদের বেতন, বোনাস প্রদানের মিথ্যা তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ২০ বছরের পুরোনো বাসেও ব্যাংক লোন দেখানো হয়েছে। এভাবে নানা খাতে অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখিয়ে এক লাফে এক টাকা ৪২ পয়সার ভাড়া এক টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। তাই বর্ধিত গণপরিবহন ভাড়া প্রত্যাখ্যান করে একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য বাস ও লঞ্চভাড়া নির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানায় যাত্রীকল্যাণ সমিতি।

ধর্মঘট প্রত্যাহারের পর গতকাল সকাল থেকে নতুন ভাড়ায় চলছে বাস-মিনিবাস ও লঞ্চ। ডিজেল ও কেরোসিন তেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে রোববার বাসভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই মালিকপক্ষ ধর্মঘট প্রত্যাহার করে বাস চালানোর ঘোষণা দেয়। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে পরিবহন মালিকদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্তে দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে  এক দশমিক ৮০ টাকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাসে দুই টাকা ১৫ টাকা করে ভাড়া দিতে নির্ধারণ হয়। মিনিবাসের ক্ষেত্রে এ ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি এক দশমিক ৬০ টাকা থেকে বেড়ে করা হয়েছে দুই টাকা ০৫ টাকা। সবশেষ দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে এক দশমিক ৩৯ টাকা এবং মহানগরের ক্ষেত্রে এক দশমকি ৭০ টাকা ভাড়া ছিল। এই হিসাবে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ এবং মহানগরীতে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভাড়া বাড়ছে। এ ছাড়া বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসে আট টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সিএনজিচালিত বাসের ক্ষেত্রে এ ভাড়া প্রযোজ্য হবে না। এ ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত বাসের জন্য।

অন্যদিকে  লঞ্চে প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারের জনপ্রতি ভাড়া ৬০ পয়সা থেকে বৃদ্ধি করে দুই টাকা ৩০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১০০ কিলোমিটারের অধিক দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোামটারে জনপ্রতি যাত্রী ভাড়া ৬০ পয়সা বৃদ্ধি করে দুই টাক নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন বাসের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে যত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, বাসগুলোতে নানা অজুহাতে তার চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শুধু ডিজেলচালিত বাসগুলোতে নতুন ভাড়া সংযোজন করা হলেও, সিএনজিচালিত বাসেও বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। এর মধ্যে কিছু বাসে যাত্রীদের সঙ্গে চালকদের বাগ‌বিতণ্ডাও দেখা গেছে। যাত্রীরা বলছেন সরকার নির্ধারিত ভাড়ার প্রায় দ্বিগুণ অর্থ নিচ্ছেন বাসভাড়া। আর বাসের কন্ডাক্টররা বলছেন, নতুন ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটি করে ভাড়া আদায় করতে হচ্ছে। না নিলেও তো আমরা গাড়ি চালাতে পারি না। চালকরা বলছেন, মালিক সমিতি থেকে এখনো তালিকা না দেওয়ায় তারা তা  দেখাতে পারছে না।

গতকাল সকালে মিরপুর, ফার্মগেট, শাহবাগ, পল্টন, গুলিস্তান, সদরঘাট, রামপুরা, বাড্ডা হয়ে হাতিরঝিল ঘুরে যাত্রী এবং বাস চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিএনজিচালিত গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর নির্দেশনা না থাকলেও নেওয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। সিএনজি না ডিজেলচালিত পরিবহন এইরকম দৃশ্যমান কোন কিছু না থাকায় ড্রাইভার এবং হেলপাররা নিজেদের ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। এতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় বাসে চলাচলকারী যাত্রীদের।

হাতিরঝিল চক্রাকার বাসগুলো এতদিন সবাই জানত সিএনজিচালিত কিন্তু এখন যাত্রীদের ডিজেলচালিত বাসের মতো প্রতি স্টপেজ বাড়তি ৫ টাকা করে ভাড়া দিতে হচ্ছে। হাতিরঝিল এলাকা চক্রাকারে ঘুরতে আগে ৩০ টাকা লাগত এখন লাগছে ৪০ টাকা। কারওয়ানবাজারের এফডিসি থেকে মেরুল বাড্ডা আগে ভাড়া ছিল ১৫ টাকা এখন সেটা করা হয়েছে ২০ টাকা।

রামপুরা থেকে এফডিসি মোড়ে আসা শাহীন নামে এক যাত্রী বলেন, ড্রাইভার এবং হেলপার বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে উপস্থিত প্রমাণ করে বুঝতে বাধ্য করছেন যে তাদের গাড়ি সিএনজিচালিত।

তবে কামাল নামে এক গাড়িচালক বলেন, সিএনজি হোক আর ডিজেলচালিত গাড়ি হউক মালিকরা আমাদের এইভাবেই ভাড়া আদায় করতে বলেছে। দেখছেন না সিএনজিচালিত বাস হইয়াও ধর্মঘটের সময় রাস্তায় গাড়ি চালাই নাই।

সদরঘাট থেকে মিরপুরের বিহঙ্গ পরিবহনে আসা মারুফ নামে এক যাত্রী বলেন, সিএনজিচালিত বাসে উঠেও আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে এটা ডিজেলচালিত বাস। এত বছর ধরে জানলাম যেসব বাস সিএনজিচালিত হঠাৎ করে সকালে উঠে দেখলাম এগুলো রাতারাতি ডিজেলচালিত হয়ে গেছে। সদরঘাট থেকে বিহঙ্গ পরিবহনে আগে ভাড়া ছিল ৩০ টাকা ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন নিচ্ছে ৪৫ টাকা। সিএনজিচালিত হওয়ায় এই বাসের ভাড়া ১৫ টাকা বৃদ্ধি করার কথা না কিন্তু জোরপূর্বক আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বিহঙ্গ পরিবহনের এক চালক বলেন, গ্যাসের গাড়িকে কি আপনে ডিজেলের গাড়ি কইতে পারবেন। নিজে দেখেন ট্যাংকি খুইল্লা গ্যাস না ডিজেল। সব ডিজেলচালিত গাড়ি বলে মুখ ঘুরিয়ে নেন তিনি।

সিএনজিচালিত তুরাগ পরিবহনের কন্ডাক্টর মাসুদ বলেন, সরকার ভাড়া বাড়িয়েছে তাই আমরাও বেশি ভাড়া নিচ্ছি। সিএনজিচালিত বাসে ভাড়া তো ভাড়া বাড়েনি তাহলে আপনারা কেন নিচ্ছে এমন প্রশ্নে এই কন্ডাক্টর বলেন, এটা আমি জানিনা। আমাদের এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। শিগগিরই আমাদের ভাড়ার চার্ট দেওয়া হবে। নতুন চার্ট দিলে সেই অনুযায়ী ভাড়া নিব।

নুর হোসেন নামে এক যাত্রী বলেন, আমি বাড্ডার একটি ওয়ার্কশপে কাজ করি। খুব অল্প বেতন পাই। তাই হিসেব করে চলতে হয়। শুনেছি সরকার শুধু ডিজেলচালিত বাসের বাড়া বৃদ্ধি করেছে। গ‍্যাসচালিত বাস আগের ভাড়ায় চলবে। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি গ‍্যাসের বাসের জন‍্য। অন্তত ১০টি বাসকে জিজ্ঞাসা করেছি গ‍্যাসে চলে কিনা। সবাই জানিয়েছে তারা ডিজেলে চলে।

এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্য ও বাস ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে আগামী ১৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকায় হরতালের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)।  জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সোমবার দুপুরে এক সমাবেশ থেকে এ ঘোষণা দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ডা. এম এ সামাদ। এ সময় তিনি বলেন, সরকারের এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকায় হরতাল পালন করা হবে। জনগণের দাবি আদায়ের লড়াইয়ে আমি রাজধানীবাসীকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

অন্যদিকে জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সারা দেশের মহানগরগুলোতে আগামী কাল ১০ই নভেম্বর ও জেলা শহরে এবং ১২ই নভেম্বর প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানবন্ধনে এ ঘোষণা দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এ সময় বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকার বারবার জনগণের পকেট কাটছে, তেলের দাম বৃদ্ধির পর এবার বাড়িয়েছে বাসের ভাড়া। ক্ষমতাসীনরা জনগণের কথা চিন্তা না করে নিজেদের পকেট ভারী করছে। 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১