বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২০ December ২০২১

দোয়া ইবাদতের মগজ


সাবরিনা ওবায়েদ আনিকা

 

দোয়া শব্দের অর্থ ডাকা, আহ্বান করা, চাওয়া, প্রার্থনা করা ইত্যাদি। এ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘আহ্বান’ বা ‘ডাকা’, যা ইসলামে একটি বিশুদ্ধ মিনতি প্রক্রিয়া। আল্লাহতায়ালার নিকট কোনো কিছু চাওয়ার জন্য তাঁকে ডাকা বা তাঁর নিকট প্রার্থনা করার নামই দোয়া। দোয়া করার জন্য স্বয়ং আল্লাহতায়ালাই নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো (দোয়া করো), আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো (দোয়া কবুল করবো)।’ (সুরা আল-মুমিন, আয়াত-৬০) ইসলামে দোয়া কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। হাদিসে দোয়াকে বলা হয়েছে ‘মুখখুল ইবাদত’ বা ইবাদতের মগজ বা সারবস্তু। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে দোয়া-ই ইবাদত।

 

হাদিস শরিফেও এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চই দোয়া ইবাদত।’ এরপর তিনি ওপরে উল্লিখিত আয়াত তেলাওয়াত করেন। (তিরমিযি, হাদিস নং-২৯৬৯) নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লাম দোয়া শুধু ইবাদত বলে ক্ষান্ত হননি, অন্য একটি হাদিসে তিনি দোয়াকে ইবাদতের মগজ বলেছেন। তিনি বলেন, ‘দোয়া ইবাদতের মগজ।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-৩৩৭১)

 

দোয়ার ব্যতিক্রমী কিছু বৈশিষ্ট্য

এক. আল্লাহপাক বান্দার দোয়াতে স্বয়ং সাড়া প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘যখন কোনো প্রার্থনাকারী আমার কাছে প্রার্থনা করে, তখন আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দেই (কবুল করি)।’ (সুরা বাকারা, আয়াত- ১৮৬)

দুই. দোয়া মহান রবের নিকট অধিক প্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর নিকট বান্দার দোয়ার চেয়ে অধিক প্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ জিনিস আর নেই।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-৩৩৭০)

তিন. দোয়ার হাত অধিক পূর্ণতা পায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ অত্যন্ত লাজুক ও দয়ালু। যখন কোনো বান্দা তাঁর নিকট দুহাত উঠিয়ে দোয়া করে, তিনি তার দুহাত শূন্য ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-৩৫৫৬) চার. দোয়া মহান রবের সন্তুষ্টিলাভের অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে এর দৃষ্টান্ত হলো : ‘যে আল্লাহর নিকট দোয়া করে না, আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হন।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-৩৩৭৩)

 

পাঁচ. দোয়া রব্বে কারিমের রহমতলাভের বড় হাতিয়ার। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যার জন্য  দোয়ার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ, যাকে দোয়া করার তাওফিক দান করা হয়েছে) তার জন্য রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-৩৫৪৮) ছয়. দোয়া ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক। আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কেবল দোয়া-ই ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে। মানুষের উপকার ও কল্যাণের কাজে আয়ু বৃদ্ধি করে।’ (তিরমিযি, হাদিস নং-২১৩৯)

সাত. দোয়া হলো দীনের খুঁটি। হাদিস শরিফে এসেছে :  দোয়া হলো মুমিনের অস্ত্র, দীনের খুঁটি এবং আসমান ও জমিনের নূর (আলো)।’ (জামিউস সুন্নাহ, হাদিস নং-৩৪১৪) এ ছাড়াও দোয়ার মাধ্যমে মহান মনিবের ইবাদতে লিপ্ত হলে আত্মা প্রশান্তি লাভ করে, পেরেশানি দূর হয় ও মনের মাঝে বিচরিত বেদনার ভার কমে যায়।

 

দোয়া এমন একটি জিনিস যাতে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা নিহিত রয়েছে।  দোয়া করতে কোনো ধরনের প্রস্তুতি বা আয়োজন লাগে না। নামাজের জন্য অজু লাগে এবং নির্দিষ্ট নিয়মে আদায় করতে হয়। কিন্তু দোয়ার জন্য সেটাও লাগে না। শোয়া, বসা বা দাঁড়ানো যে কোনো অবস্থাতেই দোয়া করা যায়। তবে অজুর সাথে নামাজের পরে এবং কিছু নির্দিষ্ট সময়ে করলে ফল ভালো পাওয়া যায়। আল্লাহতায়ালা বান্দার দোয়া কবুল করবেন বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নিই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে।’ (সুরা আল বাকারা, আয়াত-১৮৬)

 

সালাম কালামের সময় দোয়া করার নিয়মটা আরব রাষ্ট্রগুলোতে প্রচলিত আছে। বিশেষ করে কারো ব্যাপারে দুঃসংবাদ শুনার পর সাথে সাথে দোয়া করে দেওয়া। এই রীতিটা আমাদের দেশেও চালু করা উচিত। যখন কেউ আপনাকে বলে ‘ভাই আমার জন্য একটু দোয়া করবেন’ তখন আমরা বলি ইনশাআল্লাহ। এখানে ইনশাআল্লাহ বলা হলেও পরে আর দোয়া করতে মনে থাকে না। তাই আমাদের উচিত সাথে সাথে দোয়া করে দেওয়া। অন্তত এতটুকু বলে দোয়া করতে পারি যে, ‘আল্লাহ আপনাকে কামিয়াব/সফল করুন’।

 

দোয়া কবুল হওয়ার উত্তম সময়গুলোর মধ্যে রয়েছে তাহাজ্জুদের সময়, আজান ও একামতের মাঝখানে, শুক্রবার আছরের নামাজের পর, কোনো ভালো কাজ করার পর, নামাজের পর ইত্যাদি। দোয়ার মাধ্যমেই জীবনের গতি পরিবর্তন সম্ভব, এমনকি তাকদির পর্যন্ত এই দোয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন হতে পারে। যারা পাথরে ভাগ্য ফেরে বিজ্ঞাপনের পেছনে ঘুরেন এবং জ্যোতিষীর কাছে যান, তারা জ্যোতিষী আর পাথর বাদ দিয়ে এবার দোয়ার মাধ্যমে ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করুন। হাদিস শরিফে এসেছে, তাকদিরকে কোনো কিছুই রদ করতে পারে না দোয়া ছাড়া।

 

আমরা হাঁটাচলা, বা গাড়িতে বসা অবস্থায়ও দোয়া করতে পারি। নামাজে রুকু ও সিজদার তাসবিহর পর দোয়া করতে পারি। সবচেয়ে ভালো হয় দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পর (তাহাজ্জুদের পর হলে বেশি ভালো হয়) খুব বিনয়ের সাথে খুব মনোযোগের সাথে কান্নাকাটির মাধ্যমে দেয়া করা। কবুল হওয়ার আশা রাখা। নিচু শব্দে দোয়া করা। গোপনে দোয়া করা ইত্যাদি। অনেকেই মনে করেন আমরা আরবী পারি না, তাই দোয়াটা ইমাম সাহেবকে দিয়ে করিয়ে নেই। আবার অনেকে মা বাবার কবর জিয়ারতের কাজটাও ইমাম সাহেবকে দিয়ে করিয়ে নেন। ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবের কারণে তারা এ রকম করেন। মনে রাখতে হবে আল্লাহতায়ালা সব ভাষা বুঝেন। এমনকি মনের কথাও তিনি বুঝেন। আরবী না জানলেও সমস্যা নাই। আপনি আপনার নিজের ভাষায় দোয়া করুন। আল্লাহতায়ালা আমাদের দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।

 

লেখিকা : শিক্ষার্থী (বাংলা বিভাগ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১