বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৯ January ২০২২

হালুয়াঘাটে দুই গারো তরুণী গণধর্ষণ

চারজনের পাহারায় দুই গারো তরুণীকে গণধর্ষণ


বাবা-মামার প্রভাবেই স্থানীয়ভাবে বখাটে ও উচ্ছৃঙ্খল হিসেবে পরিচিত ছিল ময়মনসিংহ হালুয়াঘাটের চাঞ্চল্যকর দুই কিশোরী গণধর্ষণের মূল আসামি সোলাইমান হোসেন রিয়াদ। বাবা সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও মামা বর্তমান সদস্য। এ কারণে আধিপত্য ধরে রাখতে বেপরোয়া ছিল সে। এলাকায় ১০/১২ জনের একটি কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপও নিয়ন্ত্রণ করত। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় মাদকসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব কারণে জেলও খাটতে হয়েছে তার। নানা অপকর্মে গ্রাম্য শালিসেও করা হয় জরিমানা।

চাঞ্চল্যকর দুই কিশোরী গণধর্ষণের ঘটনাটিও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলেও ৬ দিন পর থানায় মামলা হয়।  আলোচিত এ ঘটনার মূল আসামি রিয়াদকে গ্রেপ্তারের পর র্যাব এমন তথ্য দিয়েছে। এজাহারভুক্ত ১০ আসামির মধ্যে প্রধান রিয়াদ। আলোচিত এ ঘটনায় আরো ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ময়মনসিংহ ডিবি পুলিশ।

গতকাল শনিবার কাওরানবাজার র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

তিনি জানান, হালুয়াঘাটের কাটাবাড়িতে গারো সম্প্রদায়ের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিল সোলায়মান হোসেন রিয়াদ (২২) ও তার নয় সহযোগী।

গত ২৬ ডিসেম্বর রাতে ওই বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল গারো সম্প্রদায়ের স্কুল পড়ুয়া দুই কিশোরী। এ সময় তাদের পিছু নেয় তারা। একপর্যায়ে দিবাগত রাত ২টার দিকে পথ আটকে দুই কিশোরীকে গণধর্ষণ করে রিয়াদসহ ছয়জন। এ সময় বাকি চারজন আশপাশে পাহারায় ছিলেন।

এরপর দুই কিশোরীকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এক কিশোরীর বাবা হালুয়াঘাট থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা (নং-২৪) দায়ের করলে প্রধান আসামি রিয়াদসহ তার সহযোগীরা পালিয়ে যায়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন-কচুয়াকুড়া গ্রামের মো. শরীফ (২০), এজাহার হোসেন (২০), কাটাবাড়ি গ্রামের রমজান আলী (২১), মো. কাউছার (২১), মো. আসাদুল (১৯), শরিফুল ইসলাম (২২), মো. মিজান (২২), মো. রুকন (২১) ও মো. মামুন (২০)। গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) হাতে গ্রেপ্তার হন রিয়াদ।

তিনি বলেন, রিয়াদ আগেও এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। সেগুলো সালিশি বিচারের মাধ্যমে সমঝোতা হয়েছিল। গারো সম্প্রদায় ও স্থানীয়রা আমাদের এসব তথ্য জানিয়েছে। ঘটনার পর রিয়াদ একটি মালবাহী ট্রাকে করে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করছিল। পরে গফরগাঁওয়ে আত্মগোপন করে।

খন্দকার আল মঈন বলেন, এলাকায় বখাটে হিসেবে পরিচিত রিয়াদ। ১০ থেকে ১৩ জনের একটি বখাটে দলের নেতৃত্ব দিতো সে। তার কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। ছোটবেলায় তিনবছর মাদরাসায় পড়াশোনা করেছিল। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে রিয়াদ ও তার সহযোগীরা ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিয়াদের বিরুদ্ধে হালুয়াঘাট থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মাদক চোরাচালান মামলা রয়েছে। এর আগেও সে পুলিশের কাছে গ্রেফতার হয়েছে। কারাভোগ করেছে। সে সহযোগীদের নিয়ে এলাকায় মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্ম করে বেড়াতো।

র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, যখন দুই কিশোরীকে ধর্ষণ করা হচ্ছিল সেখানে ১০ বছরের একটি শিশু ছিল। কিন্তু ওই শিশু পালিয়ে বাড়িতে চলে যায়। ভুক্তভোগীরা প্রাথমিকভাবে বিষয়টি গোপন রাখেন। পরে গারো সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে গত ৩০ ডিসেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আল মঈন বলেন, রিয়াদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তবে তার বাবা এলাকার জনপ্রতিনিধি ছিলেন। যেহেতু তার বাবা জনপ্রতিনিধি ছিলেন, সে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তদন্ত করলে এ বিষয়ে  বিস্তারিত জানা যাবে।

গারো সম্প্রদায়ের দুই কিশোরীকে গণধর্ষণের ঘটনায় দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। হালুয়াঘাট সীমান্তসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আসামিদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায় র্যাব। তবে র্যাবের অভিযানের প্রেক্ষিতে আসামিরা আদালতে আত্মসমর্পণের পদক্ষেপ নিচ্ছিল বলে জানা গেছে। রিয়াদের বাকি সহযোগীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

ডিবির হাতে গ্রেফতার আরো ৫ : দুই কিশোরীকে গণধর্ষণের মামলায় আরো পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার আসামিরা হলো- শরিফ, মিয়া হোসেন, মিজান, রোকন ও হামিদ।

গত শুক্রবার রাতে গাজীপুর, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও তারাকান্দায় অভিযান চালিয়ে ওই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি চারজন ও আরেকজন সন্দেহভাজন।

জেলা পুলিশ সুপার  আহমার উজ্জামান বলেন, ঘটনার পর যখন জানতে পারি তখনই কিন্তু আমরা ভুক্তভোগী পরিবারকে অভিযোগ দায়ের করতে বলি। পরে তারা মামলা করেন। সুতরাং প্রথম অবস্থায় মামলা রেকর্ড করতেই কয়েকদিন সময় অতিবাহিত হয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে অভিযুক্তরা গা-ঢাকা দেয়।

তবে থানা পুলিশের সহযোগিতায় ডিবির একটি চৌকস দল বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত চার আসামি ও এক সন্দেহভাজনসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। পলাতক থাকা বাকি আসামিদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সুপার মোহা. আহমার উজ্জামান।

এদিকে আদিবাসী নেতা ও বাংলাদেশ গারো ছাত্রসংগঠনের  কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি নিখিল মানকিন সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি আমাদের জন্য লজ্জার। এর আগেও রিয়াদের গ্রুপ আদিবাসীদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালিয়ে এসেছে। এলাকায় আদিবাসী তরুণীদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত রিয়াদসহ তার গ্যাং। পূর্বে তার অপকর্ম স্থানীয়ভাবে শালিসে বিচার করা হয়েছে একাধিকবার। এবারের ঘটনা আরো জঘন্য।

তিনি বলেন, এবারেও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু প্রশাসন এগিয়ে আসায় তা হয়নি। এ ঘটনায় রিয়াদসহ দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন। 

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১