আপডেট : ০৮ February ২০২২
ক্রমান্বয়ে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে বিলুপ্ত ট্রুথ কমিশনে (ট্রুথ অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি কমিশন) আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের। ট্রুথ কমিশন মার্জনা করলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ক্ষমা করেনি ২৯৭ জন আত্মস্বীকৃত দুনীতিবাজকে। আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্তে মাঠে রয়েছে দুদক। নতুন করে তারা অবৈধ সম্পদ গড়েছেন কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি তখন মার্জনার জন্য যেসব মামলা দুদক থেকে ট্রুথ কমিশনে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোও তদন্ত করছে সংস্থাটি। দুদকের সূত্র অনুযায়ী, আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের তালিকায় ওয়াসা, এলজিইডি, তিতাস গ্যাস, বনবিভাগ, গৃহায়ন অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বিটিসিএল এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম রয়েছে। এদের মধ্যে সওজ, বিআরটিএ, তিতাস ও ভূমি কর্মকর্তাসহ প্রায় অর্ধশত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ পর্যায়ে থাকা এদের ২৫১ জনের তালিকা নিয়ে আবারো মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুদক। ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতার পটভূমিতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেনাবাহিনী সমর্থিত জরুরি অবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সরকার দুর্নীতি দমনের পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করে। ২০০৮ সালের ৮ জুন ট্রুথ কমিশন গঠনের অধ্যাদেশ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। দোষ স্বীকার করলে লঘু দণ্ড দিয়ে দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য গঠিত ট্রুথ কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয় ওই বছরের ৩ আগস্ট। এ আইনে কমিশনের সংজ্ঞা দেওয়া হয় ট্রুথ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি কমিশন (সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন)। কমিশন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার ও অডিটর জেনারেলের সমন্বয়ে গঠিত হয়। কোনো ব্যক্তি তার আয়ের জ্ঞাত সূত্রের বাইরে অর্জিত বা করায়ত্ত সম্পদের সমপরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার শর্তে স্বেচ্ছায় আইন বা বিচারের হাত থেকে অব্যাহতি চাইলে তাকে সেই অব্যাহতি দানের ক্ষমতা এই কমিশনের হাতে দেওয়া হয়। আইন অনুযায়ী কমিশনের কার্যকাল ছিল ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত। ২০০৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়া টাকার চেকসহ প্রতিবেদন তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের কাছে জমা দেন বিলুপ্ত হওয়া ট্রুথ কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি হাবিবুর রহমান খান। সূত্র জানায়, মোট ৪৫২ আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজের মধ্যে দুদকের তালিকাভুক্ত ২৯৭ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাকিরা ২০০৮ সালের গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) হওয়া ট্রুথ কমিশনে যাওয়ায় তাদের ব্যাপারেও সার্বিক তথ্য চেয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠায় দুদক। ‘স্বতঃপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ অধ্যাদেশ-২০০৮’ ও ট্রুথ কমিশন গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট আইনজীবী আদিলুর রহমান খান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আক্তার, আওয়ামী লীগ নেত্রী দীপু মনি এবং মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিন এলানসহ পাঁচজন যৌথভাবে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই বছরের ১৩ নভেম্বর ট্রুথ কমিশন এবং স্বতঃপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ অধ্যাদেশ-২০০৮ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এই রায়ের স্থগিতাদেশ চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে লিভ টু আপিল দায়েরের নির্দেশ দেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল করেনি। ২০১১ সালের ১৬ মে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ বহাল রাখেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে বলা হয়, ‘সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন বা ট্রুথ কমিশন সংবিধান পরিপন্থী। একই অপরাধে কারও প্রচলিত আইনে শাস্তি হবে, আবার কাউকে বিশেষ ব্যবস্থায় অনুকম্পা করা হবে— এমনটা আইনসম্মত নয়।’ এই রায়ের ফলে ট্রুথ কমিশনে দায়মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুদকের ব্যবস্থা নেওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। তবে রায় ঘোষণার দীর্ঘদিন পর অফিস আদেশের মধ্য দিয়ে আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে দুদক। দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছিলেন, ট্রুথ কমিশনের কাছে মার্জনা পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষমা করছে না দুর্নীতি দমন কমিশন। ফলে নিয়ম অনুযায়ী ট্রুথ কমিশনের সব কার্যক্রমকে বাতিল বলে গণ্য করছে দুদক। দুদক সূত্র জানায়- আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের থেকে ইতোমধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সালেহ মো. নুরুজ্জামান ও বিআরটিএ টাঙ্গাইল অঞ্চলের সহকারী পরিচালক কাজী মাহবুবুর রহমান, ডেসার মিটার রিডার আবদুল আজিজ খান, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রোজিনা সুলতানা রিমিসহ প্রায় অর্ধশত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। সম্প্রতি মামলা হয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানরি ব্যবস্থাপক মো. মহিদুর রহমান, তিতাসের বিক্রয় সহকারী শাহানা বিলকিস তার স্বামী আসামি সৈয়দ আয়েজ উদ্দিন আহাম্মদ ও তিতাসের সাবেক বিক্রয় সহকারী ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুক হাসানের রিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি মামলা হওয়া তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ব্যবস্থাপক মহিদুর রহমান অবৈধ সম্পদ ৩৪ লাখ ৭১ হাজার টাকার। মামলায় স্ত্রীকেও আসামি করা হয়েছে। ১ কোটি ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা অবৈধ সম্পদ থাকায় তিতাস-এর বিক্রয় সহকারী শাহানা বিলকিস তার স্বামী আসামি সৈয়দ আয়েজ উদ্দিন আহাম্মদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ১ কোটি ৭০ লাখ ১৩ হাজার ৪৩০ টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য সংস্থাটির সাবেক বিক্রয় সহকারী ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুক হাসানের রিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর এ মামলা দায়ের করেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হারুনুর রশিদ মোল্লা বলেন, অপরাধিরা শাস্তি পাক সেটা আমি চাই। শুধু আত্মস্বীকৃত নয়, বর্তমান দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে তাদের বিচারের আওতায় আনার অনুরোধ করেন তিনি। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন পরিচালক জানান, ট্রুথ কমিশন থেকে অনুকম্পা পাওয়া গেলেও তাদের অপরাধ মোচন হয়নি বলেই দুদক কাজ বিষয় নিয়ে কাজ করছে। দলমত, পরিচিতি এবং কে কোথায় আছে তা কোনোভাবেই দুদক গণ্য করবে না। এখানে নির্মোহ ও নিরপেক্ষ হয়েই আমরা আমদের কাজ করবো। তিনি বলেন, ওই সময় সরকারের কাছে অর্থ জমা দেওয়ার পরই যে তিনি শুদ্ধ বা সৎ হয়ে গেলেন বিষয়টা তা নয়। যদি তাদের মধ্যে দুর্নীতির কোনো নমুনা বা প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে আমরা আমাদের দুর্নীতি কমিশনের পক্ষ থেকে যে আইন প্রয়োগ করার সেটা প্রয়োগ করবো। এ বিষয়ে দুদক সচিব মাহবুব হোসেন বলেন ট্রুথ কমিশন কার্যকর থাকাকালে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত যেসব ব্যক্তি সরকারি কোষাগারে অর্থদণ্ড দিয়ে সাজা মওকুফ পেয়েছিলেন, তারা দুদকের কাছ থেকে কোনোভাবেই ক্ষমা পাবেন না। মৃত্যু ছাড়া দুর্নীতির মামলা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার কোনো উপায় নেই। যেসব দুর্নীতির মামলা ট্রুথ কমিশনে বিবেচনা করা হয়েছে, সেগুলো উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকারি কোষাগারে যে টাকা জমা পড়েছিল, তার কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওইসব টাকার ব্যাপারে দুদকের কোনো দায়দায়িত্ব নেই।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১