আপডেট : ০৮ February ২০২২
রতন বালো : সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার সড়কে নেই কোনো সাইন ও মার্কিং। ফলে সড়কে দুর্ঘটনা নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ১৫৪ কিলোমিটার মহাসড়কে প্রয়োজনীয় সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন এবং চিহ্নিত স্থানসহ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের মূল বিষয়- যানবাহন কোথায় কী বাঁক নেবে, ট্রাফিক কী নির্দেশনা দিচ্ছে, যানবাহনের গতিসীমা কত হবে ইত্যাদি সাইনের মাধ্যমে আগে থেকেই জানতে পারেন চালক। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) ৬৫১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি গত বছর ডিসেম্বরে বাস্তবায়ন দেখানো হয় কাগজে কলমে। তারপরও টেকসই সড়ক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি নিরাপদ মহাসড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। বর্তমানে সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ ২১ হাজার ৩০২ কিলোমিটার। এর মধ্যে মহাসড়ক ৩ হাজার ৮১৩ কিলোমিটার এবং আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪ হাজার ২৪৭ কিলোমিটার। তবে সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রধান চ্যালেঞ্জ। মহাসড়কগুলোতে ট্রাফিক সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপনের হার এখনো সন্তোষজনক নয়। ইতোমধ্যে কিছু স্পটে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত সাইন-মার্কিং করা হয়েছে। এরপরও সাড়ে ৫ হাজার কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে এখনো সাইন-মার্কিং দৃশ্যমান না হওয়ায় কোনোভাবেই সড়ক পথে শৃঙ্খলা ফেরেনি, নিশ্চিত করা যায়নি নিরাপত্তা। ফলে সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, আর ঝরছে প্রাণ। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে পাঁচ হাজার ৪৩১ আর ২০২১ সালে মারা গেছে ছয় হাজার ২৮৪ জন। দেশে করোনা মহামারির প্রকোপ বাড়ার কারণে গত বছর গণপরিবহন বন্ধ ছিল ৮৫ দিন। এরপরও ২০২০ সালের তুলনায় গত বছর সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে, প্রাণহানির ঘটনাও বেড়েছে। তবে জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে সরকার সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সড়ক পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনার কারণে এসডিজি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিএ)-এর প্রধান কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বিআরটিএর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদারসহ অন্যান্য কর্মকর্তারাদের বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা না আসলে যতই উন্নয়ন হোক তাতে কোনো লাভ হবে না। যেকোনো মূল্যে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি বিআরটিএ থেকে যেকোনো মূল্যে দালালের দৌরাত্ম্য দূর করার নির্দেশ দেন। সড়ক দুর্ঘটনায় এখনো বড় দুর্ভাবনা উল্লেখ করেছেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, নিরাপদ ও ভ্রমণবান্ধব সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সরকারের অগ্রাধিকার। এসডিজি অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ সড়ক নিরাপত্তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা এখনো আমাদের বড় দুর্ভাবনা। কিছু পদক্ষেপ সংখ্যাগতভাবে কমিয়ে আনলেও প্রতিদিনই ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। আমার প্রতিদিন সকাল শুরু হয় দুর্ঘটনার সংবাদ দিয়ে। তখন নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হয় হয় বলে তিনি দোষী সাইবস্ত কথা স্বীকার করেন। এদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত নভেম্বর মাসে ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৩ জন নিহত হয়েছিল। গড়ে প্রতিদিন নিহত হয়েছিল ১৩ দশমিক ৭৬ জন। ডিসেম্বর মাসে ৩৮৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪১৮ জন। গড়ে প্রতিদিন নিহত হয়েছে ১৩ দশমিক ৪৮ জন। দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সি কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ৩৩৯ জন, অর্থাৎ ৮১ দশমিক ১০ শতাংশ। দুই মাসের গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক সমস্যা হয়েও দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের উচিত এখন সড়ক নিরাপত্তায় বেশি নজর দেওয়া। অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া প্রভৃতি মূল কারণ বলে চিহ্নিত করার পরামর্শ প্রতিবেদনে বলা হয়। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির হার ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা নিয়ন্ত্রণে সরকারের তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বলে দাবি করেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নেও কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। দুর্ঘটনা ঘটছে মূলত সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে। এ অবস্থার উন্নয়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর দুর্ঘটনার কারণে যে পরিমাণ মানবসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার আর্থিক মূল্য ৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা, যা দেশজ উৎপাদন (জিডিপির-গ্রোজ ডমেস্টিক প্রডাক্ট) দশমিক ৩ শতাংশ। এদিকে, দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালের তুলনায় গত বছর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৫০ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এ কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে ৫১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। দুর্ঘটনার আরো কিছু কারণ হচ্ছে- বেপরোয়া গতি, ড্রাইভার-হেল্পারদের বেপরোয়া মানসিকতা, তাদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, আনফিট যান, ট্রাফিক আইন না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি। পথচারীরা যেমন সড়কে নিয়ম মেনে চলে না, তেমনি যানবাহনগুলোও বেপরোয়া গতিতে চলে। ফলে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে মূলত সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে। এই উদ্বেগজনক অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ বাস্তবায়নেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা ও সরকারের পরিকল্পনায় ঘাটতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা আরো বৃদ্ধি পাবে। পরিবহন খাতে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ভারীযানে দক্ষ চালকের অভাব ও বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল সড়ক দুর্ঘটনা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এসডিজি সম্ভ্যব নয় বলে জানান তিনি।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১