বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১২ February ২০২২

ঈশ্বরদীতে অবৈধ ভাটায় পুড়ছে গাছ, হুমকিতে পরিবেশ ও কৃষি


ঈশ্বরদী উপজেলায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ৫৬টি ইটভাটা। মাত্র দুইটিতে আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। অবৈধ এসব ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে পোড়ানো হচ্ছে গাছের কাঠ। গাছ কেটে কাঠ পোড়ানোর জন্য বসানো হয়েছে সো-কল। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কৃষি আবাদ।

স্থানীয়রা জানান, ভাটার ইট পোড়ানো ধোঁয়ায় বাড়ি ও আশপাশের কোনো বাড়ির গাছে ফল ধরে না। ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফসলি জমির ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষেতের পাশে ইট ভাটা গড়ে ওঠায় আগের তুলনায় উৎপাদন কমে গেছে। সরকার ফসলি জমির ওপর ইট ভাটা স্থাপন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পাঁচ বছরের মধ্যে এসব জমির উৎপাদন শূন্যে নেমে আসবে বলে জানান তারা। এছাড়াও রাতের ধোঁয়া কুয়াশার মতো নিচে পড়ে। ধোঁয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। ইট পোড়ানোর ধোঁয়ায় মানুষের শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ দিয়ে পানি পড়াসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যের সমস্যারও আশঙ্কা করছে তারা।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭-এর ৭ ধারা অনুযায়ী কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানোকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো দন্ডনীয় অপরাধ। ইট পোড়ানো কাজে যদি জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করা হয়, তাহলে ইটভাটার মালিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রথমবার সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে ১ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও সাজার বিধান রাখা হয়েছে। তৃতীয়বার এ অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে ভাটার নিবন্ধন বাতিল ও ভাটা বাজেয়াপ্ত করারও বিধান রাখা হয়েছে। কাগজে-কলমে এসব আইন বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই!

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন ইট ভাটায় আম, জাম, রেন্ট্রি, কদম, জামরুল, কাঁঠাল, খেজুর, নারকেলসহ তিন শতাধিক ফলজ ও বনজ গাছ পোড়ানো হচ্ছে প্রতিদিন। কৃষি জমি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও গড়ে ওঠা এসব ভাটায় স্বল্প উচ্চতার টিনের তৈরি চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এতে ফসলসহ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এরকম চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এই এলাকার পরিবেশ-প্রতিবেশের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।

ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে খড়ি পোড়ানো কেন হচ্ছে জানতে চাইলে ইটভাটার মালিকরা জানান, প্রত্যেক ইটভাটার মালিকই কয়লা দিয়েই ইট পোড়ান। কিন্তু কয়লার দাম বেশি হওয়ায় খরচ কমাতে গাছ পোড়ানো হয়। তাঁরা আরো জানান, এক লাখ ইট ভালো করে পোড়ানোর জন্য প্রয়োজন হয় ১৪-১৫ টন কয়লা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা। সমপরিমাণ ইট পোড়ানোর জন্য প্রয়োজন হয় ৫৬ টন খড়ি। যার বাজার মূল্য দুই লাখ ২৪ হাজার টাকা। এতে ইট প্রস্তুতিতে খরচের হার প্রতি লাখে কমে এক লাখ ৬ হাজার টাকা।

লক্ষ্মীকুন্ডা ইটভাটা মালিক সমিতির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এবার ইটের মৌসুম ভালো। তাই জেলা, উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, থানা, ফাঁড়ি, লক্ষ্মীকুন্ডা নৌ পুলিশ থানা ও ইউনিয়ন পরিষদকে বিশেষভাবে ম্যানেজ করেই এবার ইটভাটা চালানো হচ্ছে। এই সুযোগে ইটপোড়ানো কাজে খরচ কমাতে কয়লার পরিবর্তে প্রতিটি ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে গাছ।

শ্রমিকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাঝেমধ্যেই সাদা পোশাকে লোকজন এসে প্রশাসনের লোক পরিচয় দেন। ইটভাটার মালিকদের সঙ্গে কথা বলেন। টাকা নিয়ে চলে যান।

ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন জয় জানান, সব জায়গা ম্যানেজ করেই এবার ইটভাটা চলছে।

কৃষিতে ইট ভাটার প্রভাব নিয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিতা সরকার বলেন, কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কাটা হলে এর উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়। চার-পাঁচ বছরের ব্যবধানে জমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যায়। ফসলি জমির মাটি কেটে ভাটায় ব্যবহার বন্ধে ও ফসলি জমির পাশে ইটভাটা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য আমরা জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে অনুরোধ জানাব।

ঈশ্বরদী উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ইটভাটাগুলোতে খড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন কাটা পড়ছে হাজার বিভিন্ন প্রজাতের গাছ। পরিবর্তন হচ্ছে পরিবেশ। এক সময় পরিবেশ বিপর্য ঘটবে। তিনি আরো জানান, এসব দেখে খুবই খারাপ লাগে। নিচ লেবেল থেকে এগুলো দেখার বৈধতা তার নেই। জেলা বন কর্মকর্তা পর্যবেক্ষণ কমিটির সদস্য।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিএম ইমরুল কায়েস বলেন, ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো দন্ডনীয় অপরাধ। ইট পোড়ানো কাজে যদি জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করা হয়, তাহলে ইটভাটার মালিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লক্ষ্মীকুন্ডার ইট ভাটাগুলো দুর্গম এলাকায়। লোকবল ও পরিবহন সংকট। এসব ম্যানেজ করে অভিযানে যাওয়ার আগেই ইটভাটা থেকে সবাই পালিয়ে যায়। ইতিমধ্যে দুইটি ইটভাটায় জরিমানা করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১