বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৫ February ২০২২

কথা না শুনলেই সন্ত্রাসীদের গুলি


রাজধানীর খিলগাঁওয়ে ভুঁইয়াপাড়া এলাকায় এক চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন ওয়ার্ড যুবলীগের প্রচার সম্পাদক শাকিল। হঠাৎ মোটরসাইকেলে এসে তিন সন্ত্রাসী গুলি করে চলে যায়। দুটি গুলিই শাকিলের দুই পায়ে লাগে। স্থানীয় লোকজন শাকিলকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। গত ৩০ জানুয়ারি রাতের ঘটনা এটি। এরপরে এলাকায় আতঙ্ক ছড়াতে আরো দুই দফা গুলি করে আতঙ্ক ছড়ানো হয়।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, খিলগাঁওয়ের ভুঁইয়া পাড়াসহ পুরো এলাকায় শ্যুটিং বা গুলির আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দিন বা রাত নয় যেকোনো মুহূর্তেই গোলাগুলি হতে পারে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার তথা ডিশের লাইনের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ইট-বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত, অটোতে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া উঠেছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ। এ কারণে তারা একগ্রুপ অপরগ্রুপকে কোনঠাসা করতেই অস্ত্রবাজি করছে। কথা না শুনলেই আসছে গুলি। আর এই গুলির শব্দেই বাড়ছে আতঙ্ক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাইল্যা পলাশের আপন ভাগিনা তুষার ওরফে ভাগিনা তুষার আটক হয়ে কারাগারে রয়েছে। কিন্তু তার একটি বিশাল গ্রুপ খিলগাঁওয়ের আরেক প্রভাবশালী মকবুল ও আখতারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরাই রামপুরা খিলগাঁও ও বাড্ডার বিভিন্ন পলাতক সন্ত্রাসীদের এলাকায় এনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। যে তাদের বিরোধিতা করার চেষ্টা করছে তাদেরকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা শাকিলকেও হত্যার চেষ্টা করে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা জামাল হোসেন শুভ ও শাকিল একই গ্রুপের। শুভর ডিসের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় মকবুল। এতে শুভ বাধা দিলেই গুলি করে হত্যা চেষ্টা করা হয়। স্থানীয় লোকজন জানান, এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ঠুন্ডা জামাল, তৌহিদ বাবু, নাহিদ ও ইমরান। এরা দীর্ঘদিন এলাকাতে ছিল না। বর্তমানে তারা এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শাকিলকে গুলি করার পেছনে মকবুলের পরিকল্পনা রয়েছে। আর মোটরসাইকেলে যে দুজন ছিল তাদের মধ্যে ঠুন্ডা জামাল ও তৌহিদ । মকবুল তাদের নিকট অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, খিলগাঁও, বাসাবো, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, ধূপখোলা মাঠ, রামপুরা, উলন, কুঞ্জবনসহ পুরো ৩০-৪০ জনের একটি গ্রুপ এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মাঠে সক্রিয়। এরাই একের পর এক গুলির ঘটনা ঘটাচ্ছে। অনেক সময় আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য ফাঁকা গুলিও করছে। 

গুলিবিদ্ধ শাকিলের ভাই সাব্বির বলেন, আমার ভাই খিলগাঁও থানার ৩ নং ওয়ার্ডের যুবলীগের প্রচার সম্পাদক। খিলগাঁও মিনারা মসজিদের পাশে একটি চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার সময় গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে। এ সন্ত্রাসী গ্রুপটি দীর্ঘদিন ঘাপটি মেরে থাকলেও বর্তমানে এলাকায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুকুল আলম বলেন, শাকিলের বাবা দাদন আলী তৌহিদুল বাবু, জামাল ও নাহিদসহ আরো অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। আসামিদের এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এজাহারে তার বাবা বলেন, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে তার ছেলে শাকিলকে হত্যার উদ্দেশে গুলি করা হয়েছে।  

স্থানীয় লোকজন জানান, সন্ত্রাসীদের কথা না শোনার কারণেই রামপুরার মোল্লাবাড়ি এলাকায় অনেকটা প্রকাশ্যই গুলি করে হত্যা করা হয় বাশাই ফকির নামের এক ঠিকাদারকে। সন্ধ্যার সময় জনবহুল এলাকায় এক সঙ্গে ১০-১২ জন উঠতি সন্ত্রাসীরা তাকে এলোপাড়ি গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে। ওই সময় ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় অবশ্য অস্ত্রসহ নুরা নামের এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তৎকালীন সময়ে র্যাব পুলিশের কঠোর নজরদারি ছিল। সন্ত্রাসীরা এলাকা ছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু সমপ্রতি সেই সকল সন্ত্রাসীরা আবারো এলাকায় ফিরেছে। বিশেষ করে বাড়ি নির্মাণের সময় চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। এছাড়াও বাড়ির নির্মাণ সাম্রগ্রি ট্রাকে করে আনলে সেই ট্রাক আটকে দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে কেউ ইন্টারনেট ব্যবসা চালু করলেও তার কাছ থেকেও চাঁদাদাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ পুরো এলাকার ব্যবসায়ীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এই গ্রুপ।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, জেলে থাকা এই এলাকার তিন সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ, তার ভাগিনা তুষার ওরফে ভাগিনা তুষার, শাহাজাদা ও বিদেশে পলাতক ঘাতক সুমন এ সকল সন্ত্রাসীদের মদদ দিচ্ছে। তারা বিভিন্ন উপায়ে টেলিফোনে কিংবা সহযোগীরা চাঁদাদাবি করছে। আর চাঁদা না দিলেই ঘটছে হিত্যা কিংবা গুলির ঘটনা। আর তাদেরই মূল এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে মকবুল আর আখতার। এলাকার মাদক ব্যবসাসহ নানা অবৈধ অপকর্মের হোতা এ দুজন। তাদের নেতৃত্বেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে সন্ত্রাসীরা। 

স্থানীয়, পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রামপুরায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরাই একের পর এক অপরাধ কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। গত দুই বছরে এলাকায় হত্যা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। চার শীর্ষ সন্ত্রাসী এলাকায় না থাকলেও তাদের নামে চাঁদাবাজি চলছে। তাদের অন্তত ২০ সহযোগী এ অস্ত্রধারী যেসব ক্যাডার এখনো এলাকায় অবস্থান করছে তার মধ্যে রয়েছে- আলোচিত হাবিল বাহিনীর প্রধান হাবিল, জিসান, জাবেদ, সজিব, শাহিন ওরফে কাইল্যা শাহিন, রেজা, ইমন, শাওন, জহির, কালু, পিচ্চি সাদ্দাম, আলাউদ্দীন, রাসেল ওরফে চোর রাসেল, বাবু ওরফে চিকনা বাবু, মামুন, জাভেদ, ডিশ শিপন, দিবানিশি, হিমেল,  ইসমাঈল,  টাকলা শাহীন,  আলাউদ্দিন,  নয়ন ওরফে বুলেট, ওয়াসিম, মুন্না, মামুন, পুলিশ পরিচয়দানকারী কালো মাসুদ, সবুজ, জামাল হোসেন, কালু এদের বিরুদ্ধে রামপুরা থানাসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবির মতো একাধিক মামলা আছে।

সূত্র জানায়, এরাই রামপুরা, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, রমনা থানা এলাকার বিভিন্ন স্থানে অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমনকি ভাড়াটে খুনি হিসেবে তারা ব্যবহূত হয়। বর্তমানে এরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এদের কারণে পুরো এলাকা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে ওই এলাকার চিহ্নিত কিছু সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি পুরো গ্রুপকে গ্রেপ্তারের। তিনি বলেন, সমপ্রতি আমরা জিসান গ্রুপের ৭ জনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছি। তাদের নিকট থেকে কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি। বাকিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, আগের মতো সন্ত্রাসী কার্যকালাপ নেই। যে সকল সন্ত্রাসীর নাম বলা হচ্ছে তাদের মধ্যে অনেকেই এলাকাছাড়া। পোশাকে সাদা পোশাকে পুলিশের টহল রয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ীর নিকট যদি চাঁদাদাবি করে কোনো সন্ত্রাসী তবে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে। চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে সহায়তার অনুরোধ জানান তিনি।

ওসি বলেন, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থান। কোথায় কোনো তথ্য পেলে তাকে জানানোর জন্য পরামর্শ দেন তিনি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১