আপডেট : ১৯ February ২০২২
সরকারপদ্ধতি, নির্বাচন কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ‘অনানুষ্ঠানিক’ আলোচনা প্রায় শেষ করে এনেছে বিএনপি। তবে এখনো পরিকল্পনা করা হয়নি, কিভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ‘পতন’ ও ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থার দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর যুগপৎ আন্দোলন কর্মসূচি পালন করা হবে। ইতোমধ্যে বিএনপির সঙ্গে ‘অনানুষ্ঠানিক আলোচনা’য় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এসব বিষয় উঠে আসে। সূত্র জানায়, বিএনপির সঙ্গে ইতোমধ্যে ২০ দলীয় জোটের তিনটি শরিক দলের প্রধান, বিভিন্ন বাম রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় মোটাদাগে একটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের লক্ষ্যে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য এসব নেতা ঐক্যবদ্ধ। তবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় আন্দোলন হবে, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। ঐক্যে আগ্রহী নেতারা জানিয়েছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে রাজনৈতিক প্রাপ্তি না থাকার কারণে সামনের দিনে আগের ত্রুটিগুলো যেন না হয়, সেদিকে বিএনপিকে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আচরণে বিএনপিকে বাছাইধর্মী হতে হবে, এমনটি বলেছেন শরিক একটি দলের প্রধান। তিনি জানান, এখন বিএনপির নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া সামনে নেই, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও লন্ডনে; এই সময়ে কেবল শরিক দল হওয়ার জন্য নতুন কোনো প্রস্তাবে সায় দেবে না তার দল। এক্ষেত্রে বিএনপিকে নেতৃত্ব ও পরিবর্তনের পরিপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। পরিবর্তন গুণগত না হলে ‘কেবল বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর আন্দোলন করবো না’ মাহমুদুর রহমান মান্নার এই বক্তব্যে সহমত প্রকাশ করেন তিনি। একাধিক দলের নেতা জানিয়েছেন, ‘নির্বাচিত হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন’ গত নির্বাচনে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি বিএনপি। ভবিষ্যতে যেন সেই পরিস্থিতি আর না হয়। ‘কালেক্টিভ পদ্ধতি’তে দলীয় নেতৃত্ব দিলেও যুগপৎ কর্মসূচিতে বিএনপির নেতৃত্ব কীভাবে প্রতিফলিত হবে, তা যেন আগেই নিশ্চিত করা হয়। একইসঙ্গে জামায়াত ইস্যুতে পরিষ্কার সিদ্ধান্তে আসার পাশাপাশি নতুন কোনো জোট না করে একসঙ্গে সবাই মিলে একই দাবিতে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন আগ্রহী নেতারা। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করছে এমন কয়েকটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতির সামনে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের কথা জানাতে চায় বিএনপি। একইসঙ্গে বিরোধী সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোও ন্যূনতম দাবির ভিত্তিতে স্থায়ী সমাধানে আগ্রহী। বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ইতোমধ্যে দলের শীর্ষ এক নেতার নির্দেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ‘অনানুষ্ঠানিক’ পর্বের আলোচনা প্রায় শেষ করে এনেছেন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। অনেকে এ পর্ব সমাপ্ত করে পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করার অপেক্ষায় রয়েছেন। স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ইতোমধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়টি প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছেন নেতারা। তবে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের অংশ হিসেবে নতুন কিছু প্রস্তাব হাজির করতে চায় বিএনপি। একাধারে ঐক্যে আগ্রহী দলগুলোও এসব বিষয়ে বিএনপির পূর্ণ প্রতিশ্রুতি চায়। স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের বিদেশ বিষয়ক উইংয়ের প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, গণতন্ত্রমনা, ভোটাধিকারে, সাংবিধানিক অধিকারে, মানুষের নিরাপত্তায়, অধিকারে বিশ্বাস রাখে এবং আইনের শাসনের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে মানুষের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি হয়েছে। আর এখন এই পুরো বিষয়টিকে ‘ফর্মুলাইজড’ করা। সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এই বিষয়গুলোতে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। এখন এ বিষয়টিকে ফর্মুলাইজড করে এগিয়ে যাওয়াই সবার লক্ষ্য। দলের সিনিয়র নেতাদের কারো কারো মত, বিএনপির জন্য এককভাবে ক্ষমতায় আরোহণ করা অনেকটা অসম্ভব পর্যায়ে চলে গেছে। দলের নেতৃত্ব দেশে সুষ্ঠু সরকার ব্যবস্থা ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে আগ্রহী। এ কারণেই ডান-বাম ধারার একটি সম্মিলিত ধারার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে চায় বিএনপি। তবে বিগত সময়ের মতো এবার ঐক্যবদ্ধ কোনো জোট না করে সমন্বিত দাবিতে ‘যুগপৎ’ কর্মসূচির পক্ষে মত দিচ্ছেন দলের সিনিয়র নেতারা। পাশাপাশি ঐক্যে আগ্রহী দলগুলোও চায়, এক ছাতার তলে না এসে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মতো কর্মসূচি পালন করা যেতে পারে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের ভাষ্য, সব বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত ও যুগপৎ বৃহৎ ঐক্য গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। ভোটাধিকার, সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রসঙ্গে ধারণা করি কোনো দ্বিমত নেই। সাইফুল হক বলেন, আমাদের কেবল সরকার পরিবর্তন করতে চাই না। আমরা সাংবিধানিক কাঠামো ও ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অব সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, তার দলের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে গুণগত পরিবর্তন ও নেতৃত্বে অংশগ্রহণ। সেক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাসহ সর্বোপরি নির্বাচনি ও সংসদীয় ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন। কল্যাণ পার্টি তার জন্মের পর থেকেই জাতীয় পার্টি, জাসদ-রবসহ প্রভৃতি দলের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা করে এসেছে বলে জানান তিনি। জোনায়েদ সাকির নেতৃত্বাধীন গণসংহতি আন্দোলনও বিএনপির সঙ্গে ‘অনানুষ্ঠানিক আলোচনায়’ যুক্ত হয়েছে বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। জোনায়েদ সাকি জানান, তার দল মনে করে অন্তত সাতটি বিষয়ে ন্যূনতম সংস্কার একটা কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জরুরি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ হতে হবে সাংবিধানিক কমিশনের মাধ্যমে, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনব্যবস্থা প্রবর্তন, ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন ও প্রাদেশিক ব্যবস্থা প্রবর্তন, সমস্ত কালাকানুন বাতিল এবং মুক্তিযুদ্ধের ঘোষিত অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশের সব নাগরিকের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আইনি সুরক্ষা। বিএনপি-জোটের শরিক একটি দলের প্রধান জানান, ঐক্যের প্রক্রিয়াটি এ বছর নাগাদ শেষ করে আগামী বছরের শুরুতেই কর্মসূচিতে না গেলে পরে ক্ষমতাসীনদের নতুন কৌশলের মুখোমুখি হতে পারে বিএনপি। তবে স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ নেতা বলেন, ‘আমরা খুব দ্রুতই (ঐক্য) করবো। কিন্তু এটা তো আলোচনার বিষয়, সবার মতামত শুনছি। আমাদের অনেক জায়গায় ত্রুটি থাকলেও পরিবর্তনের বিষয়ে বিএনপি আন্তরিক।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১