বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২১ February ২০২২

রক্তস্নাত একুশ আজ


রক্তস্নাত অমর একুশে আজ। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ১৯৫২ সালের এই দিনে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল বীর বাঙালি। এ দিন শুধু ভাষার অধিকার অর্জন হয়নি-স্বাধীনতার বীজও রোপিত হয়েছিল। যার ফল আসে উনিশ-শ একাত্তরে।

সেই ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল রোববার মধ্যরাত থেকেই বিভিন্ন বয়সী অগণিত মানুষ মিলিত হন শহীদ মিনারে। দিবসটি এখন আর শুধু বাঙালির নয়, পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষের। কয়েক হাজার ভাষায় কথা বলা কোটি কোটি মানুষ দিনটি শ্রদ্ধাভরে পালন করেন।

আজ থেকে ৬৯ বছর আগের কথা। একুশে ফেব্রুয়ারি উত্তাল হলো ঢাকার রাজপথ। পাকিস্তানি শাসকদের হুমকি-ধমকি, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভেঙে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে পথে নেমে এলো ছাত্র, শিক্ষক, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী অসংখ্য মানুষ। বসন্তের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তারা বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে আওয়াজ তুললো, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। পলাশে-শিমুলে রক্তিম হলো বাংলার দিগন্ত। গুলি চালানো হলো মিছিলে। সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তানদের তাজা রক্তে রঞ্জিত হলো দেশের মাটি। এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সংযোজিত হলো মানব ইতিহাসে।

অমর একুশের পথ ধরেই উন্মেষ ঘটেছিল বাঙালির স্বাধিকার চেতনার। সেই আন্দোলনের সফল পরিণতি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন। ভাষার জন্য বাঙালির এই আত্মদানের দিনটিকে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। যার জন্য বাঙালির সঙ্গে সারা বিশ্ববাসী দিনটি পালন করবে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও গৌরব বুকে নিয়ে।

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক বাণী প্রদান করেছেন।

প্রতি বছর একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ দেশের সব শহীদ মিনারই সীমিত পরিসরে উন্মুক্ত থাকছে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শ্রদ্ধা জানাতে সরকারের তরফ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সঙ্গে পাঁচজনের বেশি শ্রদ্ধা নিবেদনে নিষেধ করা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধানিবেদনের সময় লোকসমাগম সীমিত রাখতে বলা হয়েছে। অনুরোধ করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে একইসঙ্গে পাঁচজনের বেশি এবং ব্যক্তি পর্যায়ে দুইজনের বেশি মানুষকে শহীদ মিনারে না আসার। মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না বলেও পূর্বঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

আজ সরকারি ছুটির দিন। সারা দেশের সব সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অর্ধনমিত রাখা হবে জাতীয় পতাকা। একইসঙ্গে সর্বত্র ওড়ানো হবে শোকের কালো পতাকা। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও বেতারে ভাষা দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্র ও অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হচ্ছে।

বাঙালির মননে অনন্য মহিমায় ভাস্বর, মাথা নত না করার চির প্রেরণার নাম একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ এই মন্তব্যটুকুই ভাষা আন্দোলনের দাবানল সৃষ্টির পক্ষে যথেষ্ট ছিল। এর প্রতিবাদে ৩১ জানুয়ারি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদ গঠিত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরের সকল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা এবং আরবি হরফে বাংলা ভাষার প্রচলনের চেষ্টার প্রতিবাদে ধর্মঘট পালন করে। আর একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে সরকার। এতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা পরিষদের বেশিরভাগ সদস্য পিছিয়ে গেলেও ছাত্রদের দৃঢ়তায় ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। ছাত্রদের বিক্ষোভে পুলিশ গুলি চালায়। এতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, সফিউরসহ নাম না জানা অনেকে নিহত হন। এরপর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা আন্দোলন। পিছু হটতে বাধ্য হয় নাজিমুদ্দীন সরকার। মায়ের ভাষার মর্যাদা পায় বাংলা।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ৩০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাঙালি জাতির এক অনন্যসাধারণ অর্জন।

মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনাসভা, মিলাদ মাহফিল, কবর জিয়ারত ইত্যাদি।

দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো পতাকা উত্তোলন, কালোব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবরে এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ।

বিএনপি  নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন করবে। পরে আজিমপুরে ভাষাশহীদদের কবর জিয়ারত করে সেখান থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানাবে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১