বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৩ February ২০২২

ইউক্রেন ঘিরে যুদ্ধের দামামা


পশ্চিমা শক্তিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত দুই অঞ্চল দোনেস্ক ও লুহানস্ককে সেনা পাঠিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এরআগে তিনি এই দুই অঞ্চলকে ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিশ্ব নেতাদের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বেজে উঠতে পারে যুদ্ধের দামামা।

এদিকে পুতিনের এ ঘোষণার পরপরই গতকাল মঙ্গলবার ভোরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রুশ ফেডারেশনের পদক্ষেপ ইউক্রেনের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। রাশিয়ার বক্তব্য যাই হোক না কেন, ইউক্রেনের আন্তর্জাতিক সীমানা বজায় থাকবে। রাশিয়ার এই আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে ইউক্রেন তার আন্তর্জাতিক মিত্রদের থেকে ‘স্পষ্ট ও কার্যকর’ পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে।

রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার রাশিয়ার নিরাপত্তা কাউন্সিলের অনির্ধারিত এক বৈঠক শেষে ক্রেমলিন পূর্ব ইউক্রেনের দুই অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুগানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী দোনেৎস্ক ও লুগানস্ক অঞ্চলের বিদ্রোহী নেতারা পুতিনের কাছে তাদের স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতি দেডার আবেদন করার পর এ সিদ্ধানমশ নেওয়া হয়েছে। পুতিন ডিক্রি জারির পরপরই দোনেস্ক শহরের ভেতর দিয়ে রাশিয়ার ট্যাংক এবং সামরিক বহর যেতে দেখা গেছে। ক্রেমলিনের ভাষায় এই সৈন্যবাহিনী সেখানে ‘শান্তিরক্ষায়’ দায়িত্ব পালন করবে।  

সিএনএন বলছে, রাশিয়ার বাহিনী প্রতিবেশী ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর প্রস্ততি নিচ্ছে বলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সতর্ক করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা। বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত দুই অঞ্চলে রুশ বাহিনীর এই অগ্রযাত্রা সেই আগ্রাসনেরই সূচনা কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এর আগে গত সোমবার রাতে এক ভাষণে ইউক্রেনের সঙ্গে পশ্চিমাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন। সেই সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন এবং ইউক্রেনিয়ান সোশালিস্ট সোভিয়েত রিপাবলিক গঠনের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে ইউক্রেনের স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তা নিয়েই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।    

পুতিনের দাবি, ইউক্রেন অতীতে কখনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল প্রাচীন রাশিয়ারই অংশ ছিল। তার ভাষায়,  ইউক্রেইন এখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কলোনি, আর সেটা চলছে ‘পুতুল সরকারের’ মাধ্যমে।

এদিকে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে রাশিয়ার সমালোনায় সরব হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই বৈঠকে পূর্ব ইউক্রেনে রুশ সেনা মোতায়েনকে ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন’ বলেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের অজুহাত সৃষ্টিতেই বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মার্কিন দূত লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড বলেন, রাশিয়ার নেওয়া পদক্ষেপের কারণে সমগ্র ইউক্রেন, সমগ্র ইউরোপ এমনকি সারা বিশ্বেই মারাত্মক ফলাফল দেখা দেবে। যেকোনো মুহূর্তে রুশ সেনারা দেশটিতে আক্রমণ করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। যদিও ইউক্রেনে হামলার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে বরাবরই দাবি করে আসছে মস্কো।

ওই বৈঠকে লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড বলেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন মিনস্ক চুক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন। তিনি  যে এখানেই থেমে যাবেন, সেটি আমরা বিশ্বাস করি না।

অন্যদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার দূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের জন্য আমরা এখনো কূটনৈতিক পথ খোলা রেখেছি। যাইহোক, ডনবাসে (দোনেতস্ক এবং লুহানস্ক) নতুন করে রক্তপাত হতে পারে, এমন কোনো কিছু আমরা চাই না।

বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের বেশিরভাগ সদস্য দেশই রাশিয়ার সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে বিবাদমান সকল পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারে এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে চীন। তবে ওই দুই অঞ্চলকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনায় মস্কোর নিন্দা জানাননি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের চীনা প্রতিনিধি ঝ্যাং জুন। তিনি বলেছেন, বেইজিং ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতির উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ঝ্যাং জুন ইউক্রেনের এ পরিস্থিতিকে ‘জটিল’ বলেও উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিক বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিনের পদক্ষেপ ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও অখ্লতা এবং একই সঙ্গে জাতিসংঘ ঘোষণার পরিপন্থী। তিনি সব পক্ষকে উত্তেজনা প্রশমন এবং কূটনৈতিক পন্থায় সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানান।

পূর্ব ইউক্রেনের দোনেতস্ক ও লুহানস্ককে রাশিয়া স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার পর অঞ্চল দুটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীকেও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে। এএফপি জানিয়েছে, ইউক্রেনের ওই দুই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের পুঁজি বিনিয়োগ, ব্যবসা বা অন্য কোনো ধরনের লেনদেনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো-বাইডেন।

যুক্তরাজ্য গোয়েন্দাদের দাবি, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ বাধাতে রাশিয়া পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, আমরা যে গোয়েন্দা তথ্য দেখছি তা থেকে বোঝা যায়, রাশিয়া একটি আগ্রাসন শুরু করতে চায়। এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিনের পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেছে। আমরা রাশিয়ান বিষয়গুলো দেখছি। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এগুলো কার্যকর দেখতে পাব। ঠিক সময় খেলা শুরু হবে।

রাশিয়া টুডের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইউক্রেন আগ্রাসনের জবাবে রাশিয়ার ব্যাংকিং সিস্টেমকে অকেজো করার পরিকল্পনায় নতুন নিষেধাজ্ঞার ছক আঁকছে হোয়াইট হাউস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন কিছু রাশিয়ান ব্যক্তি ও সংস্থাকে তাদের বিদেশি সম্পদ জব্দ করা ও তাদের আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ডলার ব্যবহার নিষিদ্ধ করে রাশিয়াকে চাপে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এতে আরো বলা হয়, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রাসন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার একটি প্রাথমিক প্যাকেজ প্রস্তত করেছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার বড় ব্যাংকগুলোর লেনদেনে বাধা দেওয়া। যদিও হোয়াইট হাউস এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক থেকে বাদ দিয়ে আঘাত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে, কারণ বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক লেনদেন ডলারে হয়। তবে রাশিয়ার ঠিক কোন কোন ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করা হবে তা এখনো অজানা। বিশেষজ্ঞদের অভিমত এ ব্যাংকগুলো হতে পারে রাশিয়ার গাজপ্রম ব্যাংক, এজবার ব্যাংক ও ভিটিবি, পাশাপাশি ক্রেমলিনের সঙ্গে সম্পর্কিত রাশিয়ান টাইকুনরা।

হুমকি দেওয়া হয়েছে ব্রাসেলস থেকেও। গত রোববার জার্মান টিভি চ্যানেল এআরডির একটি সাক্ষাৎকারে ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লেইন জানিয়েছিলেন, ইউক্রেনে হামলা চালালে ‘আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাজার’ থেকে রাশিয়াকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে।

এদিকে টেলিভিশন চ্যানেল আরটি দাবি করেছে, ইউক্রেনের মধ্য লুহানস্কে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ হয়েছে। লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের (এলপিআর) যুদ্ধবিরতি ও সীমানা রেখার স্থিতিশীলতা সংক্রান্ত জয়েন্ট সেন্টার ফর কন্ট্রোল অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন (জেসিসিসি) অফিসের ভবনের বাইরে বিস্ফোরণটি ঘটে।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিস্ফোরণের ফলে ভবনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিস্ফোরণে ভবনের জানালা ভেঙে যায়। বাইরে পার্ক করা একাধিক গাড়ির অ্যালার্ম বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ভিডিওটির যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেসিসিসির মিশনের প্রধান ও চার গাড়িচালক বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন। মিশনের পক্ষ থেকে তাদের বর্তমান অবস্থা জানানো হয়নি। পূর্ব ইউক্রেনে রুশপন্থি বিদ্রোহীরা অঞ্চলটিতে সাম্প্রতিক নাশকতা ও ব্যাপক গোলা নিক্ষেপের জন্য কিয়েভকে দায়ী করে আসছে। ইউক্রেন অবশ্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলটি জোর করে দখল করার কোনো পরিকল্পনা নেই।

উল্টো ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন, যার মধ্যে কিয়েভকে দায়ী করার জন্য তাদের নিজস্ব অবকাঠামো উড়িয়ে দেওয়াও রয়েছে।

সম্প্রতি ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্তে যে উত্তেজনা শুরু হয়েছে তার শুরুটা বেশ আগে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর ইউক্রেনের জন্ম। রাশিয়া ইউক্রেনকে সব সময় পশ্চিমা বলয় থেকে মুক্ত রাখতে মরিয়া। প্রতিবেশী বেলারুশও মস্কোপন্থি। পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার আধিপত্য একচ্ছত্র।

এ অবস্থায় সামরিক সক্ষমতা দেখাতে সম্প্রতি বড় পরিসরে সেনা মহড়া শুরু করে পশ্চিমাদের সামরিক জোট-ন্যাটো। ইউক্রেনকে জোটে ভেড়াতে চেষ্টা চালাচ্ছে জোর। আর এখানেই আপত্তি রাশিয়ার। তাদের দাবি, ন্যাটো জোটে ইউক্রেনের যোগ দেওয়া রাশিয়ার সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এ ছাড়া সীমান্তে ন্যাটোর সামরিক মহড়ায় উদ্বিগ্ন মস্কো।

এমন পরিস্থিতিতে পাল্টা ব্যবস্থা নেয় রাশিয়া। সীমান্তে সেনা মোতায়েন শুরু করে। বর্তমানে সীমানে প্রায় দুই লাখ রুশ সেনা অবস্থান করছে। ক্রেমলিন জানায়, ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হবে পশ্চিমাদের।

 

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১