বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ২৫ February ২০২২

করোনা টেস্ট নিয়ে অভিনব জালিয়াতি

প্রতারিত হয়ে গড়ে তোলেন প্রতারকচক্র


একসময় ফেরি করে পণ্য বিক্রি করতেন বেলাল হোসেন। আর্থিক টানাপোড়েনে নিজের ভাগ্য পাল্টাতে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। সব ধরনের প্রক্রিয়া শেষে সরকারি নিয়ম মেনে গেল বছরের মার্চে কুমিল্লার একটি হাসপাতালে করোনার নমুনা দেন। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পরে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি হাসপাতালের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে জানান, আপনার করোনা টেস্টের ফলাফল পজেটিভ এসেছে। তবে ফলাফল পরিবর্তন করা সম্ভব। এজন্য ১০ হাজার টাকা দিতে হবে।

কিন্তু টাকা দেওয়ার পরেও মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে করোনার ফলাফল পজেটিভ আসে। বিশ্বাস করে টাকা দিয়ে বিদেশে না যেতে পেরে হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, ডাক্তার পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা ব্যক্তির হাসপাতালের কেউ না। বেলাল বুঝতে পারেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন। পরবর্তীতে একই বছরের এপ্রিলে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যান। করোনা টেস্ট করতে গিয়ে প্রতারণার বিষয়টি মানতে পারেননি বেলাল। তিনি প্রতিটি পদক্ষেপ বিচার বিশ্লেষণ করেন। যেভাবে নিজে প্রতারণার শিকার হয়েছেন, একইভাবে বিদেশগামীদের কাছ থেকে করোনা পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তন করে দেওয়ার কথা বলে প্রতারণার জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করেন। সেই অনুযায়ী বিদেশে যাওয়ার আগে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সবুজকে নিয়ে একটি চক্র গড়ে তোলেন বেলাল। বন্ধু সবুজের সঙ্গে হাতিয়ে নেওয়া টাকার ভাগাভাগির চুক্তি করে বেলাল প্রবাসে চলে যায়। আর এভাবেই প্রতারণার শিকার বেলাল হয়ে উঠলেন অভিনব এক প্রতারকচক্র।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এলিট ফোর্সটির মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি জানান, প্রায় এক বছর ধরে অভিনব কায়দায় চলা প্রতারণাচক্রের মূল বেলাল ও তার অন্যতম সহযোগী সবুজসহ ১৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১১। এই চক্রটির সঙ্গে কোনো হাসপাতালের যোগাযোগ না থাকলেও শুধুমাত্র করোনা টেস্ট দিতে আসা মানুষের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে অভিনব উপায়ে করোনার ফল পরিবর্তন করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিত। এভাবে চক্রটি কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা টেস্ট নেগেটিভ ফলাফল বদলে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রতারকচক্রের ১৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চক্রটি প্রায় এক বছর ধরে প্রতারণা করে আসছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানী ঢাকা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় র্যাব-১১ এক দল অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে।

তারা হলেন-জসিম উদ্দিন, সুলতান মিয়া, বেলাল হোসেন, আবুল হোসেন, আবদুল নুর, আলফাজ মিয়া, শামিম, আহাম্মদ হোসেন, ইমরান উদ্দিন মিলন, সবুজ মিয়া, আব্দুর রশিদ, আব্দুল করিম চৌধুরী, আঙ্গুর মিয়া, আলমগীর হোসেন।

তাদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে আয় করা সাত লাখ টাকা, প্রতারণার কাজে ব্যবহূত ১২০টি সীমকার্ড, ফিঙ্গার প্রিন্ট মেশিন, ট্যাব, ৩২টি মোবাইল, একটি পাসপোর্ট, নোটবুক এবং চক্রের সদস্যদের বেতনের হিসাব বিবরণী জব্দ করা হয়।

গ্রেপ্তার প্রতারকচক্রের সদস্যদের বরাত দিয়ে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, আবুল হোসেন নারায়ণগঞ্জ ও বি-বাড়িয়া জেলায় আব্দুর নূর নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলায় আহাম্মেদ হোসেন চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়, আব্দুর রশিদ ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ জেলায় আব্দুল করিম কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলায়; আলমগীর সিলেট, মৌলভি বাজার এবং হবিগঞ্জ জেলায়; আঙ্গুর মিয়া কুমিল্লা, মৌলভিবাজার এবং হবিগঞ্জ জেলায় করোনা টেস্টের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে সকাল সাতটা থেকে দুপুর ১২ পর্যন্ত বিদেশগামী যাত্রী ছদ্মবেশে অবস্থান নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের মোবাইল নম্বরগুলো সংগ্রহ করত। নম্বরগুলো সংগ্রহ করে বেলাল ও সবুজকে পাঠাত তারা। বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের প্রকৃত করোনা টেস্টের ফলাফল হাতে পাওয়ার আগেই বেলাল ও সবুজ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের করোনা টেস্ট বিভাগের ডাক্তার অথবা হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ পরিচয় করোনা টেস্টের ফলাফল পজেটিভ এসেছে জানাত। পরে পজিটিভ থেকে নেগেটিভ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিত।

চক্রের অন্য সদস্য আলফাজ, জসিম, শামিম ও সুলতান একই সময়ে বেলাল ও সবুজকে বিভিন্ন জায়গার মোবাইল ব্যাংকিং এর নাম্বার সরবরাহ ক তো। ভূক্তভোগীরা বেলাল ও সবুজ এর কথা অনুযায়ী এই সকল নম্বর মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে টাকা পাঠালে আলফাজ, জসিম, শামিম ও সুলতান তা সংগ্রহ করতো। টাকা সংগ্রহের অবস্থান সব সময় ভিন্ন ভিন্ন জেলায় নির্ধারণ করা হতো, যাতে কেউ প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে না পারে। একটি সিম একদিন ব্যবহার করে তা কিছুদিন বন্ধ রেখে পুনরায় ব্যবহার করতো এবং কোনো নম্বর নিয়ে সন্দেহ হলে তা ফেলে দিত। প্রতারণার পুরো কাজটি করতে যে সিমগুলো ব্যবহার করা হতো সেগুলো সরবরাহ করতেন মিলন। ১২০ টাকায় কেনা সিম চক্রের কাছে ১ হাজার করে বিক্রি করা হত।

চক্রের কাছে শতাধিক সিম সরবরাহ করে আসছিল ইমরান উদ্দিন মিলন। মিলন ফুটপাতে সিম বিক্রির আড়ালে সাধারণ মানুষের ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যবহার করে সু-কৌশলে শত শত মোবাইল সিম তুলে নিত। ১২০ টাকায় কেনা প্রতিটি সিম মিলন বেলাল ও সবুজদের কাছে এক হাজার টাকা করে বিক্রি করত।

র্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, প্রতারণার মাধ্যমে চক্রটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। চক্রের অন্যতম হোতা সবুজ এক বছরে চক্রটি এক হাজারের বেশি বিদেশ যাত্রীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিত। সবুজ এই টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে একটি ভবন তৈরি করেছে। অন্যদিকে বেলাল হোসেন প্রতারণার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াত করেছে। বেলালও ছয় শতাধিক বিদেশগামী যাত্রীদের সঙ্গে একই কায়দায় প্রতারণা করেছে। এভাবে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য জানিয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যরা প্রতিদিন হাজিরা ভিত্তিতে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা করে দেওয়া হতো।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আল মঈন বলেন, এই চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের টার্গেট ছিল বিদেশগামী যাত্রীরা। এই সকাল মানুষের যারা তথ্য সংগ্রহ করত তাদেরকে দৈনিক ভিত্তিতে এক হাজার টাকা দেওয়া হতো। যারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিয়ে কাজ করত তাদেরকে দৈনিক আটশত থেকে এক হাজার টাকা দেওয়া হতো। এছাড়াও চক্রের সদস্যদের বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে আলাদা আলাদা সেক্টরে কাজ করতে বলা হতো। কেউ মোবাইল ব্যাংকিং, হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ, মোবাইলে কথা বলা, পজেটিভ থেকে নেগেটিভ করা ইত্যাদি আলাদা আলাদা সেক্টরে কাজ করতেন তারা। গ্রেপ্তার মিলনের বিষয়ে র্যাব মুখপাত্র বলেন, এই চক্রের মিলন সিম সরবরাহের কাজ করতেন। তিনি রাস্তার পাশে মোবাইল সিম বিক্রির নামে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে বার বার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে একাধিক সিম নিজে রেখে দিত।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১