আপডেট : ২৩ March ২০২২
দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ সোর্সদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে পুলিশের। পুলিশের ওপর মহল থেকেও এই সোর্সনির্ভরতা কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পূর্বের চেয়ে সোর্সনির্ভর তদন্ত থেকে অনেকটাই সরে এসেছে পুলিশ। মূলত প্রযুক্তিনির্ভরতাই তাদের এই সুবিধা এনে দিয়েছে। অভিযোগ আছে, পুলিশের অন্তত ৫০০ সোর্স বিভিন্ন অপরাধে জড়িত, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এই দাগি সোর্সদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকা থেকে পুলিশ সদরদপ্তরে অভিযোগ আসছে। এর ভিত্তিতে তাদের পরিচয়সহ একটি তালিকা করে পুলিশ সদরদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি সব মহানগর পুলিশের কমিশনার ও ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) কাছে চিঠি পাঠিয়ে পুলিশ সদরদপ্তর সোর্সদের লাগাম টানতে বলেছে। পুুলিশের যারা সোর্স ব্যবহার করেন, তারা যেন তাদের আমলনামা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, পুলিশের সোর্সরা অনেক সময় নাম ভাঙিয়ে অনেক অপকর্ম করে। এটা বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। এ কারণে ম্যানুয়ালি সোর্সনির্ভরতা কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সোর্সদের সঙ্গে অপরাধ কর্মকাণ্ডে কোনো পুলিশ সদস্যদের নামে অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশের কার্যক্রমও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে পুলিশের কাজের গতি বৃদ্ধি এবং দ্রুত, সঠিক ও সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি পুলিশের সোর্সনির্ভরতা কমাতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে ঢেলে সাজানো হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর করে। অপরাধী শনাক্তকরণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে পুলিশ এখন সহায়তা নিচ্ছে প্রযুক্তির। কোথাও কোনো অপরাধ ঘটামাত্রই এখন শুরু হয় ওই এলাকায় ব্যবহূত মুঠোফোনের কল ও খুদে বার্তা আদান প্রদানের তথ্য বিশ্লেষণ। এ ছাড়া ডিএনএ পরীক্ষা, রাসায়নিক পরীক্ষা, বায়োমেট্রিক তথ্যের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সূত্রবিহীন ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসছে অপরাধীরা। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আলামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে পুলিশ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম। ঘটনাস্থল থেকে শারীরবৃত্তীয় আলামত যেমন রক্ত, বীর্য, লালা বা অন্যান্য উপাদান সংগ্রহের উপকরণ ও কৌশল এখন থানা পর্যায়েও ছড়িয়েছে। ফলে ঘটনা উদ্ঘাটনে এখন ফরেনসিক ও বায়োমেট্রিক আলামতের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সিআইডির পরীক্ষাগারের এসব আলামত বিশ্লেষণের সক্ষমতা রয়েছে। ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর বারইপাড়ায় ৫ বছরের এক শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে শিশুটির রক্ত, লালা এবং কাপড়ে লেগে থাকা বীর্য সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে অপরাধীকে শনাক্ত করে সিআইডি। জানা যায়, অপরাধী শনাক্তে পুলিশ এখন তিনটি তথ্যভাণ্ডার কাজে লাগাচ্ছে। প্রায় এক যুগ ধরে কারাগারে যাওয়া সব সন্দেহভাজনেরই আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, চোখের আইরিশসহ পাঁচ ধরনের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য সংগ্রহে রাখা হচ্ছে। থানাগুলোতে যাদের নামে মামলা হচ্ছে তাদের নাম, বিস্তারিত পরিচয় ও ছবি সংগ্রহে রাখছে পুলিশ। এ ছাড়া অপরাধী বা অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্তে ব্যবহূত হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডার। ছদ্মপরিচয়ে থাকা কোনো ব্যক্তি গ্রেপ্তারের পরে আঙুলের ছাপ দেওয়ামাত্রই জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডার থেকে উঠে আসছে তার পরিচয়। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার কোনো থানায়ও তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটি খুব অল্প সময়েই জানা যাচ্ছে। ২০২০ সালের ২৪ অক্টোবর রাজধানীর রসুলবাগের ৩৪৮ নম্বর আশকোনা একটি বাড়ির সামনে থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাত পরিচয় এক নারীর বস্তাবন্দি লাশ। ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে সহজেই পরিচয় উদ্ধার করা হয় ওই নারী। পরবর্তীতে দীর্ঘ এক বছর তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে তদন্তের পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এর ঢাকা মেট্রো (উত্তর) রোকসানা আক্তার (২৮) নামে ওই নারীর হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে। প্রযুক্তির ব্যবহার আদালতে মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রেও সহায়ক হচ্ছে বলে মনে করেন পিবিআইর প্রধান বনজ কুমার মজুমদার। তিনি বলেন, ঘটনা প্রমাণে আগে সাক্ষীর মৌখিক সাক্ষ্যই ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। এখন সেই সাক্ষ্যকে আরো শক্তিশালী করা যায় প্রযুক্তির সাহায্যে ঘটনার সময়, তার অবস্থান এবং কার্যক্রম ব্যাখ্যা করে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অপরাধ সংঘটনের পর সেই স্থান থেকে আলামত সংগ্রহের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখনো পুরোপুরি দক্ষ নন। তাদের সক্ষমতা বাড়াতে আরো জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি শাহ আলম বলেন, অপরাধীর গতিপথ শনাক্ত করতে প্রযুক্তি সহায়তা করছে। অপরাধের তথ্যপ্রমাণ উদ্ধারেও এটি অত্যন্ত কার্যকর। আজ থেকে ২০ বছর আগে তদন্ত শুধু সোর্সভিত্তিক ছিল। মনে হতো সোর্স কোনো ভিনগ্রহের মানুষ। পুলিশের চেয়েও শক্তিশালী। প্রায় ৯০ শতাংশ মামলা শনাক্ত হতো সোর্সের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে। এখন ১০ শতাংশও সোর্সের ওপর নির্ভর করতে হয় না। আর এটা সম্ভব হয়েছে প্রযুক্তির কারণে। বোমা উদ্ধার ও অপসারণেও যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি। এখন ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ যন্ত্রপাতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুটি অত্যাধুনিক রোবট। দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটগুলো বোমা খোঁজা, নিষ্ক্রিয় করা থেকে শুরু করে দেয়াল ভাঙা, সিঁড়ি বেয়ে উঠার মতো কাজও করতে পারে। স্পর্শকাতর কোনো স্থানের নজরদারিতে পুলিশ ড্রোনও ব্যবহার করছে। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে জরুরি হেল্পলাইন ৯৯৯ বা বিশেষ কিছু অ্যাপের মাধ্যমে। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম (সিটি) ইউনিটের অ্যাপ ‘হ্যালো সিটি’ এবং র্যাবের ‘রিপোর্ট টু র্যাব’ এর মাধ্যমে অপরাধের অনেক তথ্য পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। আগে মোবাইল ফোন বা কোনো ডিভাইস ব্যবহার করে কাউকে হুমকি দিলে সেই হুমকিদাতাকে শনাক্তে গলদঘর্ম হতে হতো পুলিশকে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ তদন্তের সুযোগও ছিল কম। এমনকি লাশের পরিচয় শনাক্তেও নির্ভর করতে হতো বিদেশি ল্যাবের ওপর। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আধুনিক তদন্তে খুব বেশি প্রশিক্ষিত জনবলও ছিল না বাহিনীতে। পুলিশের সেই সমস্যা এখন কেটে গেছে। প্রযুক্তিগত তদন্তে অনেকখানি এগিয়ে গেছে পুলিশ। এ জন্য পুলিশ বাহিনীতে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার, ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি ও সাইবার ক্রাইম ট্রেনিং সেন্টার নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অধীনে এ তিনটি প্রতষ্ঠান চালু আছে। এতে পুলিশে যেমন আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল তৈরি হয়েছে, তেমনি প্রযুক্তিগত তদন্ত ও সাইবার অপরাধ দমনে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। সিআইডি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব থাকলেও তা আধুনিক ছিল না। এজন্য বিদেশি ল্যাবের ওপর নির্ভর করতে হতো। রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর অনেক আলামতের ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য বিদেশি ল্যাবের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানায়, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় তদন্ত পরিচালনা এবং কার্যকরভাবে সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে দক্ষ তদন্তকারী তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার তদন্ত সক্ষমতা জোরদার প্রকল্পের অধীনে এসব প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার ছাড়াও কোরিয়ার একটি সংস্থা অর্থায়ন করেছে। প্রকল্পের অধীনে মালিবাগে সিআইডির সদরদপ্তরের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার (সিআইসি) ও ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব এবং পুরান ঢাকার মিল ব্যারাকে সাইবার ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা এরই মধ্যে কোরিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে সাইবার ক্রাইম বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণও শেষ করেছেন। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য উপযোগী সিলেবাসও তৈরি করা হয়েছে। সিআইডির একজন কর্মকর্তা বলেন, আগে ব্যক্তি পর্যায়ে বা কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আগ্রহে সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধ তদন্তে প্রশিক্ষণ নিতেন। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটও পৃথকভাবে সাইবার ক্রাইম ইউনিট চালু করেছে। তবে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার ও সাইবার ট্রেনিং সেন্টার চালুর ফলে এসব বিষয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এ সেন্টারে মোবাইল ফরেনসিক, কম্পিউটার ফরেনসিক এবং সিস্টেম ফরেনসিক বিভাগ রয়েছে। মোবাইল ফরেনসিক বিভাগ মোবাইল ফোনের ডাটা থেকে তথ্য উদ্ধার এবং এ-সংক্রান্ত তদন্ত ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কম্পিউটার ফরেনসিক বিভাগ একইভাবে কম্পিউটার এবং ল্যাপটপ ও এ ধরনের ডিভাইস থেকে তথ্য উদ্ধার করছে। সিস্টেম ফরেনসিক বিভাগ হার্ডওয়্যার, সিসিটিভি, পেনড্রাইভ এবং অন্যান্য ড্রাইভ থেকে তথ্য উদ্ধার করে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টারের তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে সরবরাহ করছে। পুরো বিভাগ মোবাইলে হুমকি, ইন্টারনেটে নগ্ন ছবি ফাঁস বা বিরক্তিকরণ ও ইমেইল হ্যাকের মতো ঘটনাগুলো তদন্ত করছে। সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাব মৃতদেহের ডিএনএ নির্ণয় করছে। লাশের পরিচয়ও শনাক্ত করছে। তাছাড়া এই শাখা ব্যালিস্টিক, হাত ও আঙুলের ছাপ, পায়ের ছাপ, হ্যান্ড রাইটিং, মাইক্রো এনালিসিস, জাল নোট শনাক্তের ল্যাব হিসেবে কাজ করছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১