বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ৩১ March ২০২২

কিলিং মিশনে চার গ্রুপ


রাজধানীর শাহজাহানপুরে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যায় বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের দেশীয় সহযোগীদের নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এদের মধ্যে দু-একজন দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও বাকিরা গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার হতে পারেন। এমনকি যে অস্ত্র দিয়ে গুলি করা হয়েছিল সেটিরও সন্ধান পাওয়া গেছে।  গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এখনই সবকিছু বলা যাচ্ছে না। তবে দ্রুত এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

সূত্রে জানা যায়, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় শুটার মাসুমকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। মাসুমের সঙ্গে কে যোগাযোগ করে, কে অস্ত্র দেয়, কোথায় বসে পুরো ঘটনাটি মনিটরিং করা হয়। সবকিছুই এখন গোয়েন্দাদের নখদর্পণে।

সূত্র জানায়, টিপুকে হত্যা করা হয় পরিকল্পিতভাবে। আলাদা আলাদা গ্রুপ করে অর্থাৎ কাটআউট সিস্টেমে হত্যা মিশনের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। চারটি গ্রুপ পুরো হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করে। মাঠে নামানো হয় ১১ সন্ত্রাসীকে। একটি গ্রুপের দায়িত্ব ছিল অস্ত্র ও  মোটরসাইকেল সরবরাহ করা। এই স্তরে ছিল মাসুম ও অজ্ঞাত বাইকার। দ্বিতীয় স্তরে ছিল মাসুমকে অস্ত্র ও বাইকারকে বাইক সরবরাহকারী। তৃতীয় স্তরে রয়েছে সমন্বয়কারী। আর চতুর্থ স্তরে হত্যা মিশনের মাস্টারমাইন্ডরা রয়েছে। তবে ডিবি এখন পর্যন্ত মাসুমকে গ্রেপ্তার করেছে।  মাসুমের মাধ্যমে ওইসব স্তরে লোকদের নাম আসলেও সেটি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে ডিবি।

তবে গ্রুপের অনেকেই এক সময় দুবাইয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ভাড়াটে খুনী হিসেবে কাজ করত। যখন যে ভাড়ায় ঠিক করে, তখন তার হয়ে কাজ করত তারা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, টিপু হত্যায় ব্যবহূত পিস্তলটির জোগানদাতা হিসেবে এখন পর্যন্ত এজিবি কলোনির কাইল্লা পলাশের নাম উঠে এসেছে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় কিলারকে অস্ত্রের জোগান দিয়ে নিউ ইস্কাটনের গোল্ডেন ড্রাগন বারে বসে রাত ১২টা পর্যন্ত হত্যা মিশনের মনিটরিং করে কাইল্লা পলাশ। এ সময় তার সঙ্গে আরো দুজন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই দুজন কাইল্লা পলাশের সহযোগী। তবে তাদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা চলছে।

ডিবি বলছে, হত্যায় ব্যবহূত অস্ত্রটি উদ্ধারের বিষয়ে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। একইসঙ্গে মাসুমের কাছ থেকে যাদের নাম আসছে, তাদের যাচাই-বাছাই ও অজ্ঞাত বাইকারসহ বেশ কয়েকজনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এসব বিষয়ে মাসুমকে রিমান্ডে আরো অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

তবে একাধিক সূত্র বলছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িতদের অনেকেই গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। শুধু সেই অস্ত্রটির হাতে এলে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এদিকে ভাড়াটে কিলার মাসুমকে ৭ দিনের রিমান্ডের আজ বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিন পার হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যার প্রাথমিক যে মোটিভ সেটি আসলে আধিপত্য বিস্তারের জেরে। টেন্ডার, ফুটপাতসহ নানা খাতের টাকা পয়সা নিয়ে কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে এমন বিষয়গুলো সামনে রেখে তদন্তকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে স্থানীয় সূত্র বলছে, গত দুই বছর ধরে কমলাপুর রেল কলোনি ও শাজাহানপুর গরুর হাট নিয়ে মতিঝিল ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার সঙ্গে বিরোধে জড়ান টিপু। এর আগে তিনি বিদেশে ছিলেন। ক্যাসিনোকাণ্ডে বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ জেলে যাওয়ার পর ওই ছাত্রলীগ নেতা কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন। এক পর্যায়ে খালেদের শাজাহানপুর এলাকার ডিশ ও ইন্টারনেটের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেন। এ নিয়ে খালেদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এসব বিষয়ে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হলে সেই নেতা কিছুদিন আত্মগোপনে যান।

এই সুযোগে খালেদের বাগিচা এলাকার ক্যাডারদের নিয়ে টিপু ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিজের আয়ত্তে নেন। সমপ্রতি ওইসব ব্যবসা থেকে টাকার ভাগ পাচ্ছিল না খালেদ ও তার নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে খালেদের সঙ্গে টিপুর দূরত্ব বাড়তে থাকে। একই সময়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তিবাণিজ্যের একক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় টিপুর হাতে। সেখানে ভাগ বসান মহানগর আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা। সম্প্রতি রেলের একটি বড় ধরনের টেন্ডার নিয়ে মহানগর ওই নেতার সঙ্গেও বিরোধ সৃষ্টি হয় টিপুর। সব বিষয় নিয়ে টিপুবিরোধী পক্ষগুলো এক হয়ে খুনের পরিকল্পনা করে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে।

সূত্র জানায়, পুরো ঘটনা সমন্বয় করা হয়েছে দেশের বাইরে থেকে। দেশের বাইরে থেকে কারা কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে পাশাপাশি মাসুমের কল লিস্টে কাদের যোগাযোগ ছিল সব তদন্ত করা হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যেই পুরো বিষয়টি সামনে চলে আসবে বলেও জানা গেছে।

টিপু হত্যার পরদিন মামলা করেন তার স্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি। ওই মামলার সূত্রে জানা যায়, হত্যার আগে ফোনে টিপুকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টির তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিট। তবে টিপুর ঘনিষ্ঠ একজনের দাবি, হুমকি নয়, নিজের পরিচয় গোপন করে টিপুকে সতর্ক করেছিলেন তার এক শুভাকাঙ্ক্ষী।

ডলি মামলায় উল্লেখ করেন, ঘটনার ৪/৫ দিন আগে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী তার স্বামীকে ফোনে হত্যার হুমকি দেয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে, ডলি বলেন, ‘ঘটনার দুই দিন আগে সকালে বাসা থেকে বের হবার সময় উনি (টিপু) আমাকে বলেন, তার কাছে অপরিচিত নম্বর থেকে একটি ফোন এসেছে। ফোন দেওয়া ব্যক্তি বলেছেন, তার নাকি বিপদ, তাকে মেরে ফেলবে।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম নম্বরটা রেখেছে কিনা। উত্তরে আমাকে বলল নম্বরটা বন্ধ বলছে। এর পরদিন এক অনুষ্ঠানে বিষয়টি মেয়রকে জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সুযোগ পাইনি। পরে ভাবলাম ২৬ মার্চের অনুষ্ঠানের পর বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি প্রশাসনের সহযোগিতা নেব। কিন্তু সেই সুযোগটা আর হলো না।

এসব বিষয়ে র্যাবের একটি দল ডলিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলছেন, কয়েকটি বিষয় নিয়ে ডলির সঙ্গে আমরা কথা বলেছি।

জানা যায়, টিপু ও প্রীতি হত্যার নেপথ্যের কুশীলবদের খুঁজে বের করতে র্যাব আলোচিত হত্যাকাণ্ডটি নিয়ে কাজ করছে। হত্যার কারণ ও এর পেছনে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা নিয়ে আশাবাদী র্যাব।

গত ২৪ মার্চ রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে মতিঝিল এজিবি কলোনি থেকে বাসায় যাওয়ার পথে শাহজাহানপুর থানার আমতলা এলাকায় জাহিদুল ইসলাম টিপু, তার ড্রাইভার ও রিকশা আরোহী সামিয়া আফরান প্রীতি নামের এক তরুণীর ওপর গুলি চালান মো. মাসুম ওরফে আকাশ। 

তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম টিপু ও রিকশা আরোহী প্রীতিকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় শাহজাহানপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।

গোয়েন্দা মতিঝিল বিভাগ এ ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে। গত রোববার সকালে ডিবি জানায় শুটার মাসুমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বগুড়া জেলা পুলিশের সহযোগিতায় ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার মতিঝিল বিভাগের খিলগাঁও জোনাল টিম বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বগুড়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১