বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০১ April ২০২২

অপেক্ষা এখন উদ্বোধনের


দক্ষিণ জনপদের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। চলতি মাসেই কার্পেটিংয়ের (পিচ ঢালাইয়ের) কাজ শেষ হবে। ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য মূল সেতু অগ্রগতি হয়েছে ৯৬.৫০ শতাংশ। বাকি কাজ আগামী দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে শেষ করার প্রক্রিয়া চলছে। 

ইতোমধ্যে সেতুর দুই পাড়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়েছে ১২ কিলোমিটার। এই সেতুতে থাকবে ৮ মাত্রা ভূমিকম্প সক্ষমতা। থাকবে আর্কিটেকচারাল লাইটিং (স্থাপত্য আলো) ব্যবস্থাও। দুবাইয়ের বুর্জ আল খলিফার মতো করে পদ্মা সেতুটি আলোকসজ্জা করা হবে। এর জন্য নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির বিভিন্ন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা জানান। সেতুতে মোট ৭১৫টি সড়কবাতি বসানো হবে। এর মধ্যে ১০০টি বসেছে।  মেগা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাসহ পুরো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক উন্নতি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

এদিকে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সেতু উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সেতু কর্তৃপক্ষ।  স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু খুলে দেওয়া হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্বার খুলে যাবে। উদ্বোধনের তারিখ ঠিক করার জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আবেদন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিলেই উদ্বোধনের তারিখ ঠিক করা হবে জানিয়েছেন পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালক  মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুনের মধ্যে সেতুটি চালুর প্রস্তুতি আমরা গ্রহণ করছি।

তবে মন্ত্রিপরিষদের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী ৩০ জুনে পদ্মা সেতু খুলে দেওয়া হবে। গত  সোমবার এ বিষয়ে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু উদ্বোধনের ব্যাপারে। তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ই প্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তা শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর। ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা নির্মাণ ব্যয় ধার্য করা হয়।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো.শফিকুল ইসলাম বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে রাত-দিন ৪ হাজার শ্রমিক অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই শ্রমিকের মধ্যে প্রায় এক হাজার শ্রমিক চীনের। বাকি তিন হাজার দেশীয় শ্রমিক। করোনার আগে প্রতিদিন প্রায় ৫-৭ হাজার শ্রমিক কাজ করতো। এখন কিছুটা কমে গেছে। তবু আমরা চেষ্টা করছি যথাসময় প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য।

তিনি আরো জানান,  প্রকল্পের নদীশাসনের কাজ একটু পিছিয়ে রয়েছে। এ পর্যন্ত ৮৯ শতাংশ নদীশাসনের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ৯৬ দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হয়েছে মূল সেতুর। ভূমি অধিগ্রহণ, দুই পাড়ের সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়াসহ মোট আট ভাগে বাস্তবায়ন হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। এ ছাড়া সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এরিয়া ও সুপারভিশনসহ অন্যান্য কার্যক্রম শতভাগ শেষ হয়েছে বলে শফিকুল ইসলাম জানান।

প্রকল্প সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিয়ারে বসানো হয় প্রথম স্প্যানটি (ইস্পাতের কাঠামো)। সেতু ৪২টি পিয়ারে ৪১ স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাস লেগে যায়। এই স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলাচল করবে রেল। প্রতিটি স্প্যানের ওজন তিন হাজার টনের বেশি। দৈর্ঘ্য ছিল ১৫০ মিটার। এই স্প্যানগুলো সার্ভিস এরিয়া থেকে তিন হাজার ৬০০ টন ধারণক্ষমতার তিয়ান-ই ভাসমান ক্রেন দিয়ে পিয়ারের ওপর বসানো হয়।

দ্বিতলবিশিষ্ট পদ্মা সেতুর নিচতলায় অর্থাৎ ইস্পাতের কাঠামোর (স্প্যান) ভেতর দিয়ে রেল চলবে। মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুই ধরনের ট্রেনই চলতে পারবে। আর ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। এ জন্য স্প্যানের ওপরে কংক্রিটের দুই হাজার ৯১৭টি রোড ও স্প্যানের ভেতর দুই হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্লাব বসানো হয়েছে। গত জুনে রেলওয়ে স্লাব ও অক্টোবরে রোড স্ল্যাব বসানোর কাজ শেষ হয়।

রোড স্লাবের ওপরের এই অংশ চওড়ায় ২২ মিটার, চার লেনের সড়কের সমান। এ ছাড়া সেতু দিয়ে ৭৬০ মিলিমিটার ব্যাসের গ্যাসের পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। ১৫০ মিলিমিটার ব্যাসের ফাইবার অপটিক ও টেলিফোন লাইনের পাইপ বসানো কাজ চলছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান।

২০০৭ সালে রেলপথ ছাড়া একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। ২০১১ সালে রেলপথ যুক্ত করে প্রথম দফায় প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় দ্বিগুণের বেশি। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় দফায় ২০১৬ সালে আট হাজার ২৮৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তৃতীয় দফায় ২০১৮ সালে এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঋণের টাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। এক শতাংশ হারে সুদসহ ৩৫ বছরে এই ঋণ পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।

প্রকল্পের সময় ধরা হয়েছে ২০২২ সালে জুন পর্যন্ত। এর আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৪ পিয়ারের পাইলিং সমস্যা নতুন ডিজাইনে চূড়ান্ত করতে অনেক সময় চলে যায় তাই নির্মাণ সময় এক বছর বৃদ্ধি করে ২০১৯ সালে ৩০ ডিসেম্বরে নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে এক বছর ছয় মাস মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২১ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু করোনা ও নদীভাঙনের কারণে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি কম হওয়ায় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির করা হয়েছে। মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১