বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ০৫ April ২০২২

কে হবেন পরবর্তী টার্গেট


মতিঝিল নিয়ন্ত্রণ মানে পুরো ঢাকাই নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি মতিঝিলকে ঘিরে প্রতিমাসে চাঁদা উঠে কয়েক কোটি টাকা। শুধু কি চাঁদা, বিভিন্ন টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণও এখান থেকে। আর এসবের নিয়ন্ত্রণ নিতেই একের পর এক নেতার উত্থান। কিন্তু কোনো নেতা বেশিদিন টিকে থাকতে পারেন না। এক সময়ের ঢাকা কাঁপানো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের কথা না শুনলেই দেশের বাইরে থেকেই নিখুঁত পরিকল্পনায় হত্যা করে যাচ্ছে। গত ৭/৮ বছরে মতিঝিলকেন্দ্রিক আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্বে খুন হয়েছে তিন নেতা। এছাড়া বাড্ডার স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহাবুবুর রহমান গামাসহ ৪ হত্যার পেছনে একই আন্ডারওয়ার্ল্ড কাজ করেছে।

একের পর এক হত্যায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় নেতাদের মাঝে। তারা বলছেন, ধারাবাহিক হত্যার ঘটনা ঘটে চলেছে। এখন পরবর্তী টার্গেট কে সেটাই দেখার অপেক্ষা।

সূত্র মতে, রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন, শাহাজানপুর, রামপুরা আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ স্বেচ্ছাসেবক লীগের অনেক নেতাদের মধ্যেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে জাহিদুল ইসলাম টিপুর হত্যাকাণ্ডের পর এ আতঙ্ক আরো বেশি করে ছড়িয়েছে। এরই মধ্যে যেসব নেতা ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তারা আরো বেশি আতঙ্কিত।

জানা গেছে, জাহিদ হাসান মিল্কি হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মতিঝিলকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একটি ঝড় বয়ে যায়। মিল্কি হত্যার পরে জাহিদ সিদ্দিকি তারেক র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়। এরপর মতিঝিলের নিয়ন্ত্রণ কে নেবে তা নিয়ে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। মিল্কি হত্যার পর টিপুসহ অনেক নেতাই যখন আসামি, আবার অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে জেলখানায় ঠিক সেই সময় সম্রাট সেই জায়গা দখলে নেয়। এরপর মতিঝিল নয়, পুরো দক্ষিণ সম্রাটের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়। এক পর্যায়ে আধিপত্যের মাত্রা এমন হয়ে যায় শুধু দক্ষিণের নয়, উত্তর দক্ষিণের একক আধিপত্য চলে আসে তার নিয়ন্ত্রণে। রাজধানীজুড়ে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে সম্রাট, খালেদ গ্রেপ্তার হলে আবারো শুরু হয় আধিপত্যের লড়াই।

এই এলাকায় রাজনীতি করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, মিল্কি মার্ডারের পর থেকে মূলত শুরু হয়েছে আধিপত্যের লড়াই। মিল্কি হত্যার সঙ্গে জড়িতরা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে বোঁচা বাবু হত্যাকাণ্ড ঘটে। সর্বশেষ টিপু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টিপু হত্যাকাণ্ডের পর সম্রাট ও খালেদের কাছেও খবর পৌঁছে যায়। বর্তমানে এ এলাকার আধিপত্য নিতে কারাগারে থাকা সম্রাট, খালেদ এমনকি গোল্ডেন মনিরের কাছে অনেকেই ধর্না দিচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে যুবলীগের এক নেতা বলেন, দক্ষিণ যুবলীগের মধ্যে মতিঝিল, পল্টন, শাহজাহানপুর এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নেতা ঠিকাদারি কাজ করেন। বড় কোনো কাজ হলেই এই তিন থানা এলাকার ছোট নেতা হলেও তাদের সমীহ করে টাকা দিতে হয়। নইলে ওই পরিণতি ভোগ করতে হবে।

তিনি বলেন, সম্রাট খালিদও একই পথ অবলম্বন করতেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের নামে চাঁদা উঠতো। পাশাপাশি ক্যাসিনো থেকেও উঠতো টাকা। এই টাকাও তাদের দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিকট বিভিন্ন মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হতো। মিল্কি, বোঁচা বাবু হত্যার পর সম্রাট-খালিদ ম্যানেজিং এ কাজটি ভালোভাবেই করতেন। এ কারণে তাদের সমস্যাও হয়নি। কিন্তু ক্যাসিনোকাণ্ডে তারা গ্রেপ্তার হন।

যুবলীগের ওই নেতা বলেন, সম্রাট একবার অসুস্থ হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি। ওই সময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে তার দ্বন্দ্ব হয়। ওই সময় হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তাকে হত্যা করতে কিলার ভাড়া করে পাঠানো হয়। অল্পের জন্য বেঁচেও যান তিনি। তবে গ্রেপ্তার হয়ে সম্রাট-খালেদ জেলহাজতে থাকায় টিপু অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন।

এদিকে র‍্যাব জানায়, বিগত ২০১৩ সালে রাজধানীর গুলশান শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে মিল্কি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। টিপু হত্যায় গ্রেপ্তারকৃত ওমর ফারুক (৫২), আবু সালেহ শিকদার (৩৮), নাছির উদ্দিন (৩৮) ও মোরশেদুল আলম (৫১) গ্রেপ্তাররা মিল্কির সহযোগী ছিলেন। মিল্কি হত্যার সঙ্গে টিপু জড়িত ছিলেন বলে গ্রেপ্তারকৃতরা সন্দেহ করতেন। মিল্কি হত্যার মামলার এজাহারে টিপুর নামও দেন তারা। কিন্তু বিচারিক কার্যক্রমে টিপুর নাম বাদ পড়ায় গ্রেপ্তারদের মনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

দীর্ঘদিন ধরে ভিকটিম ও হত্যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে বিরোধ ছিল উল্লেখ করে র্যাব জানায়, মতিঝিল এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, স্কুল-কলেজের ভর্তিবাণিজ্য, বাজার নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল। এছাড়া এলাকার আধিপত্য বিস্তারসহ মামলা সংক্রান্ত বিষয়েও টিপুর সঙ্গে গ্রেপ্তারদের দ্বন্দ্ব ছিল। আর এসব দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই টিপুকে হত্যা করা হয়।

র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়ার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, টিপুকে হত্যা করার জন্য ১৫ লাখ টাকা বাজেট করেন পরিকল্পনাকারীরা। আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন মুসাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এ হত্যাকাণ্ডে। ঘটনার ১২ দিন আগে মুসা দুবাই চলে যান। সেখানে বসে তিনি কিলার নিয়োগ করা থেকে শুরু করে হত্যার ফাইনাল মিশন শেষ করেন।

এর আগে টিপু-প্রীতি হত্যাকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টা পর মো. মাসুম ওরফে আকাশ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের মতিঝিল বিভাগ। পুলিশ বলছে, মাসুমই ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে টিপুকে গুলি করে হত্যা করে।

ফাইনাল ছক মুসার : টিপুকে দুবাই বসে হত্যার পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দেন সুমন শিকদার ওরফে মুসা। টিপু হত্যাকাণ্ডের ঠিক ১২ দিন আগে দুবাই চলে যান মুসা। দুবাই বসে হত্যার পুরো ছক কষেন তিনি। টিপুকে হত্যায় চুক্তি হয় ১৫ লাখ টাকা। এই ১৫ লাখ টাকা কে কত দেবে তাও ভাগ করে দেন মুসা। নয় লাখ টাকা দেন ওমর ফারুক। অবশিষ্ট ছয় লাখ টাকা দেন গ্রেপ্তার নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির, আবু সালেহ শিকদার ওরফে শুটার সালেহ ও মুসাকে।

খন্দকার আল মঈন জানান, দুবাই যাওয়ার আগে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে যান মুসা, হুন্ডির মাধ্যমে আরো চার লাখ টাকা মুসাকে দেওয়া হয়। বাকি ছয় লাখ টাকা দেশে হস্তান্তর করার চুক্তি হয়। ছয় লাখের মধ্যে র‍্যাব গ্রেপ্তারের সময় তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা জব্দ করে। দুবাই থাকা মুসা ২০১৬ সালে রিজভী হাসান ওরফে বোঁচা বাবু হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভুক্ত ৩ নম্বর আসামি।

গ্রেপ্তারদের বরাতে কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, হত্যাকাণ্ডটি দেশে ঘটলেও নিয়ন্ত্রণ করা হয় দুবাই থেকে। দেশে থাকা নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির, মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্লা পলাশসহ আরো কয়েকজন জাহিদুল ইসলাম টিপুর অবস্থান সম্পর্কে বেশ কয়েকদিন ধরে মুসার কাছে তথ্য প্রেরণ করতেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর গ্রেপ্তার নাছির উদ্দিন ওরফে কিলার নাছির আনুমানিক চারবার জাহিদুল ইসলাম টিপুর অবস্থান সম্পর্কে মুসাকে অবহিত করেন। পরে জাহিদুল ইসলাম টিপু গ্রান্ড সুলতান রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার সময় গ্রেপ্তার মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্লা পলাশ তাকে নজরদারিতে রাখেন এবং তার অবস্থান সম্পর্কে ফ্রিডম মানিককে অবহিত করেন। টিপুর অবস্থান সম্পর্কে জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে আনুমানিক রাত সাড়ে ১০টার দিকে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের তত্ত্বাবধানে কিলার কর্তৃক হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়।

এদিকে টিপু হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় নেতাদের চরমভাবে আতঙ্ক ভর করেছে। তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের মূল বিষয় হলো আধিপত্য আর চাঁদাবাজি। সন্ত্রাসীরা এতটাই বেপরোয়া চাঁদা না দিলেই গুলি করে দেবে। নেতারা বলছেন, পরিস্থিতি এখন উত্তপ্ত। কিছুদিন পর হয়তো ঠিক হবে। কিন্তু এখন চলাফেরা করাই দায় হয়ে পড়েছে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১