আপডেট : ০৭ April ২০২২
রাজধানী ঢাকায় যানবাহন রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয় না কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত বা জরিপ। আবেদন করলেই মিলছে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন। যে কারণে রাজধানীতে চলছে ধারণক্ষমতার ৮ গুণেরও বেশি যানবাহন। যার প্রভাবে প্রতিদিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে যানজট। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচের পরও রাজপথে চলাচলকারী গাড়ির গতি বাড়ানো যাচ্ছে না; বরং দিন দিন কমছেই। পরিবহন ও নগর বিশেষজ্ঞরা রাজধানীর যানজট পরিস্থিতির উন্নয়নে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন সীমিত করে গণপরিবহন বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন। এর আগে রাজধানীতে যানবাহনের ক্যাপাসিটি (ধারণক্ষমতা) নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন গণপরিবহনে বাসকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে, সেখানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ঘটছে উল্টো ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় দিনকে দিন ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না গণপরিবহনের সংখ্যা। এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ঢাকার রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার যথাক্রমে ৪৯ ও ১৮ শতাংশ বাড়লেও গণপরিবহন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। এদিকে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সংকুচিত হচ্ছে চলাচলের পথও। যে কারণে বাড়ছে যানজট, নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাতায়াতব্যবস্থার অপ্রতুলতার পাশাপাশি গণপরিবহন চলাচলের উপযোগী না থাকাই এর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি- বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেশের সড়কে গাড়ি বেড়েছে প্রায় এক লাখ। দেশের সড়কে প্রতিদিন গড়ে নতুন প্রাইভেটকার নামছে ৫০টি। মোটরসাইকেল বাড়ছে ১৪০৯টি করে। এছাড়া বাস, মাইক্রো-বাস, পিকআপ, অটোরিকশা, ট্রাকের সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ২০১০ সালে দেশে রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যানবাহন ছিল ১৪ লাখ ২৩ হাজার ৩৬৮টি। এক যুগ পর সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ লাখ ১০ হাজার ৭৮৬টিতে। অর্থাৎ এক যুগে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। বিআরটিএ-র তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে ঢাকা শহরে মোট নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭টি। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখেরও বেশি। সূত্র মতে, ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীতে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৫৪টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি আট লাখ ৪৯ হাজার ৩৩৫টি, যা মোট গাড়ির ৪৯ শতাংশ। প্রাইভেটকার নিবন্ধিত হয়েছিল তিন লাখ ৮ হাজার ৮৬০টি, যা মোট গাড়ির ১৮ শতাংশ। আর বাসের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৯৭৮টি, যা মোট গাড়ির ২ শতাংশ। অপরিকল্পিতহারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত এই যানবাহন বৃদ্ধির জন্য রেজিস্ট্রেশনের কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকাকে দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া নিয়ে এখনো কোনো ধরনের সীমা নির্ধারণ করেনি সরকার। আবেদন করলেই মিলছে রেজিস্ট্রেশন। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার বিষয়ে বিআরটিএ-র পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব ই রব্বানী বলেন, গাড়ি কেনার পর বৈধ কাগজপত্র নিয়ে যারা আসছেন তাদের আমরা রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছি। এক্ষেত্রে কোনো সংখ্যা বিবেচনা করা হচ্ছে না। এমন কোনো নির্দেশনাও নেই। যারাই আবেদন করছেন কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকার থেকে যদি কোনো নির্দেশনা আসে তবে সেটা নিয়ে আমরা কাজ করবো। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যানবাহনের নিবন্ধন দিয়ে যাচ্ছে বিআরটিএ। কোন সড়কে কী ধরনের, কী পরিমাণ গাড়ি চলছে এ নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। আমি মনে করি এটা অনেকটা বাঁধ খুলে দেওয়ার মতো। বন্যার পানির মতো শহরে গাড়ি বাড়ছে। রাজস্ব যতটুকুু আসছে তার চেয়ে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি যে বেশি, তাতে কর্ণপাত করছে না কেউ। একদিকে যেমন গাড়ি বাড়ছে, তেমনি দুর্ঘটনাও বাড়ছে। সংখ্যাটা যখনই ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাবে, তখন বিশৃঙ্খলা তৈরি হবেই। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব খন্দকার মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে কী পরিমাণ গাড়ি আছে এবং সড়কের ব্যবস্থাপনাটা কেমন হবে এই দুটো বিষয় যদি সমন্বয় করতে না পারি তাহলে যানজটের কবল থেকে মুক্তি পাবো না। ঢাকায় কী পরিমাণ যানবাহনের ক্যাপাসিটি রয়েছে এটা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। ক্যাপাসিটির বাইরে একটি যানবাহনও যেন নিবন্ধন না পায় তা নিশ্চিত করাও জরুরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বসবাস ঢাকা ও এর আশে পাশে। ফলে মানুষের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে রাজধানীতে চলাচলের জন্য নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মধ্যে পড়ে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার সড়কে সর্বোচ্চ দুই লাখ ১৬ হাজার গাড়ি চলাচল করতে পারে। অথচ ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি। যে কারণে রাজধানীর যানবাহনের জট কমার বদলে বাড়ছেই। জানা যায়, যানজট নিরসনে গত ১০ বছরে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঢাকার রাস্তায় ঢেলেছে সরকার। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয়নি; বরং ১০ বছর আগের চেয়ে গাড়ির গতি কমে ঘণ্টায় সাত কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। সেইসঙ্গে গাড়ির কারণে বেড়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। আবার রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে যতগুলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, তার বেশিরভাগই ছোট ছোট গাড়ি ব্যবহারে মানুষ যেন উৎসাহিত হয় সে ধরনের প্রকল্প; যেমন- ফ্লাইওভার, রাস্তা চওড়া করা ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ঢাকা একটি মেগা সিটি। পরিবহনের সর্বোৎকৃষ্ট আধুনিক বিনিয়োগ করতে হবে গণপরিহনে। সেই ধারণা থেকেই কিন্তু মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা আসে। এখন ফুটপাথকে চলাচলের উপযোগী করা, বাস রুট দ্রুত ফ্রাঞ্চাইজ করা এবং সাইকেল চালানোর জন্য অবকাঠামোর উন্নয়ন যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার চাইলেই তা পারে। সেটা রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক উপায়ে হোক-এই সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তিনি বলেন, বিশৃঙ্খলভাবে সেবা দিতে গিয়ে বাসগুলোর সেবার মান কমে যাচ্ছে। ফলে যাদের বাসে যাতায়াত করার কথা, তাদের কেউ প্রাইভেটকার কিনে ফেলছেন, কেউ কিনছেন মোটরসাইকেল, আবার কেউ অন্য উপায় খুঁজছেন। ছোট ছোট গাড়ি বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো, গণপরিবহন মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। সেবার মান যাচ্ছেতাই। বাসের সংখ্যা ও সেবার মান কমে যাওয়ার পেছনে পরিকল্পনা ও উপযুক্ত নীতিমালার অভাবকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নগর পরিকল্পনাবিদ বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, সরকার সড়ককে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, পরিবহন খাতকে ততটা গুরুত্ব দেয়নি। রাজধানীর উন্নয়নে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন খাত নিয়ে প্রণয়ন করা আছে আরএসটিপি। এই দুটির সমন্বয় ঘটিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আসবে। মানুষ গণপরিবহনের প্রতি নির্ভরশীল হবে। তবে ঢাকার যানজট নিরসনে বাস রুট রেশনালাইজেশনের পাশাপাশি কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তনে ২০১৮ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের নেওয়া তখনকার পদক্ষেপ বিবেচনায় নিয়ে একটি কমিটি করে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১০ সদস্যদের ওই কমিটি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সমীক্ষা শেষে একটি প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে ঢাকার ২৯১ রুটের পরিবর্তে ৪২টি রুটে ২২ কোম্পানির গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার সুপারিশ করা হয়। সীমিত পরিসরে যার কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এছাড়া নগরীতে চলাচলরত আড়াই হাজার কোম্পানির প্রায় ৩০ হাজার পরিবহনের পরিবর্তে ৯ হাজার ২৭টি গণপরিবহন পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১