বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৭ April ২০২২

অদৃশ্য সিন্ডিকেটে অসহায় ভোক্তা


নিত্যপণ্য, ওষুধ, শিক্ষাসামগ্রীসহ সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বাজারে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যত শক্ত কোনো হস্তক্ষেপ নেই। দেশে খাদ্যপণ্যের কোনো সংকট না থাকা সত্ত্বেও হু হু করে বাড়ছে সবকিছুর দাম। দাম বৃদ্ধির জন্য একপক্ষ দোষারোপ করছে অন্যপক্ষকে। কখনো আবার করোনা, কখনো বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দাম বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা এই সব কিছুর জন্য দায়ী করছেন অদৃশ্য সিন্ডিকেটকে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দাম বাড়ানোর পেছনে শুধু খুচরা বিক্রেতা ও পাইকারি বিক্রেতারাই দায়ী নন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পেছনে আমদানিকারক ও বড় বড় কোম্পানির যোগসাজশও রয়েছে। এ যাবৎ তাদের কোনো জবাবদিহি করতে দেখা যায়নি। কারণ এদের অর্থ ও ক্ষমতার জোর অপরিসীম।

তারা বলছেন, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য আজ বাজার থেকে সংসদে পৌঁছে গেছে। সেজন্যই সংসদের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি এখন ব্যবসায়ী। এই সিন্ডিকেট যেন একটি অদৃশ্য শক্তি। সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। যেন কোনো প্রতিকার নেই। দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ব্যবসা বাণিজ্য থেকে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবকিছুই এখন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরই যেন সিন্ডিকেটের কালো থাবায় ক্ষতবিক্ষত। বিশ্লেষকরা বলছেন, যে সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন সেই দলের ছত্রচ্ছায়ায় এই সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে এমন কোনো সেক্টর বাকি নেই যেখানে অসাধু সিন্ডিকেট গড়ে উঠেনি। বাজার থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত এদের বিস্তৃতি। প্রতি ক্ষেত্রেই তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে শোষণ করাই যেন এদের ‘দায়িত্ব’ হয়ে উঠেছে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজির হোসাইন বলেন, আমাদের ভোক্তাদের অধিকার যারা দেবে, তাদের ক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে ভোক্তাদের অধিকার গ্রহণের সুযোগ কমে গেছে। এর মূল কারণ হলো ব্যবসায়ীরা সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ীরা মন্ত্রী, সিটি করপোরেশনের মেয়র, ব্যবসায়ীরা পত্রিকার মালিক অথবা সেই মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এভাবে ব্যবসায়ীদের ক্ষমতা যখন ওপরে উঠছে, তখন ভোক্তার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের পর জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সাড়ে ১৭ ভাগ ছিলেন ব্যবসায়ী। ১৯৯১ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ ভাগে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে শপথ নেওয়া সংসদ সদস্যদের ১৮২ জনই পেশায় ব্যবসায়ী, যা মোট সংসদ সদস্যের ৬২ ভাগ।

ক্যাব সহ-সভাপতি জানান, এসবের প্রভাব বাজারে পড়ছে। তাই হঠাৎ করেই পেঁয়াজ, আলু, তেল, চালের বাজার অস্থির হয়ে যাচ্ছে এবং তা নিয়মিতভাবে অস্থির থাকছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তারা পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কিন্তু ভোক্তাদের কিছুই করার থাকছে না। এর সমাধানে সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কেননা এতে রয়েছে ব্যবসায়ীদের অদৃশ্য চাপ। তারা সরকারকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে কী করতে হবে।

এক সময় চাল, তেল, আটাসহ যেকোনো ধরনের নিত্যপণ্যের সংকট হলে টিসিবি মানুষের পাশে এসে দাঁড়াত। এখন টিসিবি তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না বাজারে। টিসিবি এখন লোক দেখানো গতানুগতিকভাবে চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

চালের মূল্যের উদাহরণ তুলে এস এম নাজির হোসাইন বলেন, চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি শুল্ক কমানো হলো। চাল আমদানি করা হলো, কিন্তু দাম কমলো না। এর কারণ ব্যবসায়ীদের অদৃশ্য সিন্ডিকেট। সরকার কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এখন সরকার বলছে কৃষকদের বাঁচাতে চালের দাম না কমিয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে।

তিনি জানান, সরকার ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু তাদের সক্ষমতা কতটুকু এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ে একজন করে কর্মকর্তা দেওয়া হয়েছে। একজন কর্মকর্তা একটি জেলায় কী কাজ করতে পারবে। একই অবস্থা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের। সীমিত লোক দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব না।

মোবাইল কোর্টের আইন আছে কিন্তু কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে প্রশ্নে রেখে তিনি বলেন, আমি একজন ভোক্তা হিসেবে যদি কোথাও প্রতারিত হই, তাহলে প্রতিকার কে করবে?

দিনের পর দিন তেলের দাম বাড়ছে। ওষুধের দাম বাড়ছে। অথচ ট্যারিফ কমিশনের অনুমোদন ছাড়া তেলের দাম বাড়ানো যায় না। ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া ওষুধের দাম বাড়ানো যায় না। কার কথা কে শুনছে। এগুলো দেখেও না দেখার ভান করে আছে সবাই। সবকিছুর বিবেচনায় বর্তমানে বাংলাদেশের ভোক্তারা অসহায় হয়ে গেছে।

আমাদের সমস্যা আসলে গোড়ায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোক্তা অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা। একজনের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে তার বিপরীত পাশে আরেকজনের স্বার্থ কীভাবে আপনি অক্ষুণ্ন রাখবেন।

তিনি বলেন, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য গরিব-অসহায় এতিম ছেলেমেয়েদেরও ছাড় দেয় না। কোরবানির ঈদে অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে শত শত পশুর চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। প্রত্যেক বছরে সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয় না।

জানা গেছে, পবিত্র রমজান মাসসহ বিভিন্ন উৎসব এলেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এদেশের বেশ পুরোনো বিষয়। রমজানে ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, ছোলা এবং মসলার চাহিদা বেশি থাকে। এই চাহিদাকে পুঁজি করে অসাধুচক্র নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে যান। সিন্ডিকেট করে বাড়িয়ে দেন পণ্যের দাম। যার প্রভাব নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়ায়। খেটে খাওয়া, দিনমজুর ও যাদের দৈনিক বা মাসিক আয় নির্দিষ্ট, পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তাছাড়া রমজানে এসব মানুষের আয় বাড়ে না, বরং অনেকের কমে যায়।

বিগত কয়েক বছরে দেখা গেছে ব্যবসায়ীরা এখন আর রমজানে দাম তেমন বাড়াছেন না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রমজান আসার এক-দুই মাস আগে থেকেই পণ্যের দাম কয়েক দফা বাড়িয়ে দিচ্ছেন, যাতে কেউ বলতে না পারে রমজানের কারণে দাম বেড়েছে। এ কারণে এবার পেঁয়াজ, রসুনের দাম ঠিক থাকলেও ভোজ্যতেলসহ অন্য পণ্যের দাম এরই মধ্যে কয়েক দফা বেড়েছে।

সমপ্রতি ব্র্যাকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ কাজ হারিয়েছে ৬২ শতাংশ। পাশাপাশি পুরোপুরি কর্মহীন হয়েছেন ২৮ শতাংশ মানুষ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রকোপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় মানুষ আবারো আশার আলো দেখছেন। সবকিছু পেছনে ফেলে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। ঠিক এমন সময় পণ্যের বাড়তি দর ক্রেতাদের ভোগান্তিতে ফেলছে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ায় তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তরা সমন্বয় করতে পারলেও মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা বলেন, সীমিত সংখ্যক জনবল ও সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে দেশব্যাপী ভোক্তা অধিকার সুরক্ষিত করতে নিরলসভাবে আমরা কাজ কর‌ছি। অধিদপ্তরের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী আন্তরিক হয়ে দায়িত্ব পালনের কারণে পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় এ অধিদপ্তরের ওপর মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশা বহুগুণ বে‌ড়ে‌ছে।

তিনি বলেন, আমরা নিয়‌মিত অভিযান করছি। পাশাপা‌শি ব্যবসায়ী ও ভোক্তা‌দের সচেতনতা বাড়া‌তে পরামর্শ দি‌য়ে যা‌চ্ছি। জরিমানা নয়, আমাদের উদ্দেশ্য ব্যবসায়ী ও ভোক্তা‌ উভয়‌কে স‌চেতন করা।‌ প্রয়োজনীয় লোকবল পেলে আমাদের এ কার্যক্রম আরো ত্বরান্বিত হবে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১