আপডেট : ১৯ April ২০২২
বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে দেশে আসছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। পরে বিভিন্ন হাত ঘুরে অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি যানবাহনে ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকাসহ সারা দেশে। পুলিশ বলছে, অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন সময় অস্ত্র উদ্ধার করলেও বেশিরভাগ অস্ত্রই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে সামনে সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এসব অবৈধ অস্ত্র দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার আশঙ্কা পুলিশের। পুলিশ জানায়, সন্ত্রাসীদের একটি সিন্ডিকেট কারাগার থেকে এসব অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। আর তদারকি করছে দুবাইতে পালিয়ে থাকা পুলিশের তালিকার ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ জিসান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন জরুরি সেবার পরিবহনের মাধ্যমে এসব অবৈধ অস্ত্র সরাসরি চলে যায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। সেসব অস্ত্র ব্যবহার হয় কয়েক স্তরে। এসব অস্ত্র ভাড়াও দেওয়া হয় । পুলিশ বলছে অনেকসময় একজন খুনি জানেও না কার অস্ত্র সে ব্যবহার করছে। ডিএমপি গোয়েন্দা বিভাগের (গুলশান) উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, যার কাছে মূল অস্ত্র থাকে, সেটা দেখা গেল তিনচারটা স্তর পরিবর্তন করে স্যুটারের কাছে চলে যায়। মশিউর রহমান আরো বলেন, জেলখানায় কিছু সন্ত্রাসীরা আটক থাকেন, সেই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে বিদেশি কারো কারো সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকে। এরা কখনো আবর্জনার ব্যবসা, ইন্টারনেট ব্যবসা, ডিসের ব্যবসা বা চাঁদা উঠায়। সেই চাঁদাবাজির জন্য তারা আগ্নেয়াস্ত্র নিজেদের কাছে রাখেন। তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালানো পুলিশের নিয়মিত কাজ। অভিযানে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও বেশিরভাগ অস্ত্রই থেকে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। এছাড়া, কী পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ঢাকায় আছে তার সঠিক তথ্য নেই তাদের কাছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সীমান্তপথে ভারত থেকে খুব সহজেই অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী দরিদ্র কৃষক ও দিনমজুরদের অস্ত্র বহনে বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারতীয় অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ অবৈধ অস্ত্র যাচ্ছে রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, ভূমিদস্যু এবং সন্ত্রাসীদের হাতে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবির) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার জানান, বিভিন্ন সময়ে একাধিক অস্ত্রের চালান জব্দ করেছে ডিবির টিম। এসব ঘটনায় একাধিক অস্ত্র ব্যবসায়ী প্রেপ্তার হয়েছে। অবৈধ অস্ত্রৈর ব্যবসা, চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ওপর নজরদারির পাশাপাশি তাদের প্রেপ্তারে সবসময় ডিবি কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি একটি চালান আটক করার সময় ছাত্রদল এক নেতাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই নেতা অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ডিবির এ কর্মকতা বলছেন, আগে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশ আসত। তবে সে প্রেক্ষাপট এখন আর নেই। তবে মাঝেমধ্যে কিছু অবৈধ অস্ত্রের চালান সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আসছে, এ নিয়েও কাজ করছে ডিবি। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমানের তত্ত্ববাবধায়নে দুজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের টিম অস্ত্রের চালানটি আটক করার পাশপাশি পাঁচ অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে গত ১ সেপ্টেম্বর। ওই চক্রের দলনেতা আকুল হোসেন। এ চক্রের শেকড় খুঁজে পেতে ৮ মাসেরও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চালানো হয়। অবশেষে আকুলের গ্রুপের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও এ চক্রের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা মেহেদীকে প্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি ভারতে অবস্থান করার কারণে। গত ৭ বছরে আকুল যেসব ব্যক্তির কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছে, তার মধ্যে ২৫ জনের নাম তারা পেয়েছেন। এসব ব্যক্তিদের কাছে আকুলের কাছ থেকে কেনা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি গত ৭ বছরে আকুলের সবরাহ করা আড়াইশ অস্ত্র কাদের হাতে গেছে, তাও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু এক চক্রের হাত দিয়েই যদি আড়াইশ অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করে তাহলে এমন আরো একাধিক চক্র রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সীমান্তা এলাকায় দুর্বল নজরদারি থাকার কারণে অবৈধ অস্ত্র সহজে ভারত সীমান্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশে আসছে। এ অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতাদেরও সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মূলত, অবৈধ অস্ত্রের হাতবদল একেক সময় একেক ধরনের কৌশল নেওয়া হয়। এসব অবৈধ অস্ত্রের মজুত নানা প্রয়োজনে গড়ে তোলা হয়। জাতীয় নির্বাচন, স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরেও অবৈধ অস্ত্রের চালান আসতে থাকে ভারত থেকে। এ ছাড়া জমি দখল, চাঁদাবাজি, আধিপত্য নিয়ন্ত্রণেও অবৈধ অস্ত্রের মজুত গড়ে উঠছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে অবৈধ অস্ত্রের চালান ধরা পড়লেও চালান বন্ধ হচ্ছে না। অবৈধ অস্ত্রের চালান বন্ধ করতে সীমান্তে আরো কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলম জানান, সীমান্তকেন্দ্রিক অস্ত্র চোরাচালানচক্র রয়েছে। তবে এখন অতি গোপনে এ সব অস্ত্র দেশে ঢুকছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্রবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশের এ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্ত্রবাজরা মূলত অস্ত্র চোরাচালান ও বেচাকেনায় জড়িত বলে তিনি জানান। র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন অবৈধ অস্ত্রের মালিক, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নজরদারি শুরু করেছে। গত আগস্ট মাসে তারা অবৈধ অস্ত্রপাচার ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের হেফাজত থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাবের এ কর্মকর্তা বলছেন, গত আগস্ট মাসেই র্যাব বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে এবং এর ব্যবসা ও বহনের অভিযোগে ৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিপুল সংখ্যক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র একটি চক্র অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশে আনার চেষ্টা করছে। সীমান্ত এলাকা দিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও করছে। এ কারণে সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, সীমান্ত এলাকার থানাগুলোকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। বাড়াতে বলা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। সন্দেহ হলেই যেকোনো জরুরি সেবার গাড়িও তল্লাশির আওতায় আনার জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১