আপডেট : ২১ April ২০২২
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাড়ছে তরলীকৃত গ্যাস ও সারের দামও। এ অবস্থায় ভর্তুকি কমাতে সরকারের কয়েকটি বিভাগ গ্যাস ও বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করেছে। তবে বর্তমান মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের ত্রাহী অবস্থা। এর মধ্যে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়লে জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে আপাতত এ চারটি সেবায় ভর্তুকি বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চিন্তা করছে সরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসে বছরে ৭০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন। কিন্তু এ খাতে সরকারের এখন পর্যন্ত বরাদ্দ রয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। বাকি বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দিতে সরকারের একটি মহল বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াতে চায়। এ নিয়ে কয়েক মাস ধরে কাজ চলছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ানোর আবেদনও তৈরি করেছে, যা জমা হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অবশ্য সারের দাম বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। যদিও গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে সারের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়ায় সরকার বিপাকে পড়েছে। আর মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায় যে জন্য আমদানি করা গ্যাস দিয়ে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তবে বাংলাদেশের মানুষের বড় অংশ দরিদ্র। ফলে এখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দরকার নেই। প্রয়োজনে লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম না বাড়ানোর পরামর্শ তাদের। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বমুখী জ্বালানি তেল, গ্যাস, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম। দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে। ফলে বাধ্য হয়েই সরকার চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ওসব খাতে ভর্তুকির বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকিতে চাপ বাড়ছে। ইতোমধ্যে মূল বাজেটে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল তার ৭১ শতাংশ ছাড় করা হয়ে গেছে। সেজন্যই সংশোধিত বাজেটে বেশ কয়েকটি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। কারণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বাড়তি দাম সমন্বয় বা ভর্তুকিতে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য অর্থ বিভাগকে চাপ দিচ্ছে। এমন অবস্থায় সরকার সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকিতে বরাদ্দ বাড়ানোর পথেই হাঁটছে। ফলে আপাতত জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং সারের দাম না বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৪৮ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ওই খাতে আরো ১২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৬১ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, বিশ্ববাজারে তেলের বাড়তি দামের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) প্রতিদিন ৮০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। গত বছরের ৪ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন ৮৫ ডলার ছিল তখন সরকার দেশের বাজারে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা মূল্য সমন্বয় করে। গত ২০ বছরে দেশে ১৭ বার ডিজেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৩ বার বেড়েছে আর কমেছে ৪ বার। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে জনজীবন তথা মূল্যস্ফীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। সেজন্যই আপাতত ওই পণ্যের দাম সমন্বয়ের পক্ষে নয় অর্থ বিভাগ। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়তি থাকায় সরকার গত ৮ মাসে এলএনজিতে ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। চলতি বাজেটে ওই খাতে বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া তেলবীজ, সুদ ও টিসিবি খাতে মোট মূল ভর্তুকি বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ওসব খাতে প্রায় ৫ হাজার টাকা ভর্তুকি বেড়ে মোট দাঁড়াচ্ছে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সূত্র আরো জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ খাতের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে। কারণ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশে ওই দুটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গত ৮ মাসে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আর বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ বেড়ে এখন দাঁড়াচ্ছে ১২ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য বেড়েছে কয়েক গুণ। দেশের বার্ষিক প্রায় ৬০ লাখ টন সারের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই সরকারি সংস্থার নির্ধারিত মূল্যে আমদানি ও বিক্রি করা হয়। প্রতি কেজি ইউরিয়া আমদানির মূল্য আগের অর্থবছরে ৩২ টাকা থেকে চলতি অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬ টাকা। কিন্তু কৃষকদের কথা বিবেচনা করে সরকার সারের মূল্য বাড়াতে পারছে না। ফলে এ খাতেও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে কৃষি খাত ৫ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা ভর্তুকি পেয়েছে। কৃষি খাতে চলতি অর্থবছর ভর্তুকিতে বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ওই খাতে ভর্তুকি বেড়ে মোট দাঁড়াচ্ছে ১২ হাজার কোটি টাকা। এদিকে চলতি জানুয়ারি থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য সরকার নগদ প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। ওই কারণে এ খাতে অর্থ ছাড়ের চাপ বাড়ছে। রেমিট্যান্স খাতে প্রণোদনা বাবদ চলতি বাজেটে ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ বেড়ে ওই খাতে মোট দাঁড়াচ্ছে ৫ হাজার কোটি টাকা। আর রপ্তানি খাতে প্রণোদনা ও ভর্তুকি বাবদ ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ওই খাতে ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াচ্ছে মোট ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। তাছাড়া পাটজাত দ্রব্য রপ্তানিতে ভর্তুকি বাবদ মূল বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৮০০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ওই খাতে ভর্তুকি বাড়িয়ে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেন, সরকারের বড় ভর্তুকি যাচ্ছে এলএনজি (গ্যাস) আমদানি করতে গিয়ে। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। আর গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়লে সারসহ অন্যান্য অনেক কিছুর দাম বেড়ে যাবে। তাই মনে রাখতে হবে, গোটা লোকসান জনগণের কাছ থেকে নেওয়া যাবে না। এ খাতে অবশ্য সরকারের ভর্তুকি বাড়াতে হবে। এ দুটি প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অধিক হারে বাড়লে তা জনগণের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজন হলে মানুষ অন্ধকারে থাকবে, লোডশেডিং মেনে নেবে কয়েক ঘণ্টা। কিন্তু এলএনজি দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে যদি বিদ্যুতের ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় তার ফলে গোটা অর্থনীতি তছনছ হয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি বাড়বে, দ্রব্যমূল্য বাড়বে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মানুষের সম্পদ কমে যাবে, আয় কমে যাবে। তাই প্রয়োজনে বিদ্যুতের রেশনিং করা হোক, তবুও দাম বৃদ্ধি নয়। এ অবস্থায় এ খাতে সরকারের ভর্তুকি বাড়িয়ে গ্রাহক পর্যায় দাম না বাড়ারো সিদ্ধান্তকে ভালো উদ্যোগ বলে তিনি মনে করেন।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১