আপডেট : ২৩ April ২০২২
রাজধানীর নিউ মার্কেটে সংঘর্ষের ঘটনায় সিসিটিভিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আর এ ফুটেজের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে মূল অপরাধীদের। নজিরবিহীন এ সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজন নিহত হয়েছে। আর এসব ঘটনায় মোট ৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই হত্যা মামলার তদন্তভার পাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ। এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ রহস্য উন্মোচনে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। পুলিশ বলছে, ঘটনার পেছনে কারো ইন্ধন আছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। ওই সংঘর্ষের মধ্যে ডেলিভারিম্যান নাহিদ মিয়া নিহতের ঘটনায় গত বুধবার রাতে একটি হত্যা মামলা হয়। গতকাল শুক্রবার মুরসালিন নিহতের ঘটনায় আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। নিউ মার্কেট থানার ওসি শ ম কাইয়ুম জানান, নিহত নাহিদের চাচা মো. সাইদ যে হত্যা মামলাটি করেছেন, তা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর দোকান কর্মচারী মুরসালিন নিহতের ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে আরেকটি হত্যা মামলা হয়েছে। এ মামলাতেও অজ্ঞাত পরিচয় ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। নিউ মার্কেট জোনের পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শাহেনশাহ বলেন, এই মামলাটিও গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। বাকি দুই মামলার তদন্ত নিউ মার্কেট থানা পুলিশ তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন ওসি কাইয়ুম। তবে এ পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ সিসি ক্যামেরা ও অন্যান্য ভিডিও বিশ্লেষণ করছে। নিউ মার্কেটের চার নম্বর ফটকের ভেতরের সিসি ক্যামেরা ভিডিওতে ঢাকা কলেজের তিন শিক্ষার্থী চিহ্নিত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশ সবকিছু নিয়ে কাজ করছে, হেলমেট পরা কারা ছিল আর বাইরে থেকে কে কে ওই এলাকায় গেছে, সেসব দেখা হচ্ছে। হত্যা মামলার বাইরে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে একটি মামলা করেছেন নিউ মার্কেট থানার এসআই মেহেদী হাসান। একই থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইয়ামিন কবির দাঙ্গা-হাঙ্গামা, জ্বালাও পোড়াও, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আরেকটি মামলা করেছেন। পরিদর্শক ইয়ামিন কবিরের মামলায় নিউ মার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সরদার মকবুল হোসেনসহ ২৪ জনের নাম রয়েছে। ওয়েলকাম ও ক্যাপিটাল ফাস্টফুড নামের যে দুই দোকানের কর্মচারীদের দ্বন্দ্ব থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত, সেই দোকান দুটির মালিক মকবুল ও তার স্ত্রী। তবে কোনো দোকানই নিজেরা চালান না। একটি দোকান তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম ও অপরটি চাচাতো ভাই শহিদুল ইসলামকে ভাড়া দিয়েছেন। মামলায় যে ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। ওসি বলেন, যাদের নাম এসেছে, তাদেরকে উসকানিদাতা হিসেবে অভিযোগে আনা হয়েছে। তবে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের কি না তা মামলায় উল্লেখ নেই। গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, দুটি দোকানের কর্মচারীদের মধ্যে শক্তি প্রদর্শনের জন্যই কি এই ঘটনা, নাকি এর পেছনে ইন্ধন আছে রাজনৈতিক কিছুর তা নিয়েও তারা কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দোকানকর্মীদের রক্তক্ষয়ী ওই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল গত সোমবার রাতে নিউ মার্কেটের একটি খাবারের দোকানে ঢাকা কলেজের কয়েকজন ছাত্র মারধরের শিকার হওয়ার পর। দোকান মালিকরা জানান, দুই দোকানের কর্মীদের বচসা থেকে একপক্ষ ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাস থেকে কয়েক শিক্ষার্থীকে ডেকে আনে। তারা গিয়ে মারধরের শিকার হওয়ার পর ছাত্রাবাসে ফিরে আরও শিক্ষার্থীদের নিয়ে মধ্যরাতে নিউ মার্কেটে হামলা চালাতে গেলে বাধে সংঘর্ষ। গত মঙ্গলবার দিনভর চলা এই সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে নাহিদ মিয়া নামের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণকে রাস্তার ওপর রাম দা দিয়ে কোপানো হয়। এলিফ্যান্ট রোডের ডাটা টেক কম্পিউটার নামের একটি দোকানের ডেলিভারি অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করতেন নাহিদ। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাহিদের মাথার বাম পাশে পাশাপাশি চারটি কাটা জখম ছিল, জখমগুলো দুই থেকে সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা। চার জখমে ২৩টি সেলাই দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। পিঠের বাম পাশে পাশাপাশি তিনটি কাটা জখম। যার প্রত্যেকটি পাঁচ ইঞ্চি করে লম্বা। বাঁ পায়ের গোড়ালির নিচে কাটা জখমেও পাঁচটি সেলাই লেগেছিল, এছাড়া উভয় পায়ের বিভিন্ন জায়গায় নীল-ফোলা কালা জখম ছিল। নাক-মুখেও জখম ছিল। অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার সংঘর্ষের মধ্যে ইটের আঘাতে আহত দোকান কর্মচারী মুরসালিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার ভোরে মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের ভাই নূর মোহাম্মদ বাদী হয়ে নিউ মার্কেট থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এই সংঘর্ষের ঘটনায় এ নিয়ে এখন পর্যন্ত চারটি মামলা দায়ের করা হলো। নিউ মার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স ম কাইয়ুম বলেন, মুরসালিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে একশ থেকে দেড়শ জনকে। নিউ মার্কেট থানার এসআই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইন সরকারি সম্পদ জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। আর নিউ মার্কেট থানা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ইয়ামিন কবির বাদী হয়ে পুলিশের কাজে বাধা, পুলিশের ওপর আক্রমণ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ভাঙচুর করার অপরাধে ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৩০০ জন ব্যবসায়ী ও কর্মচারী এবং ঢাকা কলেজের অজ্ঞাতনামা ৭০০ ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এছাড়া সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত নাহিদের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ সাঈদ বাদী হয়ে ২০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মুরসালিন হত্যা মামলার প্রতিবেদন ৮ জুন : রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থী-ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষে দোকান কর্মচারী মুরসালিনের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৮ জুন দিন ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম মামলার এজাহার গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় মুরসালিনের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. মনিকা খন্দকার। ঢামেক হাসপাতাল মর্গ সূত্রে জানা যায়, আঘাতের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মুরসালিনের মৃত্যু হয়েছে। মুরসালিন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার বাডাকান্দি গ্রামের মো. মানিক মিয়ার ছেলে। বর্তমানে কামরাঙ্গীরচর ঝাউলাহাটি চৌরাস্তা এলাকায় থাকতেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মুরসালিন দ্বিতীয়। এছাড়া মুরসালিন এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তার স্ত্রীর নাম মিতু আক্তার। নিউ মার্কেট থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) হালদার অর্পিত ঠাকুর জানান, মিরপুর রোডের নিউমার্কেটের সামনে মুরসালিন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এদিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, পুলিশ ক্লুলেস ঘটনাও খুঁজে বের ও রহস্য উন্মোচন করে। আর নিউ মার্কেটের সংঘর্ষের ঘটনা তো সবার সামনে ঘটেছে। এ বিষয়ে নিশ্চয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সময় তিনি ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পুলিশের বার্ষিক আজান, কেরাত ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ শেষে তিনি এ কথা বলেন। আইজিপি বলেন, শুধু সিসিটিভি ফুটেজ নয়, প্রত্যেক সাংবাদিকের ক্যামেরায় ফুটেজ আছে। একটু ধৈর্য ধারণ করুন, পুলিশ তদন্ত করছে, নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, যারা এ ধরনের আচরণ করেছেন তারা যারাই হোন ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ থেকে সতর্ক থাকবেন। সংঘর্ষে দুর্ঘটনা ঘটেছে, আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব বিষয়ে পুলিশের যেসব আইনগত ব্যবস্থা সেগুলো আমরা অবশ্যই দেখবো। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলজের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আইজিপি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে সবাইকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। এ ধরনের ঘটনা সবারই পরিহার করা উচিত। এ ধরনের কাজ দেশ পরিপন্থী। দেশ ও দেশের বাইরে জাতি হিসেবে এ ধরনের ঘটনা যথাযথভাবে রেপুটেড করে না। সংঘর্ষের ঘটনায় করা মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদেরকে রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, এ বিষয় আমার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় সাংবাদিকসহ যারা হামলা ও অন্যায়ের শিকার হয়েছেন তাদের প্রত্যেকের জন্য আমাদের তরফ থেকে যা করা দরকার আমরা তার সবকিছু করবো।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১