আপডেট : ২৯ April ২০২২
অবশেষে ৬ দিন পর সার্ভার চালু করেছে ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল)। কিন্তু বিল দেরিতে জমা দেয়ার অভিযোগে, ২৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৮২ গ্রাহকের কাছ থেকেই জরিমানার নামে আদায় করছে অতিরিক্ত ১২ কোটি টাকা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই বিপুল পরিমাণ টাকা এক শ্রেণির ব্যাংক কর্মকর্তা, তিতাস গ্যাসের অসাধু কর্মকর্তা লুটেপুটে খাওয়ার জন্য গত ১৮ এপ্রিল থেকে বন্ধ দেখানো হয় সার্ভার। এ বিষয়ে গত ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের খবরে ‘সার্ভার সমস্যায় জিম্মি গ্রাহক’ শিরোনামে এক একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। এই সংবাদ নজরে এলে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ২১ এপ্রিল থেকে সার্ভার ঠিক করে দেয়। এ দিন ছিল বৃহস্পতিবার অর্থাৎ পরের দুদিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় গত ২৪ এপ্রিল থেকে ব্যাংকগুলো গ্যাস বিল নেয়া শুরু করে। তবে প্রতি বিলের জন্য ২০ টাকা আর প্রতি মাসের জন্য ১০ টাকা এই হারে সাধারণ গ্রাহক সংখ্যা ২৮ লাখ ৭৪ হাজার ৮৪৮, বাণিজ্যিক গ্রাহক ১২ হাজার ৭৫, সিএনজি গ্রাহক ৩৯৬, ক্যাপটিভ ১ হাজার ৭০১, শিল্প গ্রাহক সংখ্যা ৫ হাজার ৩১৩, সার কারখানা ৩ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্রাহক সংখ্যা ৪৬। প্রতিবিলে ২০ টাকা হারে এই গ্রাহকের জরিমানা হয় ৫ কোটি ৭৯ লাখ ৭ হাজার ৬৪০ টাকা। আর মাসিক ১০ টাকা হারে জরিমানা হলে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৫৩ হাজার ৮২০ টাকা দাঁড়ায়। এই হিসাবে সবমিলিয়ে জরিমানার মোট টাকার অংক দাঁড়ায় ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৬১ হাজার ৪৬০ টাকা। এ বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেডের মতিঝিলস্থ প্রধান কার্যালয়ের সহকারী ম্যানেজার ওমর ফারুক তিতাস গ্যাসের সার্ভার সমস্যা ও বিল প্রতি ২০ টাকা আর মাস প্রতি ১০ টাকা হারে জরিমানা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমাদের কিছুই করার নেই। যথাযথ কর্তৃপক্ষ আমাদের যে নির্দেশ দেবেন, আমাদের তা-ই করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এক শ্রেণির ব্যাংক ও তিতাস গ্যাস কর্মকর্তা এই অতিরিক্ত টাকা লুটেপুটে খাওয়ার জন্য এ টাকা আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা কিছুই জানি না। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও ব্যাংক কর্তকর্তাদের যে কাজ করতে বলবে আমরা তা-ই করবো। এর বাইরে তিনি আর কোনো কথা বলতে চান না। পুরানা পল্টনের বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার এসেছেন ৩ তোপখানা রোডস্থ জনতা ব্যাংক শাখায়। তিতাস গ্যাস বিল জমা দিতে এসেছেন। তাকে বিলপ্রতি ২০ টাকা জরিমানা দিতে হয়েছে। যদি মাস বকেয়া পড়ে থাকে তাহলে প্রতি মাসে ১০ টাকা করে জরিমানা দিতে হবে বলে ব্যাংকের গ্যাস নেয়ার দায়িত্বরত কর্মকর্তা আনোয়ার সাহেবকে জানান। বায়তুল মোকাররম এলাকায় সোনালী ব্যাংক শাখা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার জনতা ব্যাংক শাখা, মতিঝিল ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শাখাসহ তিতাস বিল নেয়া সব ব্যাংকেই একই অবস্থা ছিল। গত ১৮ এপ্রিল থেকে তিতাস গ্যাস সার্ভারে জটিলতা সৃষ্টি হয়। ২১ এপ্রিল দুপুরের দিকে তিতাস গ্যাস সার্ভার ঠিক হয়। কিন্তু পরের দিন শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় ৬ দিন পর গত ২৪ এপ্রিল থেকে জরিমানাসহ তিতাস গ্যাস বিল নেওয়া শুরু করে ব্যাংকগুলো। বিশেষজ্ঞরা জরিমানার অর্থ মওকুফ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান। গতকাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৩৩ তোপখানা রোডের জনতা ব্যাংক শাখার এক কর্মকর্তা জানান, তিনি শাহ্ জালাল ইসলামী ব্যাংকে তিতাসের বিল জমা দেয়ার জন্য গিয়েছিলেন। তাকেও জরিমানা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, সার্ভার ঠিক না থাকলে যাতে গ্রাহকের জরিমানা দিতে না হয় এ জন্য সরকার ও তিতাস গ্যাস কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান। তোপখানা রোডে অবস্থিত জনতা ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার পঙ্কজ কুমার রায় বলেন, আমাদের কিছুই করার নেই। যদিও সার্ভার চালু হয়েছে ২১ এপ্রিল। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সামনে শুক্রবার ও শনিবার দুই ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। তিতাস গ্যাস কোম্পানি নোটিশ দিয়ে আমাদের কিছুই জানায়নি। আমাদের সংশ্লিষ্টরা সার্ভার খুলে দেখে চালু করেছে। এরপর থেকে বিল নেওয়া শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুন-অর-রশিদ মোল্লার সঙ্গে কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি। তবে রাজস্বের বিষয়টি আমরা দেখি না বলে দাবি করেছেন উত্তরা জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণ শাখার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আনোয়ার পারভেজ। তিনি এজিএমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। দক্ষিণ জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণ শাখার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শবিউল আওয়ালও একই কথা বলে এড়িয়ে যান। উপমহাব্যবস্থাপক এ এইচ এম মাছউদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনিও কিছু না বলে এড়িয়ে জান। তিনি আইসিডি ও অর্থ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তারাও এ বিষয়ে কথা বলতে চান না। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে অবৈধ সংযোগের রমরমা বাণিজ্য চলছে। এ কাজের সঙ্গে সিবিএ নেতা, কম্পিউটার অপারেটরসহ কোম্পানির অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িত। কয়েক মাস আগে ১৭৩ বাড়িতে নতুন এক হাজার ২৪৭টি চুলার তথ্য তিতাসের সেন্ট্রাল সার্ভারে যুক্ত করা হয়। বিষয়টি সম্প্রতি সামনে আসায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তিতাস। চার সদস্যের এ তদন্ত কমিটি এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বাড্ডা জোনের কয়েক কর্মকর্তার যোগসাজশ ও অবহেলা খুঁজে পায়। অনুসন্ধান চলাকালে তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, জোনাল অফিসের সিসি ক্যামেরা দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকলেও তা সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এ অপকর্মে আটটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান জড়িত বলে কমিটির প্রতিবেদনে জানানো হয়। এই আট প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত ও তাদের তিতাস কার্যালয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারির সুপারিশ করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এরপর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চললেও সংঘটিত নারায়ণগঞ্জে মসজিদে দুর্ঘটনার পর সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশে অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে তিতাস। বাড্ডা অফিসের সাময়িক বরখাস্ত আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তিতাসের এক কর্মকর্তা জানান, ২০১০ সালের ১৩ জুলাই আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ৭ মে থেকে শর্তসাপেক্ষে বাসাবাড়িতে নতুন সংযোগ দেওয়া শুরু হলেও এক বছরের মাথায় তা ফের বন্ধ করা হয়। এখন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি। কিন্তু এ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রতিবছর তিতাসের বার্ষিক প্রতিবেদনে সংযোগ বৃদ্ধির তথ্য ওঠে আসে। চলতি বছরের শুরুর এ বিষয়ে তদন্তে নামে তিতাস। তিতাসের তদন্তে দেখা যায়, সাত লাখ সংযোগ বিভিন্ন সময়ে সার্ভারে এন্ট্রি করে বৈধ করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এক হাজার ২৪৭টি সংযোগের বৈধতার সঙ্গে জড়িত থাকায় আটজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে মামলায় বলা হয়েছে, সাত লাখ অবৈধ সংযোগ একই প্রক্রিয়ায় বৈধ করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য আরেকটি সূত্র জানায়, গ্যাস বিতরণের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় এই কোম্পানিটি এমন সব দুর্নীতি সামনে এসেছে যা পুরোপুরি নতুন ও কল্পনাতীত। বৈধ সংযোগ বন্ধ, তখন সংযোগ দেওয়া হয়েছে, আবার সেসব গ্রাহকের আস্থা সৃষ্টি করার জন্য কাগজপত্র তুলে দেওয়া হয় তাদের হাতে। যথারীতি সেসব গ্রাহক বিলও জমা করেন। ২০১২ সালে এ রকম পে-স্লিপের মাধ্যমে ব্যাংকে ১০০ কোটি টাকা জমা পড়ে । তিতাসের আবাসিক গ্রাহকেরা যেসব ব্যাংকে প্রতি মাসে গ্যাসের বিল জমা দেন, সেই ব্যাংকগুলো থেকে ওই বাড়তি টাকার হিসাব কোম্পানির কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগে আসে। কিন্তু এই টাকা তিতাসের হিসাবে জমা হচ্ছে না ( পোস্টিং না হওয়া) তাই বেকায়দায় পড়ে তিতাস। আর তখনেই বিষয়টি সামনে চলে এলে তখন বিষয়টি নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যকর সৃষ্টি হয়।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১