বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১০ May ২০২২

হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক


রণজিৎ দাস। বয়স ৪০ ছুঁই ছুঁই। মুচির কাজ করাই ছিল তার পেশা। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে রাজধানীর খিলগাঁও তালতলায় থাকতেন। গত দুই বছরে করোনা মহামারির কারণে বাসা ভাড়াসহ সংসারের খরচ চালানো তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের কৈয়ারবন তার গ্রামের বাড়ি। চলতি বছর শুরুতে তিনি গ্রামের বাড়ি গিয়ে দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধান চাষের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু টাকা না থাকায় স্থানীয় শাল্লা উপজেলা কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তর থেকে আর্থিক সহায়তা নেন।

দুই বিঘা জমিতে ৬০ মণ ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি বোরো চাষ করেন। ফলনও হয় ভালো। কিন্তু ধান কাটার আগ মুহূর্তে বৃষ্টি ও আগাম বন্যায় সব ধান তলিয়ে যায়। এতে মাথায় হাত পড়লো রণজিতের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০১৯ সালে এখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) বাঁধ নির্মাণ করেছিল। এরপর থেকে আর বাঁধ সংস্কার বা নতুন বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করতো পিআইসি।

এদিকে, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক জোসেফ আকঞ্জি (৪৫)। দুই একরের কিছু বেশি জমিতে বোরো ধান আবাদ করেন। তার জমি পড়েছে শনির হাওরে। পানি বেড়ে যাওয়ায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ক্রমশ বাড়ছে। জোসেফ বলেন, তাহিরপুরের অধিকাংশ বাঁধ অপরিকল্পিত। দুর্নীতি আর অনিয়মের কারণে বাঁধ ভেঙ্গে যায়।

কৃষক জমির উদ্দিন, আবু কায়েস, সুবোল দাস, মো. কামাল, মো. মামুন সিলেট বিভাগে হাকালুকি হাওর ও টাঙ্গুয়ার হাওর পারের বাসিন্দা। তারা মিলে টাঙ্গুয়া হাওরে ১৮ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেন। এই হাওর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় ঠিকাদারদের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। তারা অভিযোগ করেন, কোনো বাঁধেই স্লুইস গেট নেই। তাহলে বিপুল পরিমাণ ধান ডুবে যেত না।

শুধু তারাই নয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার ৭০টি উপজেলার ৩৭০টি হাওর নিয়ে হাওরাঞ্চলের ২ কোটি বাসিন্দার শতকরা ৭০ ভাগ কৃষক। এরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিস্ট ঠিকাদাররা বাঁধ কেটে দেয়। যাতে বাঁধ সংস্কারের নামে আবার শত কোটি টাকা হানিয়ে নিতে পারেন বলে অভিযোগ করেন হাওড়বাসী।

কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাওরের ৭টি জেলায় মোট বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমি। এর বিপরীতে ৯ লাখ ৫০ হাজার ৪০৬ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। তবে পরিপূর্ণভাবে হাওর এলাকায় আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৫১ হাজার ১৯৬ হেক্টর জমিতে। এর বাইরে থাকা আবাদকৃত ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২১০ হেক্টর জমি হাওরবহির্ভূত এলাকায় পড়েছে। হাওর অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত উঁচু ও সমতল জায়গায় অবস্থিত জমির ফসল হাওরবহির্ভূত বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, ৭০টি উপজেলার ৩৭০টি হাওর ছাড়াও এশিয়ার বৃহত্তম কয়েকটি হাওরের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। যেমন মৌলভী বাজার ও সিলেট জেলার হাকালুকি হাওর অবস্থিত ধর্মপাশা রুইবিল, হাকালুকি, শনির হাওর, সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত এটা দ্বিতীয় বৃহত্তম হাওর। কিশোরগঞ্জ জেলায় বড় হাওর তৃতীয় বৃহত্তম হাওর। চলতি হাওর সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। তাছাড়া কিশোরগঞ্জ ধুপিবিল হাওর নেত্রকোনা পুটিয়ার হাওর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দক্ষিণখোলা আকাশী বিল। এছাড়াও ছোট বড় আরো অসংখ্যা হাওর রয়েছে। হাতিমারা হাওর এলংজুরী, ছিলানী, শাপলা, নূরপুর, কাতিয়ারকোন বাঘমারা, বনপুর, চিমনি, জয়সিদ্ধির হাওর প্রভৃতি।

এলাকাবাসী জানায়, জেলার মোহনগঞ্জে ডিঙাপোতা হাওরের অস্থায়ী মাটির বাঁধ প্রায় প্রতি বছর উজান থেকে নেমে আসা ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেঙে যায়। বানের পানিতে তলিয়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওরপারের হাটনাইয়া, মাঘান, ভাটিয়া, নারাইচ, মল্লিকপুর, চেছরাখালী (আদর্শনগর), নলজুরী, পালগাঁও, রানাহিজল, গাগলাজুর, পাবইসহ আশপাশের কমপক্ষে ১৫টি গ্রামের বোরো ধানের ক্ষেত। প্রায় প্রতি বছর একমাত্র বোরো ফসল হারিয়ে কপাল পোড়ে এলাকার হাজারো কৃষকের। এলাকার কৃষকরা সারা বছর অর্থকষ্টে ভোগেন। এ কারণে এলাকাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ডিঙাপোতা হাওরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান বলেন, হাওর এলাকার কৃষি এবং কৃষকদের উপকারের জন্য সরকার বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে হাইজদা বাঁধ অন্যতম। ওই বাঁধ নির্মাণের ফলে হাওরের ফসল আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। এলাকার কৃষকরা ফসলহানির হাত থেকে রক্ষা পাবে।

জানা যায়, প্রতি বছরই সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে অন্যান্য হাওরের ন্যায় এই হাওরেও কাজ করা হয়। কিন্তু এ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ না করায় হাওরের কান্দা গুলো নিচু থাকায় নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কান্দা উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করা শুরু করলে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সাজিনুর মিয়া সহ এলাকার কৃষকদের প্রাণপণ চেষ্টায় উপচেপাড়া পানি আটকাতে সক্ষম হয়।

সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ নিয়ে অন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি মুঠোফোনে জানান, যেভাবে ধীরগতিতে হাওরের ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধের নির্মাণ কাজ চলছে তাতে অবস্থা খুবই ভয়াবহ হতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা যদি এভাবে অবহেলা করেন, তাহলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মাণ শেষ করা সম্ভব হবে না।

তাহিরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হান কবির মুঠোফোনে জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরের বাঁধগুলো নিয়েই যত সমস্যা। বাঘমারার বাঁধটি রক্ষায় ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিন-রাত কাজ করেছি। বাঁধের আশপাশে অনন্ত তিন কিলোমিটারে কোনো বসতি নেই। লোকজন পাওয়া যায় না। শ্রমিকের সংকট। তবু এখানে পালাক্রমে থেকে বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা করেছি। এখন কী হয় জানি না। তবে তাহিরপুরের অন্য হাওরগুলোর অবস্থা ভালো বলে জানান তিনি দাবি করেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, উজানের বৃষ্টিই আমাদের জন্য সমস্যা বেশি। ১৫ দিন ধরে মাটির বাঁধগুলো ঢলের পানির ব্যাপক চাপ সামলাচ্ছে। মাটি নরম হয়ে গেছে। অনেক বাঁধে ফাটল ও ধস আছে। সেগুলোতে দিন-রাত কাজ হচ্ছে। আমরা সবাই মিলেই চেষ্টা করছি। দু-একটা দিন ধরে রাখতে পারলে মনে হয় বিপদ কেটে যাবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুনামগঞ্জ জেলার এক কর্মকর্তা জানান, বাঁধ ভাঙ্গে না। ঠিকাদাররা কেটে দেয় বাঁধ।

এদিকে হাওরে বাঁধ নির্মাণে লুটপাট বন্ধের দাবিতে গত ২৩ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দুটি সংগঠন যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। বক্তারা বলেছেন, বাংলাদেশের ৮৫টির বেশি নদ-নদীর পানি শুকিয়ে গেছে। এতে বাড়ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। পাতালেও মিলছে না পানি, চাষাবাদে ঘটছে পরিবর্তন, তাপমাত্রায় পারদ উঠছে। এই সময়ে সুনামগঞ্জসহ দেশের হাওর অঞ্চলের কৃষকের মাথায় হাত। যখন ফসল ঘরে তুলবেন তখন পানিতে ভেসে গেছে তা।

পানিতে ফসল ডুবে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে অভিযোগ করে বক্তারা বলেন, তখন একশ্রেণির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উন্নয়নের নামে চলে চরম লুটপাট। সাধারণ কৃষক বার বার হয় বঞ্চিত। অথচ রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা তারা অপচয় করে। এভাবে আর কতদিন চলবে। জাতিকে এ নৈরাজ্য থেকে মুক্তি দিতে হবে। ‘বাঁচলে কৃষক, বাঁচবে দেশ’, ‘বাঁচাও হাওর, বাঁচাও দেশ’- এখন আর শুধু স্লোগান নয়, এটি কৃষকের হূদস্পন্দন।

বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থার কেউ যদি দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তা যদি বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে তাকে চাকরিচ্যুতি করতে হবে। পাশাপাশি চাকরি শেষে যে পেনশন পান তা বন্ধ করে দিতে হবে। ঠিকাদারসহ অন্যরা যদি দুর্নীতি করেন, ঠিকাদারের লাইসেন্স কালো তালিকাভুক্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ ব্যাপারে গত কয়েকদিন পানি উন্নয়ন বোর্ডে সংশ্লিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, এ দপ্তরে ঈদের আমেজ কাটেনি। সংশ্লিস্ট কোন কর্মকর্তাকেও পাওয়া যায় না। তারপরও দু-এক জন কর্মকর্তা মহাপরিচালক ফজলুর রশিদের অনুমতি ছাড়া কথা বলতে চান না। পরে মহাপরিচালকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তার দপ্তর থেকে জানানো হয়, তিনি ঈদের পরে এখনো অফিসে আসেন নাই।

 


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১