বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১৭ June ২০২২

সারা দেশে উৎসব চান প্রধানমন্ত্রী


পদ্মা সেতু উদ্বোধনের উৎসব শুধু পদ্মার পাড়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা দেশে করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে পল্লি জনপদ, রংপুর এবং বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বাপার্ড), কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

এ সময় দুর্নীতিচেষ্টার মিথ্যে অভিযোগ এনে অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক সরে গেলেও দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও অভূতপূর্ব সাড়া ছিল বলেই সব বাধা পেরিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে দৃঢ়তা দেখানো সম্ভব হয়েছে বলেও মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের উৎসব শুধু পদ্মাপাড়ে হবে না, সারা দেশে উৎসবটা করবেন। আমি চাচ্ছি বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় উৎসব হোক কারণ এটা আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল।

দুর্নীতি চেষ্টার মিথ্যে অভিযোগ, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, রাজনৈতিক বাদানুবাদ, গুজবসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে খরস্রোতা পদ্মার বুক চিরে নির্মিত পদ্মা সেতু খুলে দেয়া হচ্ছে ২৫ জুন, শনিবার। সেদিন শুধু পদ্মাপাড়ে নয়, সারা দেশে উৎসবমুখরতা দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
উদ্বোধনের দিন আনন্দ করতে গিয়ে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, গাড়ি নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে যাতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে সেদিকে সতর্ক থাকতে দক্ষিণাঞ্চলবাসীসহ সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

শেখ হাসিনা বলেন, উৎসবটা শুধু পদ্মাপাড়ে হবে না, সারা দেশে এই উৎসবটা করবেন। আমি চাচ্ছি, বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় জেলায় উৎসব হোক। কারণ এটা আমাদের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী অ্যামাজন এবং তারপরে হচ্ছে পদ্মা। এই নদীতে আমরা যে একটা সেতু করতে পারি, এটা অনেকেরই ধারণা ছিল না। তার ওপর এই সেতুটা হচ্ছে দ্বিতল সেতু। নিচ দিয়ে ট্রেন ওপর দিয়ে গাড়ি যাবে। এটা একটা কঠিন কাজ। পৃথিবীতে এই ধরনের কাজ বোধ হয় এটাই প্রথম। এখানে যেসব মেশিনারিজ ব্যবহার করা হয়, এটা বোধহয় আর কোথাও এভাবে হয়নি। এটার যে বাধাটা ছিল সেটাও আপনারা জানেন।

উৎসবের রং যাতে ফিকে না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, আমরা আগামী ২৫ তারিখে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করতে যাচ্ছি। সেখানে আমি সবাইকে একটু অনুরোধ করব, সবাই একটু ধৈর্য ধরে, কোনো প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বা গাড়ি নিয়ে প্রতিযোগিতা, কে আগে গেল, পরে গেল এসব করবেন না। অর্থাৎ কোনো ধরনের কোনো দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন সবাই।

এই পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চল আর ‘অবহেলিত’ থাকবে না বলেও মনে করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়ে গেছে। যে দক্ষিণাঞ্চল সারা জীবন অবহেলিত, আর অবহেলিত থাকবে না। কারণ যোগাযোগব্যবস্থা যদি একটা জায়গায় হয়, তাহলে সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থা এমনিতেই উন্নত হয়। সেটা হলো বাস্তবতা।

আর আমরা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ, পদ্মাপাড়ের মানুষ সব সময় অবহেলিত ছিলাম। দারিদ্র্য আমাদের নিত্যসঙ্গী। আল্লাহর রহমতে আর সেটা থাকবে না।

দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুযোগ হওয়ায় মানুষের কল্যাণে কাজ করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘যে কারণে আমাদের উন্নয়নগুলো আজ দৃশ্যমান হচ্ছে। আর মানুষ তার সুফলটা পাচ্ছে।

দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে চাষযোগ্য জমি রক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সে জন্য আমরা সারা বাংলাদেশে ১০০টা অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি। যত্রতত্র যেখানে-সেখানে কেউ শিল্প গড়ে তুলতে পারবে না।

তিনি বলেন, ফসলি জমি নষ্ট করে কেউ শিল্প-কলকারখানা করতে পারবে না। করলে আমরা সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস কোনো কিছুই দেব না। পরিষ্কার কথা আমাদের। কাজেই এটা কেউ করতে পারবে না।

দেশটাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার জানিয়ে তিনি বলেন, আমি চেষ্টা করেছি যে আমাদের পল্লি অঞ্চলে একেবারে তৃণমূলের পড়ে থাকা মানুষগুলো, তাদের ভাগ্যটা কীভাবে পরিবর্তন করা যায়। এবং আমাদের উন্নয়নের যত কর্মসূচি আমরা নিয়েছি সব আপনারা লক্ষ করবেন আমরা কিন্তু গ্রামের মানুষকে সামনে রেখেই করেছি। যেন আমাদের উন্নয়নটা গ্রাম থেকে উঠে আসে।

আজকে আমি শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে পেরেছি। রাস্তাঘাট, পুল, ব্রিজ করে আমরা যোগাযোগের উন্নয়ন করে দিচ্ছি। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি।

দারিদ্র্য বিমোচনে মানুষকে ধারণা দেয়া বা প্রশিক্ষণ দেয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেশে খুব কম বলে জানান সরকারপ্রধান।

দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ বরাবরই অবহেলিত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই অঞ্চলের মানুষকে যাতে ট্রেনিং দেয়া যায় দারিদ্র্য বিমোচন কমপ্লেক্স ভবন আমরা প্রথমে কোটালীপাড়ায় গড়ে তুলি। সেটাই পর্যায়ক্রমে আজকে উন্নত হয়ে এখন একটা অ্যাকাডেমিতে উন্নীত হয়েছে।

গোপালঞ্জের কোটালীপাড়ায় বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লি উন্নয়ন একাডেমি গড়ে তোলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এটা করার কারণে আজকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সবার জন্য একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখান থেকে মানুষ ট্রেনিং নিতে পারছে এবং চমৎকার একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কাজেই আমি মনে করি এটি আমাদের দেশে দারিদ্র্য বিমোচন এবং গবেষণা ও জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ভূমিকা রাখবে। কারণ আমাদের লক্ষ্যই হচ্ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, তাদের জীবনমান উন্নয়ন করা। শহরের মানুষ যে সুযোগটা পায় সেটা গ্রামের সৃষ্টি করা।

রংপুরের পল্লী জনপদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে মাত্র ৩০ পার্সেন্ট টাকা দিয়ে একটা ফ্ল্যাটের মালিক হবে। আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে ১৫ বছরে বাকি টাকাটা দেবে। এর মধ্য দিয়ে নিজস্ব একটা থাকার জায়গা তার হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, প্রত্যেক বিভাগে প্রথমে একটা করে করা হবে এবং চাহিদা অনুযায়ী এটা আরও বাড়ানো হবে। যাতে মানুষ সম্পূর্ণ শহরের নাগরিক সুবিধা পাবে।

এদিকে, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ হারিয়ে ক্ষুব্ধ নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসের তদবিরের কারণেই দুর্নীতিচেষ্টার মিথ্যে অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়িয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন সরকারপ্রধান।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি ধন্যবাদ জানাই আমার দেশবাসীকে। আমি যখন ঘোষণা দিয়েছিলাম আমার দেশের টাকায় করব, তখন আমার দেশের মানুষ, তারা আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল, বলেছিল যার যা আছে দেব, আমরা নিজের টাকায় করব। অনেকে আমাকে চেকও পাঠিয়েছে। যদিও আমি ভাঙি নাই, সেগুলো রেখে দিয়েছি।

এভাবে যে মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া, এটা আমাকে সাহস জুগিয়েছিল। এটাই আমাকে শক্তি জুগিয়েছিল। কারণ মানুষের শক্তিতে আমি বিশ্বাস করি। আজকে আমরা সেই পদ্মা সেতু সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে আমরা তৈরি করতে পেরেছি, এত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে।

পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে পথটা মোটেও সহজ ছিল না বলে জানান বঙ্গবন্ধুকন্যা। তার সরকারের ওপর দুর্নীতির মিথ্যে অভিযোগ আনা হয় বলে জানান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম। আমরা এখানে দুর্নীতি করতে বসিনি। নিজের ভাগ্য গড়তে বসিনি। দেশের মানুষের ভাগ্য গড়তে এসেছি, দেশের উন্নয়ন করতে এসেছি।

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্ব ব্যাংকের সরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দুষেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশেরই একজন যে আমাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুযোগ পেয়েছে, সব থেকে বেশি সুযোগ-সুবিধা যে আমার কাছ থেকে নিয়েছে, তারই বেঈমানির কারণে এই পদ্মা সেতুর টাকাটা বন্ধ হয়ে যায়।

কারণ একজন ব্যক্তি একটা ব্যাংকের এমডির পদ... আমাদের তো এখন প্রায় ৫২/৫৩টি ব্যাংক আছে। প্রত্যেক ব্যাংকেই তো একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টর আছেন। কতজন পারে বিদেশে টাকা বানাতে? অথবা লাখ লাখ ডলার ডোনেশন দিতে বা বিদেশ ঘুরে বেড়াতে কে পারে?
নোবেল বিজয়ী ইউনূস কী কী সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন, সেটাও সবিস্তারে তুলে ধরেন সরকারপ্রধান।

তিনি বলেন, দুর্ভাগ্য হলো সব থেকে বেশি আমি তাকে সুযোগ দিয়েছি। গ্রামীণফোন ব্যবসাটা আমার আমলে আমি তাকে দিয়েছিলাম। এবং তাকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংক যখন একেবারে বসে যাচ্ছিল তখন সেই গ্রামীণ ব্যাংক চালু রাখার জন্য ’৯৮ সাল আমাদের জন্য খুব একটা... কারণ বিশাল বন্যা ছিল। সেই অবস্থায়ও আমাদের রিজার্ভ খুবই কম। সবদিক থেকেই অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই ইয়ে ছিল। এশিয়াব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা। তারপর দীর্ঘ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত।

সে অবস্থাতেও এই ব্যাংকটা যেন চালু রাখতে পারে প্রথমে ১০০ কোটি, তারপর ২০০ কোটি, এরপর আরো ১০০ কোটি- মোট ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে ব্যাংকটা চালু রাখার সুযোগ করে দিই।
গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ ফিরে পেতে ড. ইউনূসের মরিয়া হয়ে ওঠার গল্পটাও উঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।
তিনি বলেন, তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদটা ছাড়বেন না, ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদটা ছাড়বেন না। যদিও আইন আছে ৬০ বছর। তার তখন ৭০ পার হয়ে গেছে। ১০ বছর তিনি বেআইনিভাবে এমডি থেকেছেন। তারপর আরো থাকবেন।

কারণ কোর্ট আর যা-ই পারুক, তার বয়স তো আর ১০ বছর কমাতে পারেনি। যদি কমাতে পারত হয়তো কমিয়ে দিত, এটা আমি জানি। কিন্তু কমাতে পারেনি। হেরেও গিয়েছিলেন। ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে দেয়া তার অনুদান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি তদবির করে ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে দিয়ে, হিলারি ক্লিনটন তার বন্ধু ছিল, সে ছিল আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ক্লিনটন ফাউন্ডেশনে তিনি মোটা অংকের চাঁদাও দিয়েছিলেন। অনুদান দিয়েছিলেন। জানি না এত টাকা কোথা থেকে পেল, কিন্তু সেটাও দিয়েছিল।

কানাডার কোর্টের রায় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কানাডার কোর্ট রায় দিয়েছে যে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যেসব অভিযোগ এনেছে সব ভুয়া, মিথ্যা, দুর্নীতির কোনো অভিযোগই এখানে টেকেনি। আমরা আমাদের পক্ষে রায় পেয়ে গিয়েছিলাম। শত বাধার মুখে বল আমি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করতে পেরেছি।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১