আপডেট : ২০ May ২০২৩
তৈয়ব আলী সরকার,নীলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভার কসাইখানার বেহাল দশা। জায়গার সংকট, চারপাশে ময়লার ভাগার, আছে পানির স্বল্পতা, কুকুর, কাকের উপদ্রব, খোলা জায়গা ও রোদ—বৃষ্টির আতঙ্ক। এসব কারণে চরম ভোগানিত পোহাতে হচ্ছে কসাইদের। এ পরিস্থিতি সমাধানের কোন উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের।
ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জবাই ও খালগিরি করা হচ্ছে। একারণে গোশতে নোংরা লাগা কুকুর ও কাকের থাবায় রোগজীবাণু মিশছে। সেই সাথে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় রোগাক্রান্ত, গর্ভবতী ও অসুস্থ্য পশু জবাই করে সরবরাহ করা হচ্ছে বাজারে। যা অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সৈয়দপুর শহরের নয়াবাজার সুরকী মহল্লার ভাগাড় এলাকায় মূল শেডের ভিতরে ও বাইরের খোলা জায়গায় গাদাগাদি করে ২০ টি গরু জবাই করে চামড়া ছিলার কাজ করছে কসাইরা। মেঝেতে রক্ত, গবরের স্তুপের মধ্যে চলছে গোশত কাটার কাজ। পাশে গরুর ভুঁড়ি, চামড়া ও গোশতের উচ্ছিষ্ট ফেলা হয়েছে। সেগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে কাক আর দলে দলে কুকুরের হুরোহুরি।
ভাগাড়ের ময়লা আবর্জনা মাড়িয়ে কাক-কুকুড় ছুটাছুটি করছে শেডের ভিতরে। সেখানে আস্ত চামড়া আর গোশতের ওপরে নোংরা পায়ে বসে ঝিল্লি ছেঁড়ায় ব্যস্ত কাক। একইভাবে সুযোগ বুঝে গোস্তের ওপর দাঁত বসাচ্ছে কুকুর। কখনো কখনো পুরো রান কুকুর টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অথচ এসব যেন তোয়াক্কা করছেনা গোশত ব্যবসায়ীরা। এমনকি সেগুলো না ধুয়েই তারা রিকশা, ভ্যান ও অটোতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে দোকানে।
এদৃশ্য প্রতিদিনের। ছোট বড় মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ টি গরু জবাই হয় এই কসাইখানায়। কিন্তু জায়গা না থাকায় একসাথে ১০ টির বেশি পশু জবাই সম্ভব না। এসময় অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় পশু মালিকদের।
পানি স্বল্পতার কারণে গোশত ধোয়া, রক্ত পরিষ্কার করতে বেশি সময় লাগছে। ফলে সবগুলো গরুর খালগিরি শেষ করতে সময় লাগে কমপক্ষে প্রায় ৫-৭ ঘন্টা। এতে ভোর ৫ টায় শুরু করলেও শেষ হয় ১২ টার পর। শুক্রবার আরও বেশী সমস্যার সৃষ্টি হয়। কারণ এইদিন দ্বিগুণ পশু আসে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কসাই বলেন, এরপরও আমরা এখানে পশু জবাই করতে আনি। সারা বছর অনেক কষ্ট করে কাজ করি। বর্ষায় এই ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। এখন রোদে পুড়ছি আর তখন পানিতে ভিজে নোংরা ময়লায় একাকার হয় শেডসহ বাইরের অংশ। কসাইখানা থেকে রাস্তা পর্যন্ত কাঁদা আর কাঁদা। এর মধ্যে গরু আনা জবাই করা ও গোশত নিয়ে যাওয়া কি যে দূর্ভোগ তা না দেখলে বুঝানো মুশকিল।
এসময় অপর একজন কসাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের এই ভোগান্তির কথা বার বার বলেও পৌর কর্তৃপক্ষ বা ইজারাদার কেউ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ পশু প্রতি ১০০ টাকা করে দিতে হয়। বিনিময়ে সামান্য সেবাও পাইনা। আবার অন্য জায়গায় জবাই করলে এসব ভোগান্তিও নাই, টাকাও লাগেনা। কিন্তু আইনের নামে আমাদেরকে এই দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তবে এখন অনেকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় নিজ নিজ উদ্যোগে পশু জবাই করছে।
অভিযোগ উঠেছে, ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার কসাইখানা টেন্ডারের মাধ্যমে নিতে হয়েছে ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। সঠিক দরে ইজারা দেয়া হলে কসাইখানার উন্নয়ন করতে পারতো ইজারাদার। অথবা সব টাকা যদি পৌরসভার তহবিলে জমা হতো তাহলে সেই টাকাতেও কাজ করা যেত। কিন্তু টাকা চলে গেছে ব্যক্তিগত পকেটে।
এব্যাপারে সৈয়দপুর গোশত ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও কিলখানার ইজারদার মো. নাদিম কোরাইশী জানান, ‘নিজের টাকাই তুলতে পারছিনা। সেখানে সেবা কি দিবো? ইজারার টাকা দিয়ে উন্নয়ন করতে পারে পৌরসভা। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ কোন কাজই করছে না। অথচ শেডের পরিধি বাড়ানোসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান খুবই জরুরী।
তিনি আরও বলেন, কসাইদের কষ্টের কথা ভেবে একাধিকবার লিখিত আবেদন জানিয়েছি পৌর মেয়রকে। কিন্তু তিনি বার বার আশ্বাস দিলেও কিছু করেননি। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নিয়জিত ডাক্তার ও পৌর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত আসে না।
এলাকাবাসীর অভিযোগে জানাযায়, আগামী জুন মাসে পূর্বের টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হবে। নতুন করে টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারা দিতে আবারও চলবে টাকার খেলা। কিন্তু কিলখানার কোন উন্নতি হবে না। সাবেক মেয়র আমজাদ হোসেন সরকার ও আখতার হোসেন বাদল যেটুকু করে গেছে সেটাকে পূঁজি করেই সবাই পকেট ভারি করছেন।
এজন্য কসাইদের পক্ষে দাবী উঠেছে, দ্রুত বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা না হলে, প্রয়োজনে ব্যবসা বন্ধ করে দিবে নয়তো আন্দোলনে নামবে তারা। স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং মানসম্মত গোশত সরবরাহে পৌর কর্তৃপক্ষসহ প্রশাসনের সার্বিক হস্তক্ষেপ আশা করেছেন গোস্ত ব্যবসায়ীরা।
উপজেলা সেনেটারী ইন্সেপেক্টর আলতাব হোসেন বলেন, কসাইখানা আর্বজনার ভাগারে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সেখানে কোন পরিবেশ নাই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গরু জবাই হচ্ছে। তদারকি করতে গেলে সেখানে দূরগন্ধে থাকা যায় না। বার বার মেয়র ও পৌর পরিষদকে অভিযোগ করে কোন সমাধান হয় নি।
উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকতার্ ডা. শ্রী শ্যামল কুমার রায় বলেন, কসাইখানায় পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কোন লোকবল সেখানে নিয়জিত নাই। কারন পৌরসভা থেকে এ ব্যাপারে আবেদন করা হয়নি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকতার্ ডা. আলিমুল বাশার বলেন, গরু জবাইয়ের পূর্বে অবশ্যই গরু স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরী, অসুস্থ্য গরু জবাই করা যাবে না। অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত গরুর গোস্ত খেলে পেটে পীড়া, ডাইরিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়া সম্ভবনা বেশি থাকে।
পৌরসভার নিবার্হী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পৌরসভার নিজস্ব কোন চিকিৎসক বা মেডিকেল এ্যাসিস্টেন্ট নাই। তবে কনজারভেন্সি বিভাগের মমিনুল ইসলাম ও তথ্য কর্মকতার্ আকমল সরকার রাজু তদারকির দায়িত্বে আছেন। তারা সঠিক বলতে পারবেন।’
সৈয়দপুর পৌরসভা মেয়র ও পৌর মহিলা আওয়ামীলীগের সভাপতি রাফিকা আকতার বেবীর মোবাইলে একাধীকবার যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভ না করায় মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১