আপডেট : ২৪ December ২০২৩
রুহুল ইসলাম টিপু: বাংলার হিন্দু, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। স্বাধীনতার সঙ্গীত। সকল ধর্ম সর্বমত নানান পথ একীভূতের বাণী। হাজার বছর ধরে বিপরীত মতাবলম্বীর সকল মানুষ একই স্থানে ভিন্ন ধর্ম পালনের রীতি প্রচলিত। সে তো এই বাংলাদেশে। ডিসেম্বর এলেই ম্যারি ক্রিস্টমাসের শুভেচ্ছার সাথে চলে আসে বর্ণিল কেক। ইংরেজি নববর্ষের অভিবাদন। মানুষ অপর মানুষের সাথে আলিঙ্গন করবে। মিলে মিশে বাস করবে। সহমত একই পথের দিশারী হবে। সমাজ এভাবে বিকশিত হয়ে এগিয়ে যাবে। এ রীতিনীতির সাথে মানুষের চিরায়িত বাস। বাংলাদেশে হিন্দু মসুলমান বৌদ্ধ খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী যেমন রয়েছেন; তেমনি ধর্মীয় অনুশাসনে আবদ্ধ বিভিন্ন অঞ্চল এবং গোষ্ঠীভেদে বিচিত্র আচার আচরণের প্রথাও রয়েছে এদেশে। এক পন্থার আচার আচরণের অনুসারীগণ অন্য বিশ্বাসীদের প্রতি মান্যতা প্রদর্শন করে। অনুভূতি বিশ^াসের প্রতি কেউ আঘাত করেন না। নৃ-গোষ্ঠী আদিবাসীর পোশাক আশাক সমতল ভূমির মানুষ থেকে ভিন্নতর। বাংলাদেশ শান্তির দেশ। প্রশান্তিতে উপভোগ করা হয় সকল ধর্মীয় উৎসব। আনন্দ উল্লাসে পূজা ঈদ বৌদ্ধ পূর্ণিমা প্রভাকরণ ইস্টার সানডে বড় দিনসহ বছরব্যাপী সব আয়োজনে মেতে উঠে সবাই। ক্রিস্টমাস খৃষ্টান সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। খৃষ্টীয় ২০০ সাল থেকে এ উৎসব পালনের প্রচলন রয়েছে। ৩৫৪ সালে দিনটিকে যীশুর জন্মদিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৪৪০ সালে পোপ এ ঘোষণা স্বীকার করেন। প্রতিবছর ২৫ ডিসেম্বর সকল খৃষ্টীয় ধর্ম অনুসারী যীশুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে বড়দিন উৎসব বিশ^ব্যাপী পালন করা হয়। প্রভু যীশুর জন্মস্থান; গাজার মাত্র ৭৫ কিলোমিটার সন্নিকটে বেথলেহেম পশ্চিম তীরের জেরুজালেমের দক্ষিণে একটি ফিলিস্তিনি শহরে; খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান তীর্থস্থান। জন্মস্থানটি ৬ষ্ঠতম শতাব্দীর চার্চ অব দ্য নেটিভিটির অধীন গ্রেটোতে একটি সিলভার স্টার দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৫ শতকের চার্চ এবং ১৮৬০ সালের ওমর মসজিদের সাথে ম্যাঞ্জার স্কোয়ারে। ক্রিস্টমাস ধর্মীয় বিশ^াস থেকে উদ্ভুত। এখন সেটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব। এ আয়োজন ঘিরে শুভেচ্ছা কার্ড ও উপহার বিনিময় ঘটে। যিনি উপহার নিয়ে আসেন, তাঁকে নানা নামে ডাকা হয়, যেমন ফাদার ক্রিস্টমাস, শান্তা ক্লজ, সেইন্ট নিকোলাস ইত্যাদি। ক্রিস্টমাস ট্রি অপরূপ দর্শনীয় আদলে সাজানো হয়; যেমন মোচাকৃতির পাইন বা ফার বৃক্ষ- ছোট ছোট বৈদ্যুতিক বাল্ব ও উপহার সামগ্রী দিয়ে অলংকৃত করা হয়। গাছের উপর দেওয়া হয় দেবদূত ও তারার প্রতিকৃত। শোভা পায় যীশুর শিশুকালের দৃশ্য, যেমন- গোয়ালঘরে পশুকে খড় খাওয়ানোর গামলায় যীশু, পাশে তাঁর মা মেরী ও দন্ডায়মান যোশেফ। শিশুদের আনন্দের দিক হচ্ছে- পূর্বদিন মোজা ঝুলিয়ে রাখা, যাতে শান্তা ক্লজ এগুলি ভরে উপহার দিতে পারেন। ক্রিস্টমাস ট্রি-র তলায়ও উপহার রেখে দেওয়া হয়, যেগুলো ক্রিস্টমাসের দিন সকালে খোলা হয়। বিশেষ খাবার তৈরি করা হয়; যেমন বিভিন্ন রকমের মাংস, পুডিং, পিঠা পায়েস, পোলাও কোড়মা, ক্রিস্টমাস কেক ইত্যাদি। শিশুরা যীশুর প্রশংসা গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। ০৭ অক্টোবর হতে হামাস ইসরাইল যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত আহত হচ্ছে। ধ্বংসস্তুপের মধ্যে রয়েছে গাজাবাসী। এহেন পরিস্থিতিতে মিডিয়াতে স্থান পায় বেথলেহেম এর করুণ চিত্র। যুদ্ধের প্রভাবে বেথলেহেম খালি হয়ে যাওয়ায় যীশুর জন্মস্থানে সবচেয়ে খারাপ ক্রিস্টমাস। বেথলেহেম চার্চ অব দি নেটিভিটি দেখতে আসা বিশে^র দর্শকদের নিকট হতে পর্যটন আয় এবং চাকরির জন্য অনেকে নির্ভরশীল। ম্যাঞ্জার স্কোয়ারের চারপাশের স্মারক দোকানগুলি এখন বন্ধ। বেথলেহেম সাধারণত ক্রিস্টমাসে সবচেয়ে ব্যস্ত থাকে। এবছর যুদ্ধ পর্যটক তীর্থযাত্রীদের ভয় দেখিয়েছে। হোটেল, রেস্তোঁরার দোকানগুলি নির্জন করে দিয়েছে। তিন মাসব্যাপী দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের হামলা, গাজায় ইসরাইলের সামরিক হামলা, পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির খবর এখন বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বেথলেহেমের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কেউ আসছে না। তাদের কোন অতিথি নেই। আলেকজান্ডার হোটেলের মালিক জোয়ি কানাভাতি যার পরিবার ৪ প্রজন্ম ধরে বেথলেহেমে বসবাস ও কাজ করেন তাঁর কথা, ‘সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ ক্রিস্টমাস এখন বেথলেহেমে। বড়দিনের জন্য বেথলেহেম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্রিস্টমাস ট্রি নেই, আনন্দ নেই, ক্রিস্টমাস স্পিরিট নেই।’ ক্রিস্টমাস শুরুর দিন ০২ ডিসেম্বর চার্চ অব নেটিভিটির ভিতর একজন সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে ছিলেন। যীশুর জন্মস্থানে খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীবৃন্দ ঝাঁকে ঝাঁকে দলে দলে চলে আসবেন। এই স্বাভাবিক দৃশ্য অনুপস্থিত। কানাভাতি বলেন, ০৭ অক্টোবরের পূর্বে তার হোটেলটি ক্রিস্টমাসের জন্য সম্পূর্ণভাবে বুক করা হয়েছিল। তিনি অন্যদের সাহায্য করতে শহরের অপর হোটেলগুলোতে রুম খুঁজছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরের বছরের জন্য বুকিংসহ সবাই বাতিল করেছে। বাতিলকরণের ই- মেইল আসতে থাকে। তিনি আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের দেখান; খালি ঘর, নিরব ডাইনিং রুম। তাদের প্রতি রাতে কমপক্ষে ১২০ জন লোক ডিনারে অংশগ্রহণ করেন, সেসময় সম্পূর্ণ প্যাক থাকে। কোলাহল, লোকজনে পরিপূর্ণ হৈ হল্লোড় দেখা যায়। এখন শুধুই খালি। ক্রিস্টমাস ব্রেকফাস্ট নেই, ক্রিস্টমাস ডিনার নেই, ক্রিস্টমাস বুফে নেই। বেথলেহেমের ম্যাঞ্জার স্কোয়ার, চার্চ অব দ্য নেটিভিটির সামনে একটি বড় পাকা জায়গা যা সাধারণত ক্রিস্টমাস উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। এখন শান্ত, প্রায় খালি। রনি তাবাশ যিনি তার পরিবারের দোকানে ক্রসিফিক্স, ভার্জিন মেরির মূর্তি ধর্মীয় ট্রিঙ্কেট বিক্রি করেন। সময় কাটানোর জন্য তাক পণ্যসামগ্রী গুছিয়ে রাখছিলেন। তিনি জানান, দুই মাস তীর্থযাত্রী পর্যটক ছাড়াই আছেন। আশাহীনতা বন্ধ করার উপায় হিসেবে দোকানটি খোলা রাখেন। তিনি অনুভব করতে চান যে সবকিছু স্বাভাবিক জীবনের মতো ফিরে আসবে। ফালাফেল রেস্তোরাঁ আফতেমের মালিক আলা’আ সালামেহ বলেন, তার ব্যবসা মাত্র ১০ থেকে ১৫ ভাগ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশী দর্শনার্থীদের স্বাভাবিক আগমনের পরিবর্তে স্থানীয় ফিলিস্তিনি পরিবারগুলির জন্য খাদ্য সরবরাহ করছেন। রেস্তোঁরা খোলা রাখেন; কারণ তার কর্মীদের কাজের প্রয়োজন। তিনি চিন্তিত, কর্মীদের টাকা দিতে হবে; তাদের পরিবার সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য। বেথলেহেমে এখন সবাই শান্তির জন্য প্রার্থনা করছেন। বেথলেহেম সেই শহর যেখানে শান্তির জন্ম হয়েছিল। এটি বিশে^র শান্তির বাহক হওয়া উচিৎ। স্মরণ করি ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় সংঘটিত চার্চ ও হোটেল এ বোমা হামলায় প্রায় ২৭০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা। এতে শ্রীলংকার খৃষ্টান সম্প্রদায় ও স্থানীয় লোক ছাড়াও যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, পর্তুগাল, ভারত, তুরস্ক, অষ্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ড, জাপান, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, আমেরিকা ও চীনের নাগরিক বোমা হামলা’র শিকার হন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিকটতম আত্মীয়ও এ হামলায় নিহত হন। মৃত্যু যুদ্ধ ধর্ম শান্তির সাথে বেমানান। মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় শহীদ ৩০ লক্ষ প্রাণের আন্তর্জাতিক গণহত্যার স্বীকৃতি’র দাবি এদেশবাসীর। মানব হত্যা গণহত্যার বিচার হতে হবে। ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে ফিরে আসে শান্তি প্রগতি ও উন্নয়ন। মানবিক আত্মিক উন্নয়ন হচ্ছে সুখ- শান্তি। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। মিডিয়াতে এসেছে গাজার ২.২ মিলিয়ন জনসংখ্যার ২০ হাজার নিহত হওয়ার সংখ্যাটি প্রায় ১% প্রতিনিধিত্ব করছে। বিশ্ব এমন ন্যাক্কারজনক তথ্য গ্রহণ করতে চায় না। সাতদিনের যুদ্ধবিরতি ব্যতীত সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ জন নিহত হয়েছে। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমান সংঘাতে গাজায় নিহতদের প্রায় ৭০ ভাগ নারী ও শিশু। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলেছে যে, গাজা ৬ মাসের মধ্যে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে যদি সংঘাত শেষ না হয়। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফের মতে গাজা এখন ‘শিশু হওয়ার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা।’ ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন কে সামনে রেখে শেষ হোক সকল সংঘাত যুদ্ধ এবং মৃত্যু। শান্তি প্রতিষ্ঠায় মানুষই এগিয়ে আসবে। জগতে মানুষের থেকে বড় কিছু নেই। মানবিক মূল্যবোধ যীশুর শিক্ষা ও আদর্শকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সাথে সকলেই ছড়িয়ে দিবেন। বিশ্ব হোক আরও আলোকিত সুন্দর এবং সকল মানবের বাসযোগ্য। বড়দিনের সকল আয়োজন সফল হোক। যুদ্ধহীন এক শান্তিময় বিশ্ব প্রত্যাশা করছি- এবারের বড়দিনে। উন্নয়ন কর্মী ও কলাম লেখক।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১