আপডেট : ১৩ May ২০২৪
নিজস্ব প্রতিবেদক:: উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বারখ্যাত ঈশ্বরদী বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। প্রশাসনিক বিন্যাসে পাবনা জেলার একটি উপজেলা হলেও ঈশ্বরদীর অবস্থান দেশের অনেক জেলা শহরের চাইতেও উপরে। দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ঈশ্বরদীর রুপপুরে অবস্থিত। এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম ইক্ষু গবেষণা প্রতিষ্ঠান, রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত এলাকা (ইপিজেড), সুতাকল, পাটকল, ধান মাড়াই শিল্প, পোল্ট্রি শিল্প, রপ্তানিযোগ্য গার্মেন্টস, বিভিন্ন ধরনের হস্ত শিল্প, ঐতিহ্যবাহী বেনারশিসহ এক শিল্পসমৃদ্ধ জনপদ ঈশ্বরদী। দেশের বৃহত্তম কাগজ কল ঈশ্বরদীর পাকশীতে অবস্থিত। যদিও এটি এখন বন্ধ। এখানে রয়েছে একটি কৃষি ডিপ্লোমা ইন্সটিটিউট এবং সেরিকালচার ফার্ম। কৃষির ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখে চলেছে এই এলাকা। ঈশ্বরদীর লিচুর সুনাম দেশের গন্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ধান, পাট, ইক্ষুসহ নানান অর্থকরী ফসল যেমন বিভিন্ন ধরনের সবজি, আম এবং কলা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে এই জনপদ। ব্রিটিশ আমলে প্রমত্তা পদ্মা নদীর উপর তৈরি পাকশি হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং নব্বইয়ের দশকে তৈরী লালন শাহ ব্রিজ রেল ও সড়ক পথে রাজধানী ঢাকা, বন্দর নগরী চট্টগ্রামসহ দেশের পূর্ব, উত্তর এবং দক্ষিণ অঞ্চলকে সংযুক্ত করেছে। এখানে রয়েছে একটি বিমান বন্দর। যদিও এখন বন্ধ। ঈশ্বরদীতে রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রেলওয়ে জাংশন। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ রেইলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের প্রধান কার্যালয় ঈশ্বরদীর পাকশীতে ছিল। বর্তমানে সেটি রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হয়েছে। রেলওয়ের অন্যতম বৃহৎ ওয়ার্কশপ-লোকোসেড ঈশ্বরদীতে অবস্থিত। ঈশ্বরদী দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা জেলসমূহের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হয় ঈশ্বরদীকে কেন্দ্র করে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের দীর্ঘ সংগ্রামে এবং যুদ্ধের নয় মাসে ঈশ্বরদীর রয়েছে গৌরবজ্জোল ভূমিকা। যুদ্ধের শুরুতেই ১৯৭১-এর ২৯ মার্চ মাধপুর গ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সন্মুখ সমরে শহিদ হয়েছিলেন ঈশ্বরদীর রুপপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান রাজুসহ ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। শহিদ মোস্তফাসহ বেশ ককেকজন মুক্তিযোদ্ধা ১১ ডিসেম্বর ছলিমপুর ইউনিয়নের মিরকামারি গ্রামে পাক বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে অনেকগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল ঈশ্বরদীর মাটিতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তাঁদের সহযোগী রাজাকার বাহিনী এবং বিহারী ঘাতকরা ঈশ্বরদীর প্রতিটি এলাকাতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। এই ঘাতকদের হাতে শহীদ হয়েছেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা এবং শান্তিপ্রিয় মুক্তিকামী সাধারণ বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী। জাতীয় মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত ঈশ্বরদীর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের মহিমায় আমরা মহিমান্বিত। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ঈশ্বরদীর একটি দৃষ্টান্তমূলক ঐতিহ্য ছিল। স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা ঈশ্বরদী ললিত কলা একাডেমি এবং তারপর ঈশ্বরদী সাংস্কৃতিক নিকেতন ছিল উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। খেলাধুলার ক্ষেত্রে সারা দেশের মধ্যে ঈশ্বরদী ছিল একটি উজ্জ্বল নাম। আশির দশকে ঈশ্বরদী ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের উদ্যোগে ঈশ্বরদী এস এম হাই স্কুল মাঠে আয়োজিত হতো ফুটবল প্রতযোগিতা। সমগ্র বাংলাদেশ থেকে জেলা পর্যায়ের ক্লাবগুলো এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতো। টিকেট কেটে দর্শকদের সে খেলা উপভোগ করতে হতো। ঈশ্বরদী আলোবাগ ক্লাবের ভলিবল টিম ছিল দেশ সেরা। আশির দশকের কোন এক সময় তৎকালীন ভলিবলের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ছিল রাশিয়া। সেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন রাশিয়ান টিম ঈশ্বরদীতে এসে ঈশ্বরদী আলোবাগ ভলিবল মাঠে আলোবাগ টিমের সঙ্গে ভলি খেলায় অংশ নিয়েছিল। সেসব ঐতিহ্য এখন শুধুই স্মৃতি। ঈশ্বরদীকে নিয়ে উল্লেখ করার মতো অসংখ্য স্থাপনা এবং সম্ভাবনার কথা বলা যেতে পারে। পাশাপাশি অসংখ্য সমস্যাও রয়েছে এই জনপদে। এমন সমৃদ্ধ এবং উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় একটি লোকালয়ে এসব সমস্যা দেখে মনে হয় এ যেন প্রদীপের নিচে অন্ধকার। সকল উপাদান বিদ্যমান থাকার পরও ঈশ্বরদীকে জেলায় রুপান্তর করা যায়নি। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৮৯ সালে স্থানীয় একটি জনসভায় অংশ নিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ঈশ্বরদীকে মহকুমা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু উদ্যোগের অভাবে সেটি সরকারি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হয়নি। তখন ঈশ্বরদী মহকুমা ঘোষিত হলে পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য মহকুমার মত ঈশ্বরদিও জেলায় রূপান্তরিত হতো। ঈশ্বরদীর বিমান বন্দরটি দীর্ঘ দিন থেকে বন্ধ রয়েছে। একটি শক্তিশালী সড়ক এবং রেলওয়ে যোগ অবকাঠামো থাকার পরও ঈশ্বরদীতে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহৎ নদী বন্দর সাঁড়া ঘাটকে রক্ষা করা যায়নি। এই স্থাপনাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বহু বছর আগেই। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে আছে এই জনপদ। এত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সুব্যবস্থা থাকার পরও একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যায়নি এখানে। ঈশ্বরদীতে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী দীর্ঘ দিনের। রেলওয়ের শত শত বিঘা জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে এখানে। যা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট। ঈশ্বরদীর উত্তর-দক্ষিণের সড়কগুলি উন্নত হলেও পূর্ব-পশ্চিমের সড়কগুলোর বেহাল দশা। বিমান বন্দর সড়কের রেল গেট নামক স্থানটি ঈশ্বরদীবাসীর জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দেখা দিয়েছে। অসহনীয় যানজট এবং প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা মানুষের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। অথচ একটি ফ্লাই ওভার অথবা আন্ডারপাস নির্মিত হচ্ছে না এখানে। পুর্ব-পশ্চিমে প্রলম্বিত একমাত্র বিমান বন্দর সড়ক। শহরকে বাইপাস করার জন্য পুর্ব-পশ্চিমে কোন বিকল্প সড়ক নেই। ঈশ্বরদীকে জেলায় রূপান্তরিত করার দাবিকে পুনরায় উত্থাপন করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সঠিক যোগাযোগ স্থাপন করা জরুরি। ঈশ্বরদী বিমান বন্দরকে পুনরায় চালু করা দরকার। ঈশ্বরদী রেলগেটের যানজট সমস্যার সমাধানে ফ্লাইওভার বা আন্ডারপাস তৈরী করা দরকার। আলহাজ মোড়ে ট্র্যাফিক আইল্যান্ড স্থাপন করা দরকার। ঈশ্বরদীতে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এমন অনেক ধরনের কাজ আছে যা করা দরকার। এই কাজগুলো করতে হলে সরকারি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। যদিও এটি জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব, তবুও বিভিন্ন কারণে তা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি জনসম্পৃক্ত সামাজিক সংগঠন। দায়িত্বশীল সামাজিক সংগঠনগুলো সর্বস্তরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে সক্রিয় থাকে। বর্তমানে আমাদের সমাজ বিভাজনের সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে। এই বিভাজন সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এক কাতারে শামিল করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সমাজের সমস্যাগুলো দূর করার জন্য সাধারণ মানুষের ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সংগঠনের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানের এই বহুধাবিভক্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে আমাদের সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমাদের প্রিয় ঈশ্বরদীকে যথাসম্ভব সমস্যামুক্ত করে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, আদর্শ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সকল দল-মত, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, ধর্ম-বর্ণের উর্দ্ধে উঠে ঈশ্বরদী নাগরিক পরিষদনামে একটি অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ঈশ্বরদীর কিছু সচেতন নাগরিক ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। সাধারণ মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষায় সবসময় আমরা সোচ্চার থাকবো। যে কোন নাগরিক সংগঠন প্রশাসন বা সরকারের বিরোধী নয়; বরঞ্চ পরিপূরক হয়ে কাজ করে। সক্রিয় নাগরিক সমাজ দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে অর্থবহ করে তুলতে অপরিহার্য। পৃথিবীর সফল গণতান্ত্রিক দেশসমূহ বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্টগুলোতে রয়েছে বিকশিত নাগরিক সমাজ। নিজ রাষ্ট্রের পাশাপাশি পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতেও তারা আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ যথা আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ। সংবাদপত্রকে বলা হয় চতুর্থ স্তম্ভ। আর নাগরিক সমাজকে বলা যেতে পারে পঞ্চম স্তম্ভ। ‘ঈশ্বরদী নাগরিক পরিষদ’ বর্তমানে কেবলমাত্র ঈশ্বরদীর মত ছোট একটি জনপদের জন্য কাজ করছে। ঈশ্বরদীর পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানটি অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশের জন্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা রাখি। ন্যায্যতা এবং সমস্যামুক্তির মাধ্যমে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা আমাদের অনুপ্রাণিত করছে। ঈশ্বরদীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিক তাঁদের কর্মের প্রয়োজনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন। তাঁরা ঈশ্বরদী থেকে দুরে অবস্থান করলেও ঈশ্বরদীর উন্নয়নে অবদান রাখতে আগ্রহী। তাই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী ঈশ্বরদীর মানুষ এবং ঈশ্বরদীর স্থায়ী বাসিন্দাদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ঈশ্বরদী নাগরিক পরিষদ। সংগঠনটি পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটি রয়েছে। এই কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের তত্ত্বাবধানে ঈশ্বরদী উপজেলা কমিটি এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতির চাহিদার প্রেক্ষিতে পৌরসভা কমিটি, ইউনিয়ন কমিটি এবং পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সকল ওয়ার্ডে কমিটি থাকবে। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সচেতন অংশ যাারা সাধারণ মানুষের স্বার্থে নিবেদিত- প্রাণ, এমন প্রকৃতির সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে এই সংগঠনে একত্রিত করা হবে। ঈশ্বরদী নাগরিক পরিষদের সার্বিক কার্যক্রম একটি লিখিত গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১