বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ৩০ May ২০২৪

কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি


বাংলাদেশে তিনদিন আগে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় রেমাল। কিন্তু সারাদেশেই ক্ষতের চিহ্ন রেখে গেছে। এই ঝড়ের প্রভাবে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এখনো সকল ক্ষতির হিসেব নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে উপকূলীয় এলাকা নয় সারা দেশেই কৃষির ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যানুযায়ী, দেশের ৪৮টি জেলার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমির ফসল ঘূর্ণিঝড় রেমালে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশের বীজতলা ও গ্রষ্মকালীন সবজির।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১৯টি জেলায় প্রায় পৌনে ২ লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে ৪০ হাজার ৩৩৮টি ঘরবাড়ি। আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫২৮টি ঘরবাড়ি।

দুর্যোগসংক্রান্ত দৈনিক প্রতিবেদনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে খুলনা জেলায়। এই জেলায় ২০ হাজার ৭৬২টি ঘরবাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। বাগেরহাটে বিধ্বস্ত হয়েছে ১০ হাজার ঘরবাড়ি। বাকিগুলো বিভিন্ন জেলায়। দুর্যোগসংক্রান্ত দৈনিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এই ঝড়ে দুর্গত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতির মুখে পড়ে উপকূল ও আশপাশের ১৯ জেলা। এগুলো হলো সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, ভোলা, ফেনী, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর ও যশোর। এর মধ্যে মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, চট্টগ্রাম ও পিরোজপুরে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক (সরেজমিন উইং) তাজুল ইসলাম পাটোয়ারি জানান, সারা দেশে গড়ে ৯০ শতাংশ বোরো ধান কাটা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ধান প্রায় কাটা শেষ হয়েছে। এই মুহূর্তে ওই সব এলাকায় তেমন কোনো ফসল নেই। তাই খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি কৃষি ফসলে। প্রধান প্রধান ফসলের বেশির ভাগই হারভেস্ট হয়ে গেছে। তাই ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো আসেনি। তবে, যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ডিএই বলছে, সারাদেশে বর্তমানে ৩৪ হাজার হেক্টর আউশের বীজতলার মধ্যে ১০ হাজার হেক্টর ক্ষতির মুখে পড়েছে। এছাড়া ৪৫ হাজার হেক্টর জমির সবজি, ৩৪৫০০ হেক্টর জমির পাট, ৪২৪৪ হেক্টর জমির তিল, ৬৯৩২ হেক্টর জমির কলা, ৪৬৫০ হেক্টর জমির পানসহ কাঁচা মরিচ ও অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো টাকার অংকে হিসেব করতে পারেনি ডিএই।

এদিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা গেছে, সেক্টরটিতে ৭০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাছের খামার। ৭১ হাজার ২৩১টি মাছের পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। দেশের উপকূলীয় ১৩টি জেলায় মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ৭০০ কোটি টাকার বেশি।

বরিশাল প্রতিনিধি বলেন, অতীতের রেকর্ড ভেঙে টানা ১৭ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাণ্ডব চালানো ঘূর্ণিঝড় রেমাল বরিশাল বিভাগের সবগুলো উপজেলা লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে। প্রাণহানি, বাঁধ, ফসল, মৎস্য সম্পদ, প্রাণিসম্পদ, আবাসস্থল, সড়কপথ, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, সুপেয় পানি এমন কোনো খাত নেই যেখানে রেমালের আঘাতের চিহ্ন নেই। সরকারি দপ্তরগুলোর হিসেবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎস্য ও কৃষি খাত। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারি প্রণোদনা, ঋণ প্রকল্প গ্রহণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশালের হিসেব অনুসারে প্রায় ৫০৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাক-সবজিতে, ২৫৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত পানের বরজ নষ্ট হয়েছে ১১৭ কোটি ২১ লাখ টাকার।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় উপ-পরিচালক কৃষিবিদ শওকত ওসমান বলেন, বিভাগে ১৮ লাখ ৪৮১ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১৮ হাজার ২০৯ হেক্টর ফসলি জমির উৎপাদিত ২৫ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়েছে। আউশের বীতলা, আউশ ক্ষেত, চীনা বাদাম, মরিচ, মুগ ডাল, তিল, ফেলন, শাক-সবজি, পাট, পান, কলা, পেঁপে ও ফল ফসলের ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৬৭ মেট্রিক টন নষ্ট হয়েছে যার মূল্য ৫০৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকারও বেশি।

খুলনায় ১৭ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি

ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে খুলনা উপকূলের সাড়ে ৪ লাখ মানুষ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে লবণাক্ত পানি। ভেসে গেছে পুকুর-ঘের, বিধ্বস্ত হয়েছে বাড়িঘর। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধান, পাট ও সবজিসহ ১৭ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমির ফসল। খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে ফসলের জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে এখনও ক্ষতির আর্থিক মূল্য পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি। শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের জমির হিসাব করা হয়েছে। খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঝড়ে খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭ হাজার ৭৯৬ দশমিক ৫০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে। এরমধ্যে ৫৪ দশমিক ৫০ হেক্টর জমির আউশ ধানের বীজতলা, ১ হাজার ৭৫২ দশমিক ৫০ হেক্টর জমির আউশের আবাদ, ১ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমির পাট, ৫ হাজার ৭৫৫ হেক্টর জমির সবজি, ২১ হেক্টর জমির টমেটো, ৪৮৫ হেক্টর জমির তিল, ২৭০ হেক্টর জমির মুগ, ১৭৫ হেক্টর জমির মরিচ, ৩৩ হেক্টর জমির আদা, ২০৩ হেক্টর জমির হলুদ, ৩০ হেক্টর জমির চিনা বাদাম, ১ দশমিক ৫০ হেক্টর জমির ভুট্টা, ১ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমির আম, ৭৭ হেক্টর জমির লিচু, ১১৮ হেক্টর জমির তরমুজ, ৩১০ হেক্টর জমির পেঁপে, ৫৪৫ হেক্টর জমির কলা, ৮৭৭ হেক্টরের পান, ৭২ হেক্টরের আখ, ৩ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমির বোনা আমন ও ১১৫ হেক্টর জমির অন্যান্য ফসল আক্রান্ত হয়েছে।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে দেড় কোটি টাকার ক্ষতি

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে আউশের বীজতলা, মুগ, মরিচ, চিনাবাদাম ও বিভিন্ন প্রকারের সবজি ও নানা প্রজাতির বাগানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, মির্জাগঞ্জে কৃষি খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি ৫৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও জোয়ারের পানি ও বৃষ্টির কারণে ফসল ডুবে যাওয়া ও নুয়ে পড়ায় দুশ্চিন্তায় কৃষকরা। পাশাপাশি আউশের বীজতলা ও বিভিন্ন প্রকারের সবজি ক্ষেতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

উপজেলার পূর্ব সুবিদখালীর গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় পাঁচ শতক জমির শসা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। কাকড়াবুনিয়ার গ্রামের কৃষক রবি মিস্ত্রির ১০ শতক জমির আউশের বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এবারে যে জমিতে আউশধান আবাদ করব সে সুযোগও নেই। আর বীজকরার মতো সময়ও নেই। বীজ পাওয়া গেলে বেমি দামে কিনে রোপণ করতে হবে।’

ঘূর্ণিঝড়ে কৃষি খাতের ক্ষতি সম্পর্কে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মো. নাহিদ হাসান জানান, ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে উপজেলার কৃষিতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার একটি প্রতিবেদন তৈরি করে জেলায় পাঠানো হয়েছে। উপজেলায় মুগডাল চাষ করা পাঁচ হাজার ২০০ হেক্টর জমির মধ্যে ক্ষতি হয়েছে ৮৫ হেক্টর, মরিচ ৩৮০ হেক্টর জমির মধ্যে ক্ষতি হয়েছে ১২ হেক্টর, চিনাবাদাম ১২০ হেক্টরের মধ্যে ক্ষতি হয়েছে ছয় হেক্টর, আউশধানের বীজতলা ৬৩০ হেক্টরের মধ্যে ক্ষতি হয়েছে ১৮০ হেক্টর, পানের বরজ পাঁচ হেক্টর সম্পূর্ণ ক্ষতি ও সবজি ৩২০ হেক্টর জমির ক্ষতি হয়েছে ১৯২ হেক্টর জমির ফসল। উপজেলায় মোট কৃষি খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি ৫৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১