বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ৩১ May ২০২৪

বাজেট : ২০২৪-২৫ অর্থবছর

ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ


মো. বাবুল আক্তার:

নতুন অর্থবছরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দেশ। এমন এক পরিস্থিতিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হতে যাচ্ছে, যখন সারা বিশ্বই এক ধরনের মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির ধাক্কা আমাদের দেশেও আঘাত করেছে। যার কারণে জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বড় কষ্টে আছে। এরমধ্যে নতুন বাজেটে চিকিৎসা সরাঞ্জম আমদানিসহ অনেক পণ্য ও সেবার ওপর শুল্কহার বাড়নোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বাজেট বাস্তবায়ন হলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়বে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এবারের বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাতে সঠিক দিশা ঠিক করতে না পারলে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অর্থনীতিকে পথ দেখাতে হলে আগামী বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় বড় চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে। বাজেটের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ যেন না বাড়ে, রিজার্ভ যাতে আরও হারিয়ে না যায়Ñ সেদিকেও বাড়তি নজর দেওয়ার তাগিদ অর্থনীতিবিদদের।

আগামী ৬ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী। এখন পুরোদমে চলছে বাজেট তৈরির কাজ। আগামী বাজেটের আকার হতে পারে ৮ লাখ কোটি টাকার আশপাশে। আগামী বাজেটের আকার জিডিপির ১৪ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে রাখা হচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতির পরিধি অনুযায়ী আকার আরও বড় হওয়া দরকার। সেটি করতে গেলে ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে যাবে। আর ওই ঘাটতি মেটাতে আরও ঋণ করতে হবে। নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা তৈরি করার কাজ শুরু হয়েছে। প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, পঞ্চবার্ষিকীসহ অন্যান্য পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ হিসেবে বাড়ানো হয়েছে সুদহার।

এদিকে আগামী বাজেটে, চাল, গম, ভুট্টা, সরিষাবীজ, পরিশোধিত সয়াবিন, পাম অয়েল, সানফ্লাওয়ারবীজ, তুলাবীজ, বিভিন্ন শাক-সবজির বীজ, ক্রুড অয়েল, সার, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিটুমিন, কয়লা, জিপসাম, ভিটামিন, ইনসুলিন, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের অত্যাবশ্যক ওষুধ এবং ভ্যাকসিন ও ওষুধের কাঁচামাল, বিভিন্ন ধরনের দরকারী রাসায়নিক ইত্যাদির ওপর বসতে যাচ্ছে বাড়তি শুল্ক। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে মোবাইল ফোনে কথা বলতে গেলে বা ইন্টারনেট ব্যবহারে গুনতে হবে বাড়তি অর্থ।

অন্যদিকে, রেফারেল হাসপাতালোতে ব্যবহৃত ২০০টিরও বেশি মেডিকেল যন্ত্র ও সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার, যা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জম আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে। এসব চিকিৎসাসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি অবশ্য বর্তমানে অন্যান্য শুল্ক ও ভ্যাট থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রদানকারী রেফারেল হাসপাতালগুলো বর্তমানে এসব চিকিৎসাসামগ্রী কম শুল্কে আমদানি করলেও তাদের সেবার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ চার্জ করে থাকে। এসব হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিতে নিয়োজিত থাকেন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা।

যদিও খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পদক্ষেপ গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য চিকিৎসাসেবা ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেবে; বিশেষ করে যারা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরিবর্তে দেশেই শীর্ষ স্থানীয় হাসপাতালগুলো থেকে সেবা নিতে পছন্দ করেন। এ পদক্ষেপ দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো সম্প্রসারণে বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বছর ঘুরে প্রতিবার বাজেটের আকার বাড়লেও বাস্তবায়ন ঘাটতির পুরনো চিত্রই থাকছে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের আগে সরকারের দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে তারা নানা আশঙ্কার কথা বলছেন। আসছে বাজেটেও বড় আকারের বাস্তবায়ন ঘাটতি থেকে যাবে। হুট করে একবারেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের সুযোগ কম।

অর্থনীতির বিশ্লেষক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, অর্থ তো নাই। মূল সমস্যা হচ্ছে, অর্থনীতির ওপর আমাদের আস্থা চলে গেছে। সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা কমে গেছে। সরকার যখন নতুন অর্থবছরের আয়-ব্যয়ে হিসাব-নিকাশের ঘষামাজা করছে তখন দেশের অর্থনীতি যে ‘খাদে পড়ার ফাঁদে রয়েছে’ সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন এ অর্থনীতিবিদ। তার পরামর্শ, আমাদের রিজার্ভ বাড়াতে হবে। আমি ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে অর্থনীতির ওপর আস্থা থাকবে না। আমরা এদিক-সেদিক করলেই খাদে পড়ে যেতে পারি। কারণ আমাদের রিজার্ভ নেই। ২৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তাই আমাদের সতর্কভাবে চলতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন গ্রস হিসাবে ২৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আগে যা ছিল ৩১ বিলিয়ন ডলারের উপরে। ডলার সংকটের কারণে রিজার্ভ কমে যাওয়ার পাশাপাশি চাপ বেড়েছে মূল্যস্ফীতির। গত বছরের মার্চ থেকে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরে যা ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার।

আহসান এইচ মনসুরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বলেন, অর্থনীতির মূল সমস্যা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। সেটির জন্য সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সরকারের ডমেস্টিক ভলিউমটা কমাতে হবে। আমাদের প্রবৃদ্ধি সহজে হবে না। কেননা আমাদের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা অনেক খারাপ। সেটা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে বাজেটের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ যেন না বাড়ে, সেটিকেই মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও। ঢাকায় বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক এই লিড ইকনোমিস্টের পরামর্শ, যেখানে বিদেশি অর্থায়ন নেই, কিন্তু আমদানি থাকেÑ তাহলে তো বাজার থেকে ডলার কিনতে হবে। ওই ধরনের প্রকল্পগুলোকে এড়িয়ে চলতে হবে। যেন চাপ তৈরি না হয়। যাতে ডলারের চাহিদাটা বাজেটের কারণে বেড়ে না যায়। বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি থাকলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়বে। একটা হল, ঘাটতিকে নিয়ন্ত্রণ রাখা। পরোক্ষ কর বৃদ্ধি করা যাবে না। রাজস্ব আয়ের জন্য লিকেজটা কমাতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের প্রসঙ্গ টেনে জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবাহ অনেক কমে গেছে। সুদের হারও এখন বেশি। সেক্ষেত্রে যে টাকা আছে, সরকার যদি মোটা অঙ্ক নিয়ে নেয়, সেটার একটি নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি খাতের ঋণের প্রবাহের ওপর পড়বে। এর বিকল্প হচ্ছে, সরকার যদি টাকা ব্যাংক থেকে না নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেয়, টাকা ছাপিয়ে অর্থায়ন করেÑ সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির ওপর সবার চাপ পড়বে। সে জন্য লক্ষ্য আরও কমিয়ে আনা, ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হতে হবে, পাইপলাইনে অনেক বিদেশি অর্থায়ন আছে, সেখানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। পাইপলাইনে যে অর্থগুলো আছে, সেটা ছাড়ের মাধ্যমে বাস্তবায়নের গতি যদি বাড়ানো হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ছাড়া সরকার তার বিনিয়োগ ব্যয় না কমিয়েও বাজেট করতে পারে।

বৈদেশিক ঋণ পরিকল্পনায় জোর দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, যেগুলো দ্বিপাক্ষিক ঋণ, যেমন চীন, ভারত, রাশিয়াÑ যেখানে সুদের পরিমাণ বেশি সে ঋণগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া। আমরা বৈদেশিক বিনিয়োগ একেবারে বন্ধ করতে পারব না। কারণ সেটি করলে সরকার বিনিয়োগ করতে পারবে না। সে জন্য তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদে এবং সস্তায় যে ঋণগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেইগুলোকে ব্যবহার করতে হবে। যেমনÑ বিশ্বব্যাংক থেকে যে ঋণ নেওয়া হয়, ওগুলোর বাস্তবায়ন যদি বাড়ানো যায়, তাহলে পেমেন্টের চাপটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যে ঋণগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলো তো পরিশোধ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, এবারের বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি হচ্ছে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান। এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় যে বাজেটটি দিতে হচ্ছে তাতে মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় নেওয়ার বড় ধরনের লক্ষ্য থাকা দরকার। এছাড়া রিজার্ভের ঘাটতির জায়গাটিতেও যেন ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা দরকার। এর সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরির চ্যালেঞ্জও মনে করিয়ে দিচ্ছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের গবেষণা পরিচালক সায়মা হক বিদিশা।

তিনি বলেন, কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে যেহেতু সাধারণ মানুষ, সে কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে এখন সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূসক, আমদানি শুল্কে কিছু কাটছাঁট করা যেতে পারে। এর একটি চাপ পড়বে রাজস্ব আহরণে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যক্তি খাতে আয়করের ক্ষেত্রে অনেক আনট্যাপড অপারচুনিটি রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব।

চলতি অর্থবছরে সরকারের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৭ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা করার খবর এসেছে। এর বিপরীতে সরকার সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার কম ব্যয় করতে পারবে বলে প্রাক্কলন সংশ্লিষ্টদের। এর মধ্যেই নতুন অর্থবছরের জন্য ৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করছে সরকার, যেটির বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এমন বাজেট দেওয়ায় প্রতিবছরই বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সবসময় আমরা একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দিয়ে শুরু করি। সেটা কখনই অর্জন হয় না। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে নাকি হবে না সেটি নির্ভর করছে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে। আগামী বাজেট বাস্তবায়নে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা করা খবরে এসেছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ কোটি টাকা, প্রথম ১০ মাসে যার ৭০ শতাংশ আদায় করা গেছে।

আহসান এইচ মনসুর বলছেন, রাজস্ব আহরণ অর্জন করা সম্ভব হবে না। টার্গেট যেটা ফিক্সড করেছে, সেটা রিভাইস বাজেটের সঙ্গে ঠিক আছে। কিন্তু রিভাইস বাজেটই তো অর্জন করা সম্ভব হবে না। এটি বরাবরই থাকে এবং সমস্যা তৈরি করে। বাজেট বাস্তবায়নকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, বাস্তবায়নের জন্য আমাদের রাজস্ব বাড়াতে হবে।

বাজেট বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতা বাড়ছে না। লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না এবং আগামী বছরও হবে না। যতদিন রাজস্বে ঘাটতি থেকে যাবে, এর সমাধান করা যাবে না। সে জন্য রাজস্বের সঙ্গে মিল রেখে ব্যয় কমাতে হবে। তাহলে মোটামুটি ঠিক থাকবে।

আইএমএফের সাবেক এই কর্মকর্তা মনে করছেন, বাজেটের মূল সমস্যা হচ্ছে, বাজেটের আকার আরও ছোট হতে পারতো। অন্য জায়গায় আরও ব্যয় করতে পারতাম, সেই জায়গায় আমরা ব্যয় করতে পারছি না। আমরা অপ্রয়োজনীয় অনেক খাতে ব্যয় করে থাকি। সেই জায়গাটি বন্ধ করতে হবে। মন্ত্রী-সচিব নিয়োগ করতে হবে, এতগুলো মন্ত্রণালয়ের তো দরকার নেই।

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, বাজেট বাস্তবায়নে ঘাটতি কমাতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য কর ছাড় ও ‘লিকেজ’ কমাতে হবে। করদাতা কর দিচ্ছে, কিন্তু সরকারি কোষাগারে যাচ্ছে না। মাঝপথে তৃতীয় একটি পক্ষ সেটি পেয়ে যায়। সে জন্য আয়করের ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তাদের কাছে না গিয়ে অনলাইনে একটি ফরম পূরণ করে সেখান থেকেই হিসাব-নিকাশ করে আয়কর রিটার্ন দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। তখন স্বনির্ধারিত হিসাবটাকেই কর হিসেবে হিসাব করা হবে। এর ফলে কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে নেগোশিয়েট করে কর অ্যামাউন্ট নির্ধারণের সুযোগটা আর থাকবে না। ওইখানে লিকেজটা কমে যাবে। সেখানে আবার কর্মকর্তাদের আয়ের ওপরে একটা আঘাত আসবে। সেটা কতটা কার্যকর হবে, সেটাও দেখার বিষয়। অনলাইনে এই প্রক্রিয়াটা ঠিকমত না হলে আবার শেষ পর্যন্ত কর কর্মকর্তাদের কাছেই যেতে হবে। সেক্ষেত্রে লিকেজটা কমবে না। বাজেটে ঘাটতি থাকার জন্য বাস্তবায়নের সক্ষমতা না বাড়াকে দায় দিচ্ছেন তিনি।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতার কারণে বাজেট বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আইএমইডি থেকে আমরা প্রতিবছরই শুনতে পাই, প্রকল্প কেনাকাটায় দীর্ঘসূত্রিতা আছে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অস্থিতিশীলতা আছে, পরিচালক বদলি হয়ে যায়, এগুলো তো চিহ্নিত সমস্যা, পুরনো সমস্যা। এগুলো সমাধান তো হয় না। যেগুলো চিহ্নিত সমস্যা, সরকারও জানে, পরিচালক যখন বদলি হয়ে যান, তখন প্রকল্প সেখানে থেমে যায়। এ ধরনের অনেক সমস্যা আছে। এখানে যদি আমরা কোনো পরিরবর্তন আনতে না পারি, তাহলে কথা বলে মুখে ফ্যানা তুলে কোনো লাভ হবে না। বাজেট বাস্তবায়নে ঘাটতি যে নেতিবাচক ভবিষ্যৎ ডেকে আনছে, তাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তিনি।

জাহিদ হোসেন বলেন, সংকটের জায়গা বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনৈতিক যে চাপগুলো রয়েছে, সেগুলো। একটি হলো মূল্যস্ফীতি, কাঠামোগত সমস্যা যেমনÑ কর্মসংস্থানের সমস্যা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য যেসব খাতে আমরা বরাদ্দও কম দেই। আবার যে বরাদ্দ দেই, সেটা ব্যবহারও করতে পারি না, সেকারণে এ খাতগুলোতে বরাদ্দও বাড়ানো হয় না। সেটা তো সমাধান না। কেন এ খাতগুলোতে বরাদ্দ ব্যবহার করতে পারছে না, স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা আরও প্রকট। বাস্তবায়নের পথের বাধা দূর করা ছাড়া বিকল্প কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না।

তিনি বলেন, আমরা যদি এসব খাতে ঠিকমত ব্যয় না করি, জনবলকে যদি তৈরি করতে না পারি, ভবিষ্যতে তো আরও অনেক চ্যালেঞ্জ আছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে আমরা যদি আমাদের জনবলকে তৈরি করতে না পারি, তাহলে বিপদ আমাদের আরও বেড়ে যাবে।

কাজেই মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে সরকারের পরিকল্পনা অনেক শক্তিশালী হতে হবে। সেটা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয়ের গুণগত মান বৃদ্ধি ছাড়া পথ নেই। প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠী উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে একটি জীবিকা সংকটে আছে। মজুরি বাড়ছে না, কিন্তু পণ্যের দাম বাড়ছে। সেক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা খাতের সহায়তার মাধ্যমে সরকারের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। আর্থিক খাতে কয়েকটি বড় ধরনের দুর্দশার কথা তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদের প্রত্যাশা, বাজেটে সংস্কার নীতি হিসেবে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১