বাংলাদেশের খবর

আপডেট : ১২ June ২০২৪

বদলে গেছে অর্ধকোটি মানুষের জীবন


রেজাউল করিম হীরা:

শারীরিক প্রতিবন্ধী হোসনে আরা। প্রতিবন্ধী স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। অনেক সময় না খেয়ে দিন পার করতে হয়েছে তার। কেউ সাহায্য করেনি। দু বেলা দু মুঠো খাবারের জন্য মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করতে হয়েছে। মানুষের অনেক কটুকথা শুনতে হয়েছে তাকে।

কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার পূর্ব দরগাপাড়া আশ্রয়ণকেন্দ্রে একটি ঘর পেয়েছেন এই নারী। নতুন মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে আবেগাপ্লুত হোসনে আরা প্রধানমন্ত্রীকে শোনান নিজের জীবনযুদ্ধের গল্প।

আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় পঞ্চম পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপে গতকাল মঙ্গলবার ১৮ হাজার ৫৬৬টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর হস্তান্তর করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ঈদের উপহার হিসেবে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের মাঝে ঘর হস্তান্তর করেন।একইসঙ্গে এই জেলা-উপজেলাগুলোকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষণা করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে হোসনে আরা আরও বলেন, ‘আপনার কাছ থেকে একটি প্রতিবন্ধী কার্ড পেয়েছি। আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। মনে হয়েছিল যেন মরে যাই, কিন্তু মেয়েদের দিকে তাকিয়ে মরতে পারিনি। আপনার কাছ থেকে একটি ঘর পেয়েছি, বিদ্যুৎ পেয়েছি, পানি পেয়েছি। এর মাধ্যমে মেয়েদের নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস ও শক্তি পেয়েছি। আমরা আপনার কাছে ঋণী।

রবিউল আলম নামে আশ্রয়ণের আরেকজন সুবিধাভোগী মৎস্যজীবী বলেন, ‘সাগরে নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যাই। কখনও মাছ পাই, কখনও পাই না। আমার ছেলেমেয়েদের না খেয়ে থাকতে হতো। যখন ঝড়-বৃষ্টি হয় আমার ছেলেমেয়ের অনেক কষ্ট হতো, কান্না করতাম। আমার কোনও ঘর ছিল না।’

প্রধানমন্ত্রীকে তিনি বলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখতাম আমার বাড়ি হবে, ঘর হবে। এখন আমার বাড়ি হয়েছে আপনার জন্য। জায়গা পেয়েছি, ঘর পেয়েছি, বিদ্যুৎ পেয়েছি। এখন আমার ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করতে পারে। এখন আমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারি। আমার জেলে কার্ড আছে, সেই কার্ডের মাধ্যমে চাল পাই, খাবার পাই। আমার দুইটা মেয়ে, চার ছেলে।’

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার মহিষামুড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে ঝালমুড়ি বিক্রেতা বাবু মিয়া প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি ঘর দিয়েছেন, আমরা অনেক সুখে আছি। আমার যখন ঘর ছিল না, তখন অনেক কষ্টে থেকেছি। হোটেলে কাজ-কাম করতাম। বাড়িতে থাকার জায়গা ছিল না। মানুষের বাড়িতে থেকেছি। আমার মা বৃদ্ধ ছিল। আমরা মা ও ছেলে মিলে হোটেলে কাজ করতাম। কিন্তু থাকার জায়গা ছিল না।’

তিনি বলেন, ‘‘সারা দিন কাজ করে, সারা রাত জেগে আবারও সকালে হোটেলে চলে যেতাম। ছেলেমেয়ে নিয়ে মানুষের বাড়িতে থাকতাম। ঝড়-বৃষ্টিতে মাথা গোঁজার জায়গা ছিল না। আমার মেয়ে বলতো— ‘বাবা, আমাদের কি কখনও বাড়ি হবে না?’ আমি বলতাম, ধৈর্য ধরো মা, আমাদেরও হবে একদিন। কিন্তু আমি অসুস্থ মানুষ, কীভাবে হবে কিছুই বুঝতাম না। প্রধানমন্ত্রী আপনার চেষ্টায় আজকে ঘর পেয়েছি। আজকে আমি খুব ভালো আছি।’’

ভোলার চরফ্যাশনের আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুবিধাভোগী বিধবা নারী বিবি আয়েশা বলেন, ‘আমার বাড়িঘর নদী ভাইঙা ফেলেছে। ২৪ বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছে লিভার ক্যানসারে। আমার একটা ভাঙা ঘর ছিল, আমার কোনও সামর্থ্য ছিল না একটা টিন ঘরে লাগানোর। আপনি ঘর দিয়েছেন, বিদ্যুৎ দিছেন, স্কুল দিছেন, ঘাটলা দিয়েছেন। আমি অনেক খুশি হয়েছি। আমি কখনও ভাবি নাই একটা ঘর পাবো। আমি নামাজ পড়ে দোয়া করি যেন আপনি ভালো থাকেন।’

হোসনে আরা, বিবি আয়েশা, রবিউল ও বাবুল মিয়ার মতো সারা দেশের প্রায় অর্ধকোটি ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। একসময়ের ভূমিহীন ও গৃহহীন এসব পরিবারকে এখন আর অন্যের ঘরে বা ভাসমান অবস্থায় থাকতে হয় না। মাথা গোঁজার নিশ্চিত আপন স্থায়ী ঠিকানা পেয়ে তারা খুশি। সরকারের দেওয়া এই সুবিধা পেয়ে তাদের চোখে-মুখে এখন স্বস্তির হাসি। সামাজিক মর্যাদা পেয়ে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তারা।

কোরবানির ঈদের আগে গতকাল লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা, কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলা ও ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার সাড়ে ১৮ হাজার ৫৬৬ পরিবার পেলো কাছে জমির মালিকানা দলিলসহ নতুন ঘর।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা যেমন জনগণের সেবক হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন, আমিও তেমনি জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তুলেছি। বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতেই হবে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের মাধ্যমে সবার ভাগ্য বদলেছে। ঘূর্ণিঝড় রিমালে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তাদের চিন্তার কিছু নেই। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সরকার আছে। যাদের ঘর নষ্ট হয়েছে তাদের ঘর করে দেবে সরকার।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঘর আপনার, যত্ন নিতে হবে। বিদ্যুৎ, পানির ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাথে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদেরও ঘরে করে দেওয়া হবে। মানুষের জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে।’

এসময় সুবিধাভোগীরা প্রধানমন্ত্রীকে তাদের সুখ দু:খের গল্প শোনান। তারা জানান, একটি ঘর কীভাবে বদলে দিয়েছে তাদের জীবন। দৈনন্দিন জীবনমানে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসার বর্ণনাও দিলেন তারা।

দেশের পিছিয়ে পড়া ছিন্নমূল মানুষকে পুনর্বাসন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলধারায় আনার লক্ষ্যে সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের গড়ে তোলা হচ্ছে দক্ষ জনশক্তিতে। দেওয়া হচ্ছে ঋণসহায়তা। অনেকেই এখন স্বনির্ভর।

আশ্রয় পাওয়া দরিদ্র পরিবারগুলো নিজস্ব জমিতে কৃষিকাজ, শাকসবজির ফলন, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন এবং দোকানপাট করে নিজেদের জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা আনছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর মাধ্যমে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ জীবনের নিশ্চয়তাও পাচ্ছেন।

এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যার দৃষ্টি থেকে বাদ পড়েনি ভিক্ষুক, খেটে খাওয়া দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানের চালকসহ সাধারণ শ্রমজীবী, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারী, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী, কর্মহীন ও অসুস্থ এবং নদীভাঙনে সব হারানো আর জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষগুলোও।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই আশ্রয়ণ প্রকল্পটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে শেখ হাসিনা মডেল’ হিসেবে পরিচিত। জমি ও ঘর নেই এমন দরিদ্র পরিবারগুলোকে সেমিপাকা একক গৃহের পাশাপাশি দুই শতাংশ জমির মালিকানার দলিলপত্র এবং জমি আছে, কিন্তু জরাজীর্ণ বাড়ি-এমন অনেক পরিবারকে সরকারি খরচে ঘর তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

প্রকল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা এবং খাবার পানির জন্য গভীর ও অগভীর নলকূপ ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, অভ্যন্তরীণ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ এবং পুকুর খনন ও বৃক্ষরোপণ করে উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

কয়েকটি প্রকল্পে মসজিদ-মন্দির ও কবরস্থান নির্মাণ ছাড়াও সুবিধাভোগীদের কৃষিকাজ, মৎস্যচাষ, গবাদি পশু পালন, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প, সেলাইসহ আত্মকর্মসংস্থানের নানা প্রশিক্ষণ এবং সমবায় সমিতির মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা হচ্ছে।

যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন কলকারখানা কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাকরি, কাউকে যানবাহন কিনে দিয়ে অথবা কাউকে ছোট দোকান দিয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের পঞ্চম পর্বের দ্বিতীয় ধাপে ১৮ হাজার ৫৬৬টি গৃহ ও ভূমিহীন পরিবারকে বাড়ি হস্তান্তরের পাশাপাশি ২৬ জেলার সব উপজেলাসহ আরও ৭০টি উপজেলাকে ভূমি ও গৃহহীন মানুষ মুক্ত ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে লালমনিরহাটের এক হাজার ২৮২টি, কক্সবাজারে ২৬১টি ও ভোলা জেলায় এক হাজার ২৩৪টি বাড়ি হস্তান্তর করেন। নতুন ভূমি ও গৃহহীন মুক্ত জেলা ও উপজেলা নিয়ে সারাদেশে জেলার মোট সংখ্যা দাঁড়ালো ৫৮টি এবং উপজেলা ৪৬৪টি।

নতুন করে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত জেলাগুলো হলো- ঢাকা, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, নেত্রকোনা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, নড়াইল, বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ৬৩ হাজার ৯৯৯টি, দ্বিতীয় ধাপে ৫৩ হাজার ৩৩০টি, তৃতীয় ধাপে ৫৯ হাজার ১৩৩টি ও চতুর্থ ধাপে ৩৯ হাজার ৩৬৫টি বাড়ি বিতরণ করেন।

প্রকল্পের আওতায় ভূমি ও গৃহহীন প্রতিটি পরিবারকে দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ জমির মালিকানা দিয়ে একটি আধা-পাকা বাড়ি দেয়া হচ্ছে, যা স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই হবে। প্রতিটি বাড়িতে দুটি রুম, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট ও বারান্দা রয়েছে।

১৯৯৭ সাল থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ৫ লাখ ৮২ হাজার ৫৩টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। আশ্রয়ণ ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়/সংস্থাসহ গৃহ নির্মাণ করে ১৯৯৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পুনর্বাসন করা হয়েছে ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৯০৪টি পরিবারকে। পাঁচজন করে এক পরিবার হিসেবে পুনর্বাসিত জনসংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৪৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫২০।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে মোট পুনর্বাসিত জনসংখ্যা ২৯ লাখ ১০ হাজার ২৬৫। কেবল মুজিববর্ষের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে পুনর্বাসিত হয়েছেন ১৩ লাখ ৩০ হাজার ৬০ জন ছিন্নমূল মানুষ।


বাংলাদেশের খবর

Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.

বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com

অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com

ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১