আপডেট : ২৫ June ২০২৪
এম এ বাবর: টানা চতুর্থ দফার সরকারে আওয়ামী লীগ অনেকটা স্বস্তিতেই ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই রাজনীতির বাইরে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মো. মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ক্ষমতাসীনদের সেই স্বস্তি কিছুটা উদ্বেগে রূপ নিয়েছে। এদিকে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর আজিজ আহমেদ ছাড়া অন্য সবাই পরিবারসহ দেশ ত্যাগ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, রক্ষকরা যখন ভক্ষকের ভূমিকায় তখন আদর্শ রাষ্ট্র গড়ার শেষ ভরসাটা আর থাকে না। তবে এসব ব্যক্তির প্রত্যেকের কাছ থেকে সরকার সুবিধা নিয়েছে বলেই তারা এমন করে দুর্নীতি করার সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশে রক্ষক প্রায়ই ভক্ষক হয়ে থাকে। এর হাজারো উদাহরণ রয়েছে। বাংলা প্রবাদবাক্যে এই বাগধারাটি সহজে প্রবেশ করেনি। হয়তো বা এর রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ভূমি, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌমত্ব ছাড়া কখনো রাষ্ট্র গঠন হতে পারে না। সরকার জনগণের মুখপাত্র। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করতে প্রধানত রাজস্ব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর নির্ভর করে। সম্প্রতি এই দুই বিভাগের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে সাবেক সেনা প্রধান ও পুলিশের দুই কর্মকর্তার দুর্নীতির বিষয়ে এড়িয়ে যেতে পারে না আওয়ামী লীগ সরকার। কারণ, তারা তিনজনই সরকারের বিশেষ ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তা ছাড়া দুটি বাহিনীর শীর্ষ পদে থাকার সময় তাদের বিরুদ্ধেই ক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্নীতি করার অভিযোগ উঠেছিল। আর রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমান এত উপর পর্যন্ত এসেছেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও তাকে কয়েকবার ক্লিন সার্টিফিকেট দিয়েছে দুদক। গত ২১ মে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওই দেশটি। গণতন্ত্রের অবনতি ও দুর্নীতিতে জড়িত থাকার কারণ দেখিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, আজিজ আহমেদের তৎপরতার কারণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের ওপর থেকে জনগণ আস্থা হারিয়েছে। তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। দাবি, ব্যক্তিস্বার্থের বিনিময়ে সরকারি নিয়োগের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি। সামরিক বাহিনীর ঠিকাদারি অবৈধভাবে পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করেছেন আজিজ আহমেদ। তাছাড়া, তার ভাইয়ের অপরাধ সত্ত্বেও তাকে বাঁচাতে দুর্নীতির আশ্রয় নেন বলে দাবি করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগ আসার পর আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধানে একটি টিম গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্ত টিম এখনো কাজ করছে। এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেছেন, আজিজ আহমেদের দুই ভাইয়ের ‘মিথ্যা তথ্যে ই-পাসপোর্ট ও এনআইডি জালিয়াতি’র অভিযোগে তার (আজিজ) কোনো দোষ নেই। তবে অভিযোগ দুটি খতিয়ে দেখতে নির্বাচন কমিশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা মতিউর রহমান তিনজন প্রভাবশালীর প্রশ্রয়ে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। অবৈধ উপায়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠার পর, তাকে রোববার রাজস্ব বিভাগ থেকে ওএসডি করা হয়েছে। পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তার দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিউরের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান। তিনি আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২০২৩ সালে নির্বাচিত হন। মতিউরকে প্রশ্রয় দেওয়া তিন প্রভাবশালীর এক জন ক্ষমতাধর সচিব। এক জন প্রশাসন ক্যাডারের অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা। আরেক জন বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম শীর্ষ পদে আছেন। তার বদৌলতেই মতিউর সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হন। অন্য প্রভাবশালী হলেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা। যিনি শিক্ষকতা থেকে এখানে এসেছেন। তার কাছ থেকেই বিশেষ সুবিধা পেয়ে মতিউর প্লেসমেন্ট শেয়ারের কারসাজি করে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমিশনার (শুল্ক ও আবগারি) এবং ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট ড. মতিউর রহমানের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত রবিবার দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। একই সঙ্গে তার দুর্নীতি অনুসন্ধানে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিশনের উপপরিচালক আনোয়ার হোসেনকে অনুসন্ধান দলের প্রধান করা হয়। এছাড়া দলের অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান ও উপ-সহকারী পরিচালক সাবিকুন্নাহার। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০০৪, ২০০৮, ২০১৩ ও ২০২১ সালেও মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি নিয়ে চার বার অনুসন্ধান করা হয়। তবে এই চার দফাই দুদক অজ্ঞাত কারণে এনবিআরের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো মতিউরের বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান শুরু করল। ওয়ান ইলেভেনের সময় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, মতিউর রহমান একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ। তিনি সবাইকে ম্যানেজ করতে পারেন। আমি (তিনি) ঘুষখোর এ কর্মকর্তাকে চট্টগ্রাম থেকে বদলি করেছিলাম রাজশাহীতে। ওই সময় এনবিআরের চার জন মেম্বার মতিউরকে বদলি না করতে অনুরোধ করেন। তখন ওই চার সদস্য বলেন, স্যার, সে তো বদলি হবে না। আপনাকে সে বদলি করে ফেলবে। তখন বদিউর রহমান বলেন, আমি বদলি করছি, করছিই। তিনি জানান, তারপর একের পর এক শীর্ষ পর্যায় থেকে তদ্বির আসা শুরু হলো। অন্য সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তার বদলি স্থগিত রাখার চেষ্টা করেন। বদলি ঠেকাতে দুই জন পাওয়ারফুল সচিবও কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ফখরুদ্দিন আহমেদ ও তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উদ্দিন আহমেদ পর্যন্ত সুপারিশ করেন। বদিউর রহমান তার বদলির আদেশ বহাল রাখেন। এদিকে অভিযোগ ওঠার পর রোববার বিকেলের দিকে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে মতিউর পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ একাধিক কাস্টমস কর্মকর্তা। জানা গেছে, আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী এরপর মতিউর রহমান ভারত থেকে সরাসরি দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা দিতে পারেন। প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট তাকে দেশত্যাগে সহযোগিতা করেছে। গণমাধ্যমে প্রথম সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের অবৈধ সম্পদের তথ্য প্রকাশ পায়। ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরই এটি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং আদালতের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন এ বিষয়ে তদন্ত করে। এরপর আছাদুজ্জামান মিয়ারও দুর্নীতির ফিরিস্তি প্রকাশিত হয়েছে আরেকটি গণমাধ্যমে। এটি প্রকাশের পরপর অজ্ঞাত কারণে মানবজমিনের অনলাইন থেকে তা সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে এটি অন্যান্য গণমাধ্যমগুলো লুফে নেয় এবং আছাদের বিভিন্ন সম্পদের তথ্যগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যদিও আছাদুজ্জামান মিয়া দাবি করেছেন যে, তিনি দুর্নীতি করেননি। আমেরিকা পালিয়ে যাননি, হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য তিনি সিঙ্গাপুর গেছেন। ২২ জুন দেশে ফিরবেন। আর দেশে ফিরে তিনি এ নিয়ে কথা বলবেন। তবে গতকাল ২৪ তারিখ পর্যন্ত তিনি দেশে ফিরেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। অন্যদিকে দ্বিতীয় দফা সময় নিয়েও দুদকে যাননি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। এ কারণে তাকে আর সময় দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন। তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। বেনজীর আহমেদকে প্রথমে গত ৬ জুন দুদকে তলব করা হয়েছিল। ওই তারিখে তিনি হাজির না হয়ে সময় চেয়েছিলেন। আইনজীবীর মাধ্যমে সময় চাওয়ার পর দুদক তাকে রোববার হাজির হতে বলেছিল। কিন্তু এদিন তিনি হাজির হননি। আর কোনো সময়ের আবেদনও করা হয়নি তার পক্ষ থেকে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুলিশের সাবেক আইজিপি ও সাবেক ডিএমপি কমিশনার কিংবা সাবেক সেনাপ্রধান ব্যক্তি হিসাবে এককভাবে তারা এ দুর্নীতি করেননি। এর অংশীদার ও সুবিধাভোগী অনেকেই ছিলেন। বেনজীর ও আজিজ তারা দুজনই দুটি করে সংস্থার প্রধান ছিলেন। তাদের কাছ থেকে সরকার বিশেষ কোনো সুবিধা নিয়েছে বলেই তারা দুর্নীতি করার সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে তারা যেসব সংস্থার প্রধান ছিলেন সেসব সংস্থার বিরুদ্ধে মানুষের আস্থার সঙ্কট আরও ঘনীভূত হবে। তবে দুদক যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, এটা যেন লোক দেখানো না হয়। এই দুই ব্যক্তিসহ তাদের সঙ্গে যাদের যোগসাজশ রয়েছে তাদেরও যেন জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, দুর্নীতি প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। দুদকের একার পক্ষে সব ধরনের দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়। সংস্থা বা মন্ত্রণালয়গুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারা ব্যবস্থা নিলে এত অভিযোগ দুদকে আসত না। তাদের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে দুদকে অভিযোগ কম আসবে- দুদক এটাই চায়। সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি যেন না হয় তার জন্য প্রতিরোধ করা জরুরি। সাংবাদিকেরা যে কাজ করে, আর দুদক যে কাজ করে, এসব কাজ একে অপরের পরিপূরক।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১