আপডেট : ১৪ July ২০২৪
কৃত্রিম প্রজনন নীতিমালায় রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। একদিকে খামারিদের ব্রাহমা লালনপালনে উৎসাহিত করে অন্যদিকে প্রজননে লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। আবার গবেষণার নামে রয়েছে ব্রাহমা আমদানির সুযোগ। খামারিদের আগ্রহের কারণে সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবেশ করছে বিভিন্ন জাতের হিমায়িত সিমেন; যা দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে কৃত্রিম প্রজননে একটি গাইডলাইনের। এটি না থাকার কারণে অবৈধ ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এনটিআরসির বিভিন্ন সময়ের সভা, আইএমইডি প্রতিবেদন, কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নিগার সুলতানার সত্যায়িত ‘বেসরকারি পর্যায়ে গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম পরিচালনার (সংশোধিত) নীতিমালা’ ২০১৬-এর ৩.১১ এর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- বিফ ক্যাটল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে। ফলে এক্ষেত্রে বেসরকারি পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার আপাতত কোনো সুযোগ নেই। দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নির্ধারিত গাভি পালন এবং এলাকায় মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গাভি পালন থেকে বিরত থাকতে হবে। অধিদপ্তরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমোদন ব্যতীত বিফ ক্যাটল ডেভেলপমেন্টের অধীন কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। এর আগে জাতীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নীতিমালা ২০০৭-এ বলা ছিল ৫০ ভাগ ব্রাহমা জাত এনে দেশি গরুকে প্রজননের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক জাত উন্নয়ন করার বিষয়টি। পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডির ২৮ নভেম্বর ২০১৮ সালের বিফ ক্যাটেল ডেভেলপমেন্ট (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের সমাপনী পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ১৬.৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে অতি দ্রুত ব্রাহমা জাতের গরু পালন বৃদ্ধি পাচ্ছে ও মাংসের চাহিদা পূরণের জন্য এ গরু খুবই উপযোগী। ব্রাহমা জাতের গরু পালন ও উপকারিতা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন। দেশের গরুর হাটগুলোতে ব্রাহমা জাতের গরুর বিবরণ সম্বলিত সাইনবোর্ডসহ ব্রাহমা জাতের গরু প্রদর্শনী/বিক্রি করা এবং হাটগুলোতে ব্রাহমা জাতের গরুর আলাদা স্থান বরাদ্দ করা দরকার। ১৬.৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- প্রকল্পের আওতায় বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ৬০ হাজার ডোজ ব্রাহমা সিমেন দ্বারা ৪০ হাজার ৩৭৮টি গাভীর কৃত্রিম প্রজনন করা হয়। প্রকল্প সমাপ্তি পর্যন্ত ২৩,১২৮টি গরুর বাছুর উৎপাদিত হয় এবং ১৭,২৫০টি গাভি গর্ভবতী অবস্থায় থাকে। প্রকল্পের মজুতকৃত সিমেন দ্বারা পর্যায়ক্রমে কৃত্রিম প্রজনন অব্যাহত ও গর্ভবতী গাভির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এফ১ জেনারেশন থেকে প্রাপ্ত ষাঁড়ের সিমেন সংগ্রহ করে এফ১ জেনারেশনের বকনা বাছুরের ১০০% ব্রাহমা জাতের কৃত্রিম প্রজনন করা হয়। এফ১ জেনারেশন থেকে প্রাপ্ত ৫০% ব্লাড লেভেলের গাভি এবং এফ২ জেনারেশন থেকে প্রাপ্ত ৭৫% ব্লাড লেবেলের বকনা/এঁড়ের বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএলআরআই কর্তৃক গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ব্রাহমা জাতের গরুর খাদ্যাভাস, রোগ প্রতিরোধ, অধিক দৈহিক গঠন ও বাংলাদেশের পরিবেশ উপযোগী। ১৬.৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- এ প্রকল্পের কার্যক্রমের সফলতা দেখে বর্তমানে খামারিদের মধ্যে ব্রাহমা জাতের সিমেনের চাহিদা খুবই বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বাণিজ্যিকভাবে খামারিদের সিমেন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অপর দিকে, দেশি জাতের গাভিকে ১০০% ব্রাহমা জাতের সিমেন দ্বারা কৃত্রিম প্রজনন করে যে বাচ্চা জন্মগ্রহণ করে, সে বাচ্চাগুলোকে প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে সরকারি মূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা দরকার। কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরে ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রেগুলেটরি কমিটির (এনটিআরসি) ২১ নভেম্বর ২০২৩ তারিখের সভায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রাণী প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞানী বিভাগ) প্রফেসর ড. এ. কে ফজলুল হক ভূঁইয়া জানান, আমাদের দেশে এখনো বিফ ক্যাটল উৎপাদনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে দেশে সাধারণ জনগণের ন্যায্যমূল্যে মাংস প্রাপ্তিতে সহায়তা করা। তিনি লাইভস্টক পলিসি ২০০৭ এবং জাতীয় প্রজনন নীতিমালা অনুসরণের কৃত্রিম প্রজনন নির্দেশিকা-২০১৯ এর বিশেষ দিকগুলো তুলে ধরে বলেন, যদিও জাতীয় প্রজনন নীতিমালা অনুসরণে কৃত্রিম প্রজনন নির্দেশিকা- ২০১৯ এর আলোকেই এখন বিফ ক্যাটল উন্নয়নের কাজ শুরু করা যায়। এর জন্য নতুন করে কোনো নির্দেশনা বা আদেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা ২০১৯ সালে নির্দেশিকায় ৬ ও ৭ নম্বর অনুশাসনে ব্রাহমা চালুর স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। এখন পর্যন্ত উক্ত নির্দেশনা রহিত করা হয়েছে মর্মে কোনো সার্কুলার/পত্র/আদেশ জারি হয়নি। তাই জাতীয় প্রজনন নীতিমালা অনুসরণের কৃত্রিম প্রজনন নির্দেশিকা-২০১৯ এর আলোকে ব্রাহমা জাতের সিমেন ব্যবহারে কোনো বাধা নেই। এ সভাতে আরো বলা হয়েছে, দেশে সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে আসছে বিভিন্ন সিমেন। যা বিভিন্ন কোম্পানির এজেন্টদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক সিমেন উৎপাদনকারীর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বিষয়টি শিকার করে সভাসদদের জানিয়েছেন, সেই সব এজেন্টের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছেন তারা। যারা অবৈধ সিমেন ব্যবহার করতেন। সভায়, কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী বলেছিলেন, বেসরকারি সিমেন বাজারজাতকারীরা তেমন একটা নিয়ম মানেন না। এ কারণে তাদের বিক্রীত সিমেন রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করবেন। এ সভায় সিদ্ধান্তে ৩.৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ব্রাহমা মাংসালো জাতের গরু; দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেসরকারি পর্যায়ে গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজনন পরিচালনার সংশোধিত-২০১৬ নীতিমালার ৩.১১ ধারার বিষয়টি পুর্নবিবেচনা প্রয়োজন। এটি নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় এবং মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। তাই বিষয়টি বিবেচনার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে ব্রাহমা সম্পর্কিত প্রকল্পের মধ্যবর্তী মূল্যায়ন রিপোর্ট, প্রজেক্টের পিসিআর রিপোর্ট এবং গবেষণা সম্পর্কিত তথ্যাদি সংযুক্ত করার জন্য অনুরোধ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়েছে বলে জানা যায়নি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে বিফ ক্যাটেল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের মাধ্যমে ব্রাহমার উৎপাদন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ১১টি উপজেলায় তিন বছরের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে এর কাজ করানো হয়। পরবর্তীকালে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৬০ হাজার শুক্রাণু এনে দেশি গাভিতে প্রজনন ঘটানো হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট ৪৮টি জেলার ১৮৫টি উপজেলায় এর বিস্তার ঘটানো হয়। কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী এই প্রতিবেদককে জানান, বিফ ক্যাটেল ডেভেলপমেন্ট (১ম সংশোধিত) প্রকল্পটি বন্ধ হওয়ার সময়ে বেশ কিছু আমদানি করা সিমেন থেকে যায়। যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিটিউটকে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেখানে কতগুলো জমা আছে তা নিশ্চিত নয়। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় আমদানি করা ১৫০টি ব্রাহমা এঁড়ে বাছুর আনা হয়েছিল। এসব বুল দিয়ে উৎপাদন করা ৫০ ভাগ ব্রাহার সিমেনের সাড়ে ৩ লাখের মতো জমা রয়েছে সাভারের কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের ল্যাবরেটরিতে। তবে সারাদেশে তাদের সিমেন ব্যবহারের বেসরকারি এআইও প্রতিষ্ঠানকে সরকারি নিয়মকানুনের মধ্য থেকে কাজ করতে হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক সাবেক মহাপরিচালক বলেন, সরকার যে নীতিমালার কথা বলছে, সেখানে শুধু বীফ ক্যাটেলের প্রজনন ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু এখানের কোথাও বলা হয়নি দেশে ব্রাহমা জাতের কোনো গরু লালনপালন করা যাবে না। সেখানে আরো বলা হয়েছে, দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নির্ধারিত গাভি পালন এলাকায় মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গাভি পালন থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু এখানেও নির্দিষ্ট করা হয়নি কোন এলাকা দুধ উৎপাদনের জন্য। আর কোনটি মাংস উৎপাদনের। কিন্তু গবেষণার জন্য ব্রাহমা আমদানির সুযোগ রাখা হলো। সরকারিভাবে না হয় গবেষণার জন্য আমদানি করা হলো। গবেষণা কতটা হবে- সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারি প্রকল্প বাস্তবাবায়নের ফলে ব্রাহমা জাত ছড়িয়ে যায়, অন্যদিকে লালনপালন লাভজনক হওয়ায় অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠেন ব্রাহমা সংগ্রহ করতে। এই সুযোগটি তৈরি করে দিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। এ কারণে বৈধ ব্যবসার আড়ালে অনেকেই প্রত্যন্ত এলাকায় ব্রাহমার বীজ বিক্রি শুরু করে খুবই সতর্কতার সঙ্গে। অনেকে আবার এই অপারচুনিটিকে কাজে লাগিয়ে চোরাই পথে বিভিন্ন দেশে থেকে নিম্নমানের বীজও খামারিদের কাছে সরবরাহ করত। অনেকই ব্রাহমা বীজের ডোজ প্রতি ৫-৭ হাজার টাকা করে দাম নিত। কিন্তু বিভিন্ন এলাকা থেকে গরুকে ব্রাহমা বীজ দেওয়ার খবর আসতে থাকে আমাদের কাছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বীজ পুশ করার পরে স্ট্রটি সংরক্ষণের জন্য খামারিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ দিলেও কোনো অভিযোগকারী স্ট্র জমা দিতে পারেননি। এক্ষেত্রে কোম্পানির এজেন্ট বা এআই নিজ হাতে এগুলো পুশ করত। নিজ হাতেই আবার স্ট্রগুলো নষ্ট করে ফেলত। খামারিকে দেওয়া হতো না কোনো মানি রিসিটও। কিন্তু আমরা বিভিন্ন খামার পরিদর্শনে গেলে ব্রাহামার বাচ্চার উপস্থিতি দেখেছি। তারা আরো বলেন, বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রকল্প চলাকালে দেশে ৪০ হাজারের বেশি ব্রাহমা উৎপাদন হয়েছিল। এদের মাধ্যমেও কিছু বুল তৈরি হয়েছে। আর সরকারিভাবেও প্রায় ৫০ ভাগ ব্রাহমার ৪-৫ লাখ বীজ উৎপাদন করা হয়েছিল। এখন সেগুলো থেকে কতগুলো সংরক্ষিত আছে তা তারাই বলতে পারবেন। বিভিন্ন সময়ে মাংস রপ্তানির জন্য বিচ্ছিন্ন ২/৩টি দ্বীপে কাজ শুরুর কথা থাকলেও তার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মহাপরিচালকরা আরো জানান, আমাদের কাছে অভিযোগ ছিল, অনেক শৌখিন খামারি দেশের অবৈধভাবে বেলজিয়ান ব্লু, বেলজিয়ান হোয়াইট, আঙ্গাস, কোবে এবং গির উৎপাদনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু চেয়ারে থেকে অনেক কিছু চাইলেও করা যেত না। তারা এখনো চেষ্টা করছেন কিছু ক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন। কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের ১৩ অক্টোবর ২০২২-এর মাসিক সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, সে সময়ে খামারে ২৭টি ব্রাহমা গরু ছিল। বকনা ছিল ১৩টি, গাভি ছিল সাতটি, ষাঁড় ছিল ১টি, এঁড়ে বাছুর ছিল ৩টি এবং এক বছরের নিচে বাছুর ছিল ৩টি। গড়ে দুধ উৎপাদন ছিল ১. ৬ কোজি।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১