আপডেট : ১৫ September ২০২৪
তরিকুল ইসলাম সুমন: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এই অন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ হতাহত হয়েছেন। নবগঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশের এই অবস্থায় ১৮ আগস্ট থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এখনো শিক্ষার পরিবেশ ফিরছে না। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় ধস নেমেছে। শিক্ষার এই অচলাবস্থায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের বাইরে থাকছে। একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ ভেঙে দেওয়া, সভাপতি পরিবর্তন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করা, শিক্ষক পরিবর্তন, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অপকর্মের অভিযোগ আছে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে। শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের চিহ্নিত করে প্রচলিত আচরণবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বার্থেই নিজ নিজ শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। নতুন করে পদায়ন ও নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে প্রশাসন ভেঙে পড়তে পারে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন সরকারের উচিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (কিন্ডারগার্ডেন থেকে শুরু করে বিশ^বিদ্যালয়) খুলে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিক্ষা সিলেবাস পূরণের জন্য সপ্তাহে ৬ দিন খোলা রাখা। এ সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের ছুটি না নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসব বা ইস্তফা দেওয়া বা পদত্যাগে বাধ্য করার বিষয়ে বলেন, কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের আইন হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানপ্রধান ছাত্রদের আন্দোলনে যেতে বাধা দিয়ে থাকেন বা নিষেধ করে থাকেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিধান বা নিষেধ করা তার দায়িত্ব। এটি অভিভাবক হিসেবেই তার কোনো অপরাধ নয়। তবে যদি তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অপরাধ বা অনিয়ম করে থাকেন সেটি দেখভালের দায়িত্ব পরিচালনা কমিটি অথবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নয়। শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতেই শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ফেরা উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষাবিদ জানান, যে কোনো আন্দোলনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা। এবারের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল শিক্ষার্থীরা। ফলে শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এখনই তাদের শিক্ষায় মনোনিবেশ করা উচিত। তা না হলে শিক্ষাজীবনে বড় ক্ষতি হবে। এ কারণে সরকারের উচিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে ফেরানো। শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা। সম্প্রতি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করতে একজন শিক্ষকের বিপরীতে ৪০ শিক্ষার্থীর অনুপাতে নিয়ে আসার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজ। এই সংগঠন আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় চূড়ান্ত বিচারে সমাজের প্রতিষ্ঠান। এখানে সবার সমান অধিকার রয়েছে। ফলে তারা যেভাবে চাইবে, সেভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় চলবে। অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু শিক্ষক নন, ছাত্রদের স্টেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংস্কার জড়িয়ে আছে। রাষ্ট্র যদি সংস্কার না হয় তাহলে সব কিছু পুনরায় ফিরে আসার বিপৎ আছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, শিক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কার চায় ইউনিসেফ, ইউনেসকো এবং ইউএনএফপিএ। একই সঙ্গে ২০১০ সালের শিক্ষানীতি হালনাগাদ করতে অভিমত জানিয়েছেন এ তিন সংস্থার প্রতিনিধিরা। তারা শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহেদউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন। এ সময় শিক্ষা উপদেষ্টা প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছেন, আমরা মানসম্মত শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছি। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ ও এর বিশেষায়িত সংস্থাগুলোর সব রকমের সহযোগিতাকে আমরা স্বাগত জানাব। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, শিক্ষার পরিবেশ ফেরাতে শিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল এনেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সচিব ও দুই সদস্যসহ প্রভাবশালী সাত কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি ইডেন, তিতুমীর, বিএম ও ভিক্টোরিয়াসহ ২১টি সরকারি কলেজে নতুন অধ্যক্ষ দেওয়া হয়েছে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষকেও। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকায় গত দুই সপ্তাহে অন্তত ৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পদ ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, আবার কাউকে চাপের মুখে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে জোর করে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে গত ১২ আগস্ট পদ ছাড়েন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ ও উপাধ্যক্ষ এটিএম মইনুল হোসেন। ওই দিন সকালে দুজনই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আবেদন করেন। তবে সরকারি চাকরি হওয়ায় সরাসরি পদত্যাগ করলে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। এ জন্য তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অন্যত্র বদলির আবেদন করেছেন। শুধু ঢাকা কলেজ নয়, রাজধানীর আরও তিনটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গত ১১ আগস্ট পদ ছাড়েন। তারা হলেন কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আমেনা বেগম, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোহসিন কবীর ও সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফেরদৌস আরা বেগম। সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোহসিন কবীর পদত্যাগের পর শিক্ষার্থীরা বিজয় মিছিলও করেন। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, আমরা সরকারি চাকরি করি, কোনো দলের নই। তবু শিক্ষার্থীর চাপের মুখে আমরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি। পদত্যাগে বাধ্য হন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানম। অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীর দাবির প্রতি সম্মান রেখে আমি পদত্যাগ করছি। ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল মজিদ বলেন, আমাদের কাছে অনেক প্রধান শিক্ষকের তথ্য আছে। আমরা মাউশিকে বিস্তারিত জানিয়েছি। পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। প্রতিষ্ঠানের প্রধান না থাকা বিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সহকারী প্রধান শিক্ষকরা চালিয়ে নিচ্ছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদত্যাগ করা অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকরা হলেনÑ রাজধানীর খিলগাঁও গভর্নমেন্ট স্টাফ কোয়ার্টার হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সরদার মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বনানী মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাজী শফিকুল ইসলাম, বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক ড. মো. ইদ্রিস আলী, রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা, নবাবগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবদুল মান্নান, ঢাকা কটন মিল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম, শ্যামপুর ভাষাপ্রদীপ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইশারত আলী এবং দোহারের জয়পাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ এস এম আবদুল খালেক। পদত্যাগ করতে বাধ্য করা অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকরা হলেনÑগুলশান মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ এম মুস্তফা জামান মিয়া, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক জোহরা জবীন, মিরপুর নাজনীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. নুরুল ইসলাম, ধামরাই ওদুদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুর রাজ্জাক, কেরানীগঞ্জ কলাতিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুজ্জামান জামাল, লালবাগ সালেহা উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম, কোতোয়ালি থানার আনোয়ারা বেগম মুসলিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রশীদ মোড়ল, একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মুন্সী, ধামরাই সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ার ইসলাম তালুকদার, এই একই থানার বাড়িগাঁও কৈলাশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফরহাদ হোসেন, কোতোয়ালি থানার আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা বেগম, মিরপুর নিউ মডেল বহুমুখী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আ স ম ফিরোজ, লেক সার্কাস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল, লালবাগ থানার রায়েরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেহেরুন্নেসা, নতুন জুরাইন কে এম মাঈনুদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ মো. আবদুল হাই, বনানী মডেল স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, শ্যামপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম, শ্যামপুরের বর্ণমালা আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী প্রধান শিক্ষক খান নাসির উদ্দিন, ডেমরার অগ্রদূত বিদ্যানিকেতন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক তালুকদার আবদুল মন্নাফ এবং কেরানীগঞ্জের আগানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেন।
সরকার ২০১২ সালের ক্যারিকুলামে ফিরে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সমস্যা হবে। তাদের সিলেবাস পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর এ জন্য তাদের পরীক্ষা ডিসেম্বরের পরিবর্তে জানুয়ারিতে নেওয়া প্রয়োজন। আর দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি কমিটি করে নতুন ও পুরনো কারিকুলাম পর্যালোচনা করে তবেই সরকারের অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
Plot-314/A, Road # 18, Block # E, Bashundhara R/A, Dhaka-1229, Bangladesh.
বার্তাবিভাগঃ newsbnel@gmail.com
অনলাইন বার্তাবিভাগঃ bk.online.bnel@gmail.com
ফোনঃ ৫৭১৬৪৬৮১