দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য তুলে ধরার পরিবর্তে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে সয়লাব হয়ে গেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তপক্ষ (বেবিচক) আগমনী ও বহির্গমন টার্মিনালসহ বিভিন্ন লাউঞ্জে পর্যটন করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ও পর্যটন তুলে ধরার শর্তে ইজারা দেয় কে-মার্ক ও গোল্ডহিল অ্যালায়েন্স নামে দুটি প্রতিষ্ঠানকে। তারা ইজারা নীতিমালা লংঘন করে স্থাপন করেছে বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের ডিসপ্লেবোর্ড ও এলইডি স্ক্রিনসহ বিভিন্ন বোর্ড।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শক্তিশালী একটি চক্র বিলবোর্ড ও ডিসপ্লেবোর্ডের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এসব নিয়ন্ত্রণ করছে। এর সঙ্গে বেবিচকেরও একটি অসাধুচক্র জড়িত রয়েছে। তারা ইজারার শর্ত লংঘন করে অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
বেবিচক থেকে কে-মার্কের সিইও তানভীর হাসানকে দেওয়া চিঠি থেকে জানা গেছে, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পর্যটন তুলে ধরতে কিছু শর্তসাপেক্ষে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক আগমনী সিঁড়ির বিপরীত দিকের দেয়ালে একটি এলইডি স্ক্রীন বা ব্যাকলিট বক্স বা এর সমন্বয়ে একটি বোর্ড, বহির্গমন ট্রানজিট এলাকায় দুই পাশের লাল ইটের দেয়ালে দুটি এলইডি স্ক্রীন বা রোলার স্ক্রল, ১-৮ নং লাগেজ বেল্টের প্রথম সারির ৮টি পিলারে এলইডি স্ক্রীন বসানোর ইজারা দেওয়া হয়। বিভিন্ন আকারের বোর্ডগুলোর ইজারা মূল্য প্রতি বর্গফুট ৬ মাসের জন্য ৩৭৬৩ টাকা ১০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। প্রযোজ্য ভ্যাট ও আয়করসহ কিছু শর্তও রয়েছে। তবে ইজরার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ৩০ জুনে।
অপর এক চিঠিতে গত ৩১ আগস্ট মাসে ৪৮৬ দশমিক ৫৮৩ বর্গফুট জায়গা ২ বছরের জন্য ইজারা নবায়ন করা হয়। সেখানেও পর্যটন করপোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য, পর্যটন বিষয় তুলে ধরার শর্ত দেওয়া হয়। স্থান সংকুলান হয় না বলে আভ্যন্তরীণ টার্মিনালের দোতলায় লাউঞ্জ নির্মাণের কথা বলে ইজারা নেয়। পরে সেটা নির্মাণ করে সামান্য একটু রেখে একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২৫ কোটি টাকা ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাস্তবে দেখা যায় কে-মার্ক কতৃপক্ষ ইতিহাস ঐতিহ্য প্রচার ও পর্যটন সংক্রান্ত কোনো বিলবোর্ড বা ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করেনি। সেখানে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে সয়লাব করে দেওয়া হয়েছে। যাত্রী ও বিমানবন্দরের অনেকে বলেন দেশি-বিদেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনগুলো কুরুচিপূর্ণ এবং দেশের ইতিহাস, এতিহ্য ও পর্যটনের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। এসব ডিপ্লেবোর্ডের কারণে দেশে-বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
এদিক গোল্ডহিল অ্যালায়েন্স নামে আরো একটি প্রতিষ্ঠান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে রুফটপে যাত্রী সেবা লাউঞ্জে তিন হাজার বর্গফুট জায়গা ইজারা নেয়। ৩০ জুন ২০২২ তারিখ পর্যন্ত দেওয়া ইজারায় প্রতিষ্ঠানটিকে নিজ খরচে ৬ হাজার বর্গফুট জায়গায় লাউঞ্জ নির্মাণের যাবতীয় কাজ করা, এরমধ্যে ৫০ শতাংশ এলাকা লাউঞ্জ ও অন্যান্য যাত্রী সেবামূলক কাজে ব্যবহার ও ৫০ শতাংশ বেবিচক কর্তপক্ষ ব্যবহারের শর্ত দেওয়া হয়। পাশাপাশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্যাসেঞ্জার লিফট বসানোসহ এক ডজনের বেশি শর্ত দেওয়া হয়।
বেবিচকের পরিচালক (এটিএম) মো. মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব শর্ত আরোপ করা হয়। বিমান বন্দরের একজন কমকর্তা জানান, গোল্ডহিল অ্যালায়েন্স তাদের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী কাজ করেনি। তারা ইচ্ছেমতো বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বসিয়ে লাউঞ্জের সৌন্দর্যহানি করেছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
জানাগেছে কে-মার্কের সিইও তানভীর আহমেদের অফিসের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে বারিধারা ডিওএইচএসের ২১ নম্বর সড়কের বি/১২৯ নিচতলা। আবার গোল্ডহিল অ্যালায়েন্সের ঠিকানাও একই। গোল্ডহিল অ্যালাযেন্সের ম্যানিজিং পার্টনার হিসেবে দেখানো হয়েছে জনৈক মুঈদুল হকের নাম। প্রকৃতপক্ষে দুটি প্রতিষ্ঠানেরই মালিক তানভীর আহমেদ। তিনি বেবিচকের অসাধু কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে ইজারা নীতিমালা লংঘন করে খামখেয়ালিভাবে কাজ করছেন। বেসকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
এসব বিষয়ে কে-মার্কের সিইও তানভীর আহমেদ বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী বেবিচকের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করছি। গোল্ডহিল অ্যালায়েন্সে আমার পার্টনারশীপ থাকতেই পারে। ইতিহাস ঐতিহ্য ও পর্যটনের বিজ্ঞাপন আমরা কিছু রেখেছি।
অনিয়ম বিষয়ে জানতে চাইলে বেবিচকের পরিচালক (এটিএম) মিজানুর রহমান বলেন, আমরা ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে। কেউ শর্ত লংঘন করে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





